হিসেবটা তিনি মনে মনে কষে রেখেছিলেন মায়াকে জানাননি। নতুন ফ্ল্যাটে মালপত্তর নিয়ে আসা এক ঝকমারির ব্যাপার। সেই ঝামেলাটা চমৎকারভাবে সামলায় রবিন্দুর কলেজের বন্ধু অমিয় বিশ্বাস। থাকে বৌবাজারে। অবস্থাপন্ন। বাড়ির কাছেই ওদের যে ফার্নিচারের দোকান, সেটা চালায় বাবা। অমিয় এখন থেকেই সেখানে বসছে। ছেলেটি চটপটে, চতুর ও মিশুকে। সব বিষয়েই কিছু না কিছু খবর রাখে। একটু বেঁটে, স্বাস্থ্যটা ভালোই এবং মুখ সুশ্রী। অমিয় দু—দিনেই মায়ার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে।
বুদ্ধিটা অমিয়ই দিয়েছিল, ‘মেসোমশাই এমন একটা বাসা অমনি অমনি ছেড়ে দেবেন? জানেন এখন কলকাতায় ঘরের ডিমান্ড কেমন? আপনি ছাড়লেই বাড়িওলা পঞ্চাশ হাজার টাকা সেলামি নিয়ে এক হাজার টাকায় পুরো দোতলাটা ভাড়া দিয়ে দেবে। আপনি তো দিচ্ছেন মাসে তিনশো টাকা। আপনি উঠে গেলে বাড়িওলার কী লাভটা হবে ভাবুন! কিছু টাকা ওর কাছ থেকে আদায় করে নিন। এভাবে সবাই নেয়।’
পূর্ণেন্দু আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘না, না, না, এটা খুব অনৈতিক কাজ হবে। এভাবে টাকা নিলে আত্মমর্যাদা থাকে না, নিজের কাছে ছোটো হয়ে যেতে হয়।’
.
অমিয় পূর্ণেন্দুবাবুর গলার স্বর ও মুখের ভাব দেখে চুপ করে যায় কিন্তু মায়া মুখর হয়। ‘কী এমন অন্যায় কথা অমিয় বলেছে? বাড়িওলা যদি সেলামি নিতে পারে তা হলে আমরাও টাকা চাইতে পারি তাকে ঘর ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।’
সমর্থন পেয়ে অমিয় বলে, ‘টাকা যদি না দেয় তা হলে ঘরও ফেরত পাবে না, আমরা ভাড়াটে বসিয়ে দিয়ে যাব, নাও এবার ঠ্যালা বোঝো। মাসিমা বাড়িওয়ালা যদি বুদ্ধিমান হয় তা হলে হাজার দশেক তো দেবেই।’
‘দশ বাজার!’ মায়ার চোখ চকচক করে উঠেছিল। পূর্ণেন্দুকে তখন বলেন, ‘তুমি আজই হরেনবাবুর কাছে গিয়ে বলো, দশ হাজার পেলে ঘর ছেড়ে দেব।’
গোঁয়ারের মতো মুখ নামিয়ে পূর্ণেন্দু, ‘আমি পারব না’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অমিয় বলল, ‘মাসিমা আপনি বাড়িওলাকে চেনেন?’
‘চিনি, কাছেই বেনেটোলায় থাকে।’
‘চলুন আমি আর আপনি গিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলি। এতগুলো টাকা যখন পেতে পারি তখন মিছিমিছি নৈতিকতার কথা তুলে ছেড়ে দেব কেন।’
মায়া এবং অমিয় হরেন রায়চৌধুরির সঙ্গে দেখা করে, পূর্ণেন্দু ঘুণাক্ষরেও তা জানেন না। ওরা পনেরো হাজার টাকা চেয়েছিল, পাঁচ মিনিটেই রফা হয়ে যায় দশ হাজারে। স্থির হয় মালপত্তর গাড়িতে উঠলে পর তখন ক্যাশ টাকা মায়ার হাতে দিয়ে হরেনের লোক ঘরগুলোয় তালা লাগিয়ে দেবে। ফিরে আসার সময় আপশোস করে অমিয় বলে, ‘মাসিমা লোকটা এভাবে রাজি হয়ে যাবে জানলে আর একটু বাড়িয়ে পঁচিশ হাজার বলতুম, তা হলে নির্ঘাত কুড়ি হাজার পাওয়া যেত।’
‘যাক গে, পড়ে পাওয়া ধন চোদ্দোআনা। তুমি কিন্তু বাবা, রবুকে এই ব্যাপারে একটি কথাও বলবে না। ও আবার বাপের ধাঁচ পেয়েছে।’
বত্রিশ বছরের ঘরকন্নার জমে ওঠা মালপত্র বাঁধাছাদা, লরি ও কুলি ভাড়া করে এনে তাতে তোলা, প্রায় একাই করল অমিয় অবশ্য রবিন্দু, নবেন্দু এবং ছায়াও তাকে সাহায্য দেয়। মালপত্রের সঙ্গে পূর্ণেন্দু লরিতে ড্রাইভারের পাশে বসেন চিনিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। দুই ছেলেও লরিতে ওঠে। রয়ে যায় মায়া এবং ছায়া। অমিয় ওদের ট্যাক্সিতে করে নিয়ে যাবে। তালা এবং টাকা নিয়ে হরেনের লোক তৈরি হয়েইছিল। টাকা যখন মায়া গুনছিল তখন ছায়া কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করে, ‘মা কীসের টাকা?’
মুচকি হেসে মায়া বলেন, ‘তোর বিয়ের গয়নার টাকা, বাড়িওলার কাছে জমিয়ে রেখেছিলুম।’
অমিয় হঠাৎ বলে ওঠে, ‘ছায়ার বিয়েতে আপনাদের টাকা খরচ করতে হবে না মাসিমা। মেয়ে আপনার সুন্দরী, পাত্রপক্ষ সোনা দিয়ে মুড়ে নিয়ে যাবে।’
মায়া লক্ষ করলেন জিভ দেখিয়ে চোখে ছদ্ম কোপ প্রকাশ করে ছায়া হাতের মুঠি তুলে অমিয়কে দেখাল। দেখে তার ভ্রূ কুঞ্চিত হয়ে উঠল।
.
দুই
নতুন আবাসে নতুন পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে গুপ্ত পরিবারের অসুবিধা হল না। মায়া খুশি, কয়লার উনুনে রান্না করার বদলে তিনি এখন গ্যাসের উনুনে রাঁধেন, একটা দেশলাই কাঠি জ্বালালেই আগুন, রান্নাঘরেই চব্বিশ ঘণ্টা জল পড়ছে কল খুললে, মেঝেয় বসে খাওয়ার বদলে তারা এখন খায় চেয়ারে বসে টেবলে, রান্না করা খাবার থাকছে ফ্রিজে। অসুবিধা এবং বড়ো রকমের অসুবিধা স্থান সংকুলানের। রবু নবু একঘরে দুটো খাটে, বাকি তিনজন অন্য ঘরটায়। পূর্ণেন্দু সোফা কাম বেড কিনেছেন তাইতে শোন। সকালে উঠে এলেন গায়ে ব্যথা করছে। সরু ফালি জায়গাটা হয়েছে বসার ঘর, সেখানে রয়েছে একটা ছোটো সোফা, দুটো মোড়া আর একটা টেবলের উপর টিভি স্টে। সন্ধ্যা থেকে পূর্ণেন্দু টিভি দেখে সময় কাটান। এখন খবরের কাগজ ছাড়া আর কিছু পড়েন না। মায়ার হাঁটুতে বাত, বেশি চলাফেরা করলে যন্ত্রণা হয়।
আবাসনে দুর্গাপুজোর সময় পূর্ণেন্দু একটা ব্যাপারে উত্যক্ত হয়ে প্রতিবেশীদের কাছে চিহ্নিত হয়ে যান ‘ঝামেলার লোক’ বলে। সপ্তমীর সকাল থেকে মাইকে ইংরেজি গান বেশ জোরেই বাজানো হচ্ছিল। অ্যামপ্লিফায়ারের বাক্সটা তার ফ্ল্যাটের দিকে মুখ করিয়ে বসানো ছিল বারান্দার কাছেই। পুজোর সময়টুকু বাদে সারাক্ষণ বাজছিল, জানলাগুলো বন্ধ রেখেও শব্দের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছিল না। পূর্ণেন্দু সুরেলা গান পছন্দ করেন কিন্তু তার আবাল্য পরিচিত সুরের সঙ্গে এই ইংরেজি গানের সুরকে একদমই মেলাতে পারছিলেন না। তার মনে হচ্ছিল প্রচুর ঢাকঢোল বাজছে আর চিৎকার করে যাচ্ছে এক বা একাধিক বলির পাঁঠা। অষ্টমীর দুপুরে অসহ্য বোধ করে তিনি পুজো প্যান্ডেলে হাজির হন।
