ঘাড় নেড়ে পূর্ণেন্দু সম্মতি জানিয়ে বলেন, ‘ফ্ল্যাটটা আগে কী একবার দেখা যায় না?’
‘কেন যাবে না? দাঁড়া ওকে পাওয়া যায় কি না দেখি। কেরোসিন স্টোভ তৈরির ব্যবসা করে, হয়তো এখন বাড়িতে আছে।’ কল্যাণ ফোন তুলে ডায়াল করল। পূর্ণেন্দু উৎকণ্ঠিত চোখে কল্যাণের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বুঝলেন শুভেন্দু হালদার তার ফ্ল্যাটে রয়েছে।
‘শুভেন্দুবাবু? কল্যাণ দত্ত বলছি। আমার সেই প্রিন্সিপালবন্ধু যার কথা বলেছিলাম সে একবার ফ্ল্যাট দেখতে চায়।…আজই দেখাতে পারেন?’ ফোনের মুখে হাতটা চেপে কল্যাণ বলল, ‘হ্যাঁরে আজ যাবি?’
পূর্ণেন্দুর মনে চট করে ভেসে উঠল মায়ার বিরক্ত মুখটা। তিনি বলেন, ‘কাল সকাল দশটায় বল।’
কল্যাণ ফোনে কথাগুলো বলে উত্তর শুনে ফোন রেখে বলল, ‘তা হলে কাল দশটায় গিয়ে দেখে আয়। ‘আনন্দ কোথায়’ তোকে তো বলেই দিয়েছি। শুভেন্দুবাবু থাকে গেট দিয়ে ঢুকেই বাঁ দিকে বি ব্লকের দোতলায়, ফ্ল্যাট নম্বর চার। ওর থ্রি বেডরুম ফ্ল্যাট। তোর জন্য অপেক্ষা করবে।’
পরদিন সকাল পৌনে দশটায় কাঁকুড়গাছি রেল ব্রিজের পরের স্টপে ওরা দুজন বাস থেকে নামে। বাঁদিকে রাস্তা, দু—ধারে দোকান, বাড়ি। দুশো গজ গিয়ে ডান দিকের প্রথম রাস্তা ছেড়ে আরও দুটো বাড়ি পরে দ্বিতীয় রাস্তাটিতে তারা ঢুকল। তখন মায়া মন্তব্য করেন, ‘রাস্তাগুলো বেশ সোজা সোজা, নোংরা নয়।’ মিনিট দুয়েক হাঁটার পর প্রায় একশো গজ লম্বা পাঁচিল। মধ্যিখানে গাড়ি ঢোকার মতো চওড়া লোহার ফটক। তার পাশে একটা কাঠের বাদামি বোর্ডে চওড়া সাদা অক্ষরে লেখা ‘আনন্দ নিকেতন।’
ঢুকেই একটা ঘাসবিহীন ছোটো মাঠ। তার তিনদিকে পাঁচটি বাড়ি। বাড়িগুলোর মাঝে সাত—আট হাত করে ফাঁকা জমি। প্রতি বাড়িতে দুটি করে সিঁড়ি। প্রতি সিঁড়িতে আটটি ফ্ল্যাট। কল্যাণের নির্দেশমতো শুভেন্দু হালদারের ফ্ল্যাট খুঁজে নিতে পূর্ণেন্দুর অসুবিধে হল না। কলিং বেলের বোতাম টেপার আগে নিজের ধুতি ও গরদের পাঞ্জাবির দিকে মুখ নামিয়ে দেখে নিলেন। জুতোজোড়া অল্পদিন আগে কেনা এবং চকচকে। বাঁ কাঁধের মুগার চাদরটি আর একবার বিন্যস্ত করলেন। মায়া অনেকদিন পর জরির চওড়া পাড় সাদা শাড়ি, তুলে রাখা চটি এবং সোনার বালাজোড়া পরেছেন। শুভেন্দু হালদার ওদের সাধারণ মধ্যবিত্ত যেন না ভাবে সে জন্য দু—জনে সাধ্যমতো যত্ন নিয়েছেন পরিচ্ছেদে।
দরজা খুললেন শুভেন্দু হালদার। পরনে ঢিলে পাজামা ও আদ্দির পাঞ্জাবি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। আঙুলে দুটি আংটি। পূর্ণেন্দু প্রথমেই বুকের কাছে দুই করতল জোড়া করে নমস্কার করলেন, শুভেন্দু ডান হাতের মুঠো গলা পর্যন্ত তুলে নামিয়ে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছি। এখুনি ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে, একটা মেশিন বিগড়ে কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। চলুন আপনাদের ফ্ল্যাট দুটো দেখিয়ে আনি।’
আনন্দ নিকেতনের উত্তরের দুটি বাড়ির একটির একতলায় সিঁড়ির দু—ধারে ফ্ল্যাট দুটি। ঘরের জানলাগুলো বন্ধ ছিল। শুভেন্দু যখন জানলা খুলছে মায়া তখন ফিসফিস করে বললেন, ‘ঘরগুলো বড্ড ছোটো ছোটো।’ পূর্ণেন্দু জবাব দেননি।
শুভেন্দু একের পর এক দেখিয়ে বলে গেলেন, ‘এই কিচেন এই বাথরুম, এই ডাইনিং স্পেস, ওদিকে, একটা ছোটো বারান্দা রয়েছে দেখে যান।’
ওরা দু—জন ঘরের মধ্যে দিয়ে গিয়ে তিনহাত চওড়া একটা গ্রিলঘেরা বারান্দায় এলেন। পূর্ণেন্দু প্রফুল্লস্বরে মন্তব্য করলেন, ‘পূর্বদিকটা খোলা দেখছি।’
‘সদর দরজার পাশে যে ফালি জায়গাটা রয়েছে ওখানে একটা ছোটো সোফা একটা চেয়ার কী টেবল রাখা যেতে পারে, এটাকে বসার পারপাসে ইউজ করা যায়, এখানকার অনেকেই তাই করেছেন।’ শুভেন্দু পরামর্শ দিলেন।
ওরা মিনিট দশেক ছিলেন ফ্ল্যাটের মধ্যে। বাড়ি ফিরে এসে মায়া বলেন, ‘জামাকাপড় শুকতে দেওয়া হবে সমস্যা। চারতলার ছাদে কে উঠতে যাবে? বাইরে দিলে তো চুরি হবে। তার থেকেও বড়ো কথা রবু নবুর তো একদিন বিয়ে হবে তখন থাকবে কোথায়? ছায়া নয় বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে কিন্তু আমরা দুজন তখন থাকব কোথায়, ওই একচিলতে বসার জায়গাটায়?’
পূর্ণেন্দু একটু রেগে একটু হতাশ হয়ে বলেন, ‘তা হলে যেমন আছি তেমনই থাকি। যেদিন তিন বেডরুমের পাব আর কেনার জন্য পয়সা দিতে পারব সেদিনই নয় ফ্ল্যাট কিনব। রবু কি নবু বউ নিয়ে কী আলাদা থাকতে পারবে না?’
রবিন্দু তখন বিকম প্রথম বর্ষের ছাত্র, নবেন্দু স্কুলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে, ছায়া নবম শ্রেণিতে। সে দিন মায়া স্বামীর সঙ্গে তর্কে নামেননি শুধু মুখভার করে বলেছিলেন, ‘যা ভালো বোঝ তাই করো তবে মনে রেখো জীবনে কয়েকটা জিনিস আছে যা একবার করে ফেললে তা আর শুধরে নেওয়া যায় না।’
পূর্ণেন্দু বলেন, ‘যেমন?’
‘যেমন বিয়ে করা, যেমন বাড়ি করা।’
পূর্ণেন্দু হিসেব করে ঠিক করেছিলেন ছ—মাস পর রিটায়ার করে যে টাকা হাতে পাবেন তাই থেকে তিরিশ হাজার টাকা দিয়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্র কিনবেন সেটা সাড়ে পাঁচ বছরে ডবল হবে তখন ছায়াও বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠবে। অবশ্য সব টাকাই তিনি ছায়ার বিয়েতে খরচ করবেন না। অতঃপর ফ্ল্যাট কেনার জন্য, শুভেন্দু হালদার যা বলল তাতে লাগবে চল্লিশ হাজার। এরপর যা হাতে থাকবে সেটা রেখে দিতে হবে। সংসারের হাল ধরার মতো ক্ষমতা হতে দুই ছেলের আরও অন্তত পাঁচটা বছর তো লাগবে।
