তিনটি কিশোর দুটি মহিলা চেয়ারে বসেছিল। পূর্ণেন্দু ছেলেদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ক্যাসেট চালানো এবার বন্ধ করো, শুনতে হয় নিজেদের ঘরে বসে শোনো। অন্যকে জ্বালাতন করা কেন?’
ছেলে তিনটে প্রথমে অবাক হয়ে শোনে তারপর একজন বলে, ‘কই আর কেউ তো বলেনি জ্বালাতন হচ্ছে!’
‘কেউ বলেনি তো কী হয়েছে, আমি বলছি।’ পূর্ণেন্দু অবাধ্য ছাত্রদের ধমক দেওয়ার মতো স্বরে বললেন। ‘এটা কী গান হচ্ছে? গানের কথাগুলো কী তোমরা বলতে পারবে?’
ছেলেরা চুপ করে রইল দেখে তিনি বললেন, ‘গানের কথাই যদি বুঝতে না পারলে তা হলে সে গান শুনে লাভ কী? বাংলা গান বাজাও, রবীন্দ্রসংগীত, পল্লিসংগীত কিংবা সানাই কী সেতার!’
একটি ছেলে বলল, ‘কথার থেকেও বড়ো জিনিস রিদম, আমরা রিদম শুনি। নেকিয়ে নেকিয়ে গাওয়া বাংলা গান, রবীন্দ্রসংগীত আর ভালো লাগে না।’
মহিলা দুজনের যিনি মধ্যবয়সি তিনি তখন বলেন, ‘পুজো তো মোটে চারটে দিনের জন্য। দু—দিন তো কেটেই গেল, আর দুটো দিন একটু কষ্টেসৃষ্টে কাটিয়ে দিন দাদা। পুজো তো ছেলেপুলেদের জন্যেই।’
‘মানছি কিন্তু বুড়োদের কথাটাও তো তাদের ভাবা উচিত।’ পূর্ণেন্দু যতদূর সম্ভব উত্তেজনা সংযত রেখে বলেন। ‘এই বক্সটা আমার বারান্দার সামনে থেকে সরিয়ে অন্যদিকে মুখটা ঘুরিয়ে বসাও। আর বাজাতে হলে ভল্যুম কমাও।’ এই বলে তিনি চলে আসেন। আধঘণ্টা পরে যখন তিনি দেখলেন বক্সটা সরল না, ভল্যুমও কমল না, তখন তিনি গিয়ে বক্সের মুখ বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে আসেন।
দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্বনাথ ঘোষ। তিনি মন্তব্য করেন, ‘ঠিক করেছেন দাদা, কানোর পোকা বার করে দিচ্ছিল।’
‘তা হলে প্রতিবাদ করেননি কেন?’ পূর্ণেন্দু কড়া চোখের মারফত ধমকালেন।
‘ছেলেছোকরাদের চটাবার দরকার কী!’ অপ্রতিভ বিশ্বনাথ এই বলে ঘরে ঢুকে গেলেন।
কিন্তু অন্য একটা কারণে মায়া চটলেন। ছায়া উচ্চচমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের জন্য দিন গুনছে। রবিন্দু ভালোভাবেই বিকম পাশ করেছে। পূর্ণেন্দু তার অধ্যাপকজীবনের প্রথম দিকের ছাত্র সুরেশ্বর বোসকে অনুরোধ করে তারা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট অফিসে রবিন্দকে শিক্ষানবিশ করে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। নবেন্দু দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠতে পারেনি এখন সে কলকাতার দ্বিতীয় ডিভিশন ফুটবল লিগে সবুজ সংঘের মিডফিল্ডার। উদীয়মান হিসাবে দু—তিনটি প্রথম ডিভিশন ক্লাবের রিক্রুটারদের চোখে সে পড়েছে। লেখাপড়া ছেড়ে দেওয়ার জন্য পূর্ণেন্দু তাকে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। মায়া অবশ্য বলেছিলেন, ‘নবু লোকে বলবে কী! এমন বাপের এমন মুখ্যু ছেলে! অন্তত হায়ার সেকেন্ডারিটা পাশ কর। তোর বাবা মনে মনে খুব কষ্ট পেয়েছেন, বলছিলেন পঁয়ত্রিশ বছর পড়িয়ে কত ছাত্রকে শিক্ষা দিলাম আর আমার ঘরেই অশিক্ষিত তৈরি হল। প্রদীপের নীচেই অন্ধকার।’
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নবু চোখ কুঁচকে শুনল। তারপর বলল, ‘আমাকে নিয়ে বাবা, তুমি, দাদা আজ লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু আর তিন—চার বছরের মধ্যেই দেখবে মোহনবাগান কী ইস্টবেঙ্গলে যখন খেলব তখন আমাকে দেখিয়ে তোমরা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছ। লোকের কাছে তখন বলবে নবেন্দু গুপ্ত আমার ছেলে। লেখাপড়া তো টাকা রোজগারের জন্য। যদি ফুটবল খেলে বছরে পঞ্চাশ—ষাট হাজার টাকা রোজগার করতে পারি তা হলে ডিগ্রি দিয়ে আমার কী দরকার। ওই তো একজন ডিগ্রি বাগিয়ে অফিসে কলম ঘষে মাসে তিনশো টাকা পাচ্ছে, বছরে ছত্রিশ শো।’
‘রবু পার্মানেন্ট হবে ছ—মাস পরেই তখন শুরু হবে আটশো দিয়ে। তোর বাবা শুরু করেছিল দেড়শো দিয়ে। তুই কী ভেবেছিস তিরিশ—চল্লিশ বছর ধরেই বছরে পঞ্চাশ—ষাট হাজার টাকা ফুটবল খেলে আয় করবি? কিন্তু রবু করবে।’
‘তুমি জানো না মা, বড়ো ক্লাবে যারা যায় তারা একটা চাকরিও আদায় করে নেয়। আমি তো স্কুল ফাইনাল পাশ, চাকরি ঠিক পেয়ে যাব। কয়েকটা বছর শুধু অপেক্ষা করা।’ নবুর গলায় প্রত্যয় ফুটে ওঠে।
কিন্তু মায়া খুব ভরসা পেলেন না নবুর কথায়। নবু কেমন খেলে, কত বড়ো ফুটবলার হবে সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। স্বামীর কাছে শুনেছেন, খেলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া, অর্থ পাওয়া সবার ভাগ্যে জোটে না, এটা লটারির মতো। সবাই বড়ো প্লেয়ার হয় না কেউ কেউ হয়। হাজার হাজার ছেলে বড়ো হবার স্বপ্ন দেখে, বড়ো হয় একজন কী দু—জন। খবরের কাগজে কখনো নবুর নামও তিনি দেখেননি অবশ্য দ্বিতীয় ডিভিশনের খেলার রিপোর্ট কাগজে ছাপাও হয় না। কিন্তু নবেন্দু গুপ্ত একদিন কাগজের খেলার পাতার খবর হল।
পূর্ণেন্দু খবরের কাগজের খেলার পাতাটা খুঁটিয়ে পড়েন। এক রবিবার তার চোখ আটকে গেল একটা মোটা হেডিংয়ে—’রেফারিকে ঘুসি মেরে ফুটবলার গ্রেপ্তার।’ খবরের প্রথম বাক্যটি পড়েই তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ‘রেফারি বিপুল নাগকে ঘুসি মেরে পুলিশ হেফাজতে গেল সবুজ সংঘের ফুটবলার নবেন্দু গুপ্ত।’ এরপর তার হাতের কাগজ থরথর কেঁপে উঠল। কাগজটা শক্ত করে মুঠোয় ধরে পড়ে গেলেন: ‘শনিবার দ্বিতীয় বিভাগীয় খেলায় ওয়াই এমসিএ মাঠে মুখোমুখি হয়েছিল সবুজ সংঘ ও টালিগঞ্জ ইনস্টিটিউট। খেলা শেষের মিনিট তিনেক আগে টালিগঞ্জ গোলরক্ষকের সঙ্গে এক সংঘষে আহত হন সবুজ সংঘের বলাই দাস। মাঠে পড়ে থাকা বলাইকে ঘিরে সবুজ সংঘের ফুটবলারদের সঙ্গে হঠাৎই ধাক্কাধাক্কি শুরু হয় রেফারি বিপুল নাগের। সেই সময় বিপুল সবুজের নবেন্দু গুপ্তকে রেডকার্ড দেখান। এরপরই নবেন্দু রেফারির কানের নীচে ঘুসি মারে। বিপুল তৎক্ষণাৎ ঘোড়াপুলিশের সাহায্য চান। ঘোড়াপুলিশ এসে নবেন্দুকে মাঠের বাইরে নিয়ে যায়। তারপর তারা নবেন্দুকে তুলে দেয় হেস্টিংস থানার পুলিশের হাতে। পরে অবশ্য তাকে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রায় মিনিট দশেক বন্ধ থাকার পর খেলাটা কোনোক্রমে শেষ করেই আবার মাঠে শুয়ে পড়েন বিপুল। তাকে তখন অ্যাম্বুলেন্সে করে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পরই তিনি ছাড়া পেয়ে যান। হেস্টিংস থানার রাতে এফ আই আর করেছেন বিপুল। তার বক্তব্য, খেলা শেষের তিন মিনিট আগে টালিগঞ্জ গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষে বলাই পড়ে গেলে আমি স্ট্রেচার ডাকি। তখনই নবেন্দু আমায় গালাগালি করলে লালকার্ড দেখাই। কার্ড দেখাতেই ও আমায় মারে। বাধ্য হয়ে পুলিশকে ডাকি। নবেন্দু থানায় বসে জানান, জীবনে কখনো লালকার্ড দেখিনি। বলাইকে পড়ে থাকতে দেখে বললাম ও জল চাইছে। তাই নিয়ে কথা কাটাকাটি হতেই কার্ড দেখাল। তারপর পুলিশকে ডেকে নাম করে বলল আমার বার করে দিতে। আমি ওকে মারিইনি।’
