এর পাশেই আর একটা সরু হেডিং : ‘সাসপেন্ড হচ্ছে নবেন্দু’। পূর্ণেন্দু সেটাতে চোখ রাখলেন : ‘রেফারি বিপুল নাগের ওপর সবুজ সংঘের ফুটবলার নবেন্দু গুপ্তর হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন আই এফ এ এবং সি আর এ—র কর্মকর্তারা। আই এফ এ সচিব বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন রেফারির রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করবে আই এফ এ পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। শৃঙ্খলারক্ষাকারী কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে ফুটবলারটির ব্যাপারে। রেফারির রিপোর্ট সোমবার আই এফ এ—তে জমা পড়বে।’
পূর্ণেন্দুর প্রথমেই মনে হল এই খবরটা অন্য সব কাগজেও নিশ্চয় বেরিয়েছে। আনন্দর সব ফ্ল্যাটেই কাগজ রাখে। প্রত্যেকে এটা পড়বে। তিনি মায়াকে ডেকে কাগজটা তার হাতে দিয়ে বললেন, ‘পড়ে দেখো। গুণধর ছোটো ছেলের কীর্তি।’ মায়া পড়লেন, পড়ে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলেন। পূর্ণেন্দু বললেন, ‘কাল অত রাত্রে ফিরল কেন, কারণটা এখন বুঝতে পারছ, নবু কী করছে?’ মায়া বললেন, ‘ভোরে উঠে বেরিয়ে গেছে, কিছু বলে যায়নি। আচ্ছা সাসপেন্ড হচ্ছে কথাটার মানে কী? আজীবনের জন্য খেলা বন্ধ করে দেওয়া?’ পূর্ণেন্দু মাথা নেড়ে জানালেন তিনি বুঝতে পারছেন না।
বেলা দশটা নাগাদ মোটরবাইকে দুজন লোক এল নবেন্দুর খোঁজে। পূর্ণেন্দু তাদের বসার ঘরে আনলেন। তারা প্রথমে নবেন্দু আছে কি না জানতে চাইল। নেই শুনে, তাদের মধ্যে লাল—কালো ডোরাকাটা স্পোর্টস শার্ট আর জিনস পরা বলিষ্ঠ চেহারার, গালে লম্বা একটা ক্ষতের দাগটানা যুবকটি নিজের পরিচয় দিল, ‘আমার নাম সমরেশ ঢালি, আমি সবুজ সংঘের কোচ আর ইনি হলেন বুদ্ধদেব চ্যাটার্জি ক্লাবের সেক্রেটারি। কাগজে নিশ্চয় দেখেছেন কালকের ঘটনার কথা। নবাকে নিয়ে যত্তোসব আজেবাজে কথা লিখেছে, গপ্পো ফেঁদেছে। আপনি অযথা মন খারাপ করবেন না কাকাবাবু, সব ম্যানেজ হয়ে যাবে। ওই রেফারি আমাদের ওদিকেই বাগুইহাটিতে থাকে। একটু চমকে দিলেই ওর রিপোর্টের ভাষা বদলে যাবে।’
পূর্ণেন্দু অবাক হয়ে বললেন, ‘চমকে দেওয়া মানে!’
সমরেশও অবাক হয়ে তাকাল, তার ভাবখানা লোকটা তো আচ্ছা গাড়োল, চমকে দেওয়ার মতো সহজ কথাটার মানে জানে না? বলল, ‘চমকে দেওয়া হল একটু ভয়টয় দেখানো। বউ—বাচ্চচা নিয়ে সংসার, রেশন অফিসে চাকরি করে একদম ছাপোষ।’
‘কী ভয় দেখাবেন?’ পূর্ণেন্দু গম্ভীর স্বরে জানতে চেয়ে খবরের কাগজটা ভাঁজ করতে শুরু করলেন।
ধুতি পাঞ্জাবি পরা বছর চল্লিশ বয়সি সেক্রেটারি বুদ্ধদেব চ্যাটার্জি এবার মুখ খুললেন, ‘আমরা প্রথমে রিকোয়েস্ট করব নবেন্দু যাতে সাসপেন্ড না হয় এমনভাবে রিপোর্ট লিখতে। একটা প্রমিসিং ফুটবলারের কেরিয়ারে যাতে দাগ না পড়ে।’
‘কিন্তু রেফারি তো থানায় নবুর বিরুদ্ধে এফ আই আর করে বলেছে নবেন্দু তাকে ঘুসি মেরেছে। এখন রিপোর্টে অন্য কথা লিখবে কী করে?’ পূর্ণেন্দু পালটা যুক্তি দিলেন।
‘লিখবে লিখবে কাকাবাবু লিখবে। দিনকে রাত করে দেবে রেফারি, যখন ওকে চ্যাংদোলা করে তুলে আনব। ওর বাচ্চচাকে সকালে স্কুলে পৌঁছে দিতে যায় ওর বউ, যখন বলব স্কুলে নয় বাচ্চচা অন্য কোথাও পৌঁছে যাবে তখন দেখবেন বিপুল নাগ রিপোর্টে লিখবে—থানায় বসে মাথা ঘুরছিল, কার নাম লিখতে কার নাম লিখে ফেলেছি ভিড়ের মধ্যে আমাকে ঘুসি মেরেছিল তাকে দেখতে পাইনি। এরকম রিপোর্ট রেফারিয়া আগেও প্রচুর দিয়েছে।’
পূর্ণেন্দু বিব্রত ও বিরক্ত মুখে কিছুটা ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, ‘না না এভাবে একটা লোককে ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করাটা খুব অন্যায় কাজ হবে। আমি এটা অ্যাপ্রুভ করতে পারছি না।’
ওরা দুজন পরস্পর মুখচাওয়াচাওয়ি করল। বুদ্ধদেব একচোখ টিপে সমরেশকে কথা বলতে বারণ করে পূর্ণেন্দুকে নম্রগলায় বলল, ‘স্যার আপনি যখন বলছেন তখন মানতেই হবে। নবেন্দু এলে ওকে বিকেলের মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবেন। ওকে নিয়ে যাব রেফারির বাড়িতে। ক্ষমা চেয়ে যদি মন গলাতে পারে। এ ছাড়া তো ওর সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।’
‘তাই করুক। দোষ করলে অবশ্য শাস্তি পাওয়া উচিত।’ পূর্ণেন্দুর স্বরও নম্র হয়ে এল। ‘আমার ছেলে এমন একটা কাজ করে বসল, ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।’
‘নবেন্দু ছেলে হিসেবে তো খুবই ভালো।’ বুদ্ধদেব নরম স্বরে বলল, ‘প্রায়ই তো আমাদের বাড়িতে আসে। বাড়ির প্রত্যেকে ওর প্রশংসা করে।’
পূর্ণেন্দু এরপর জিজ্ঞাসা করলেন সমরেশকে, ‘আপনি কোচিং ছাড়া আর করেন কী?’
‘একটা মিনিবাস আছে তা ছাড়া বিল্ডিং মেটিরিয়াল সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করি। কোচিংটা আমার সখের ব্যাপার। দু—বছর ইস্টার্ন রেলে খেলেছি। বাঘা সোমের কোচিংয়ে ছিলুম, ওর কাছ থেকেই যা কিছু শিখেছি। কাকাবাবু আপনার ফিগার দেখে মনে হচ্ছে একসময় খেলাধুলো করেছেন।’
পূর্ণেন্দু মনে মনে খুবই প্রীতবোধ করলেন, বললেন, ‘আরে না, না খেলাধুলো যা কিছু ওই ছাত্রাবস্থায়, কলেজ আর ইউনিভার্সিটির পর মাঠে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ক্রিকেটটা যৎসামান্য খেলেছি, বঙ্গবাসীর টিমে ছিলুম।’
‘কাকাবাবু তা হলে আসি। বুদ্ধদার আবার এগারোটার সময় পার্টি মিটিং আছে, ওকে পৌঁছে দিতে হবে।’
দুজনে উঠল। পূর্ণেন্দু ওদের সঙ্গে বাইরে এলেন। মোটরবাইকের পিছনে বসে বুদ্ধদেব চ্যাটাজি বলল, ‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, ব্যাপারটা যাতে ভালোভাবে মিটে যায়। সেটা আমরা দেখব।’
