‘বিশ্বাস করতে পারছি না বউমা, এ কী দৃশ্য দেখলুম! কল্পনাতেও এমন ঘটনার কথা ভাবতে পারব না। এই দেখো এখনও আমার হাত—পা কাঁপছে।’ ইন্দ্রাণী দুটো হাত বাড়িয়ে ধরলেন। মৌসুমী দেখল সত্যিই আঙুলগুলো থরথর করছে। তরুণকান্তি বাড়ি নেই , চন্দননগরে বন্ধুর বাড়িতে গেছেন।
‘ওকে এখন কী করবে বউমা?’
‘পুলিশ হয়তো এসে গেছে। ওই দেখুন বলতে বলতেই—’
ওরা দেখল খাঁকি আর সাদা পোশাকে চার—পাঁচজন পুলিশ বারান্দায়। দু—জন ঝুঁকে রয়েছে দাঁদুর উপর বাকিরা ঘরে ঢুকেছে। একজন ঘর থেকে বেরিয়ে এল একটা বঁটি হাতে।
‘আর দেখতে হবে না। চায়ের জল বসাও।’
চা খেতে খেতেই এসে গেল রমার মা।
‘গেছলে নাকি ও বাড়িতে?’ ইন্দ্রাণী জানতে চাইলেন।
‘যাব না!’ রমার মা ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, ‘ও বাড়ির দুটো ঘরে কাজ করি, যাব না? তোমরা তো সবই রান্নাঘর থেকে দেখেছ আমি দেখেছি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। এই এত কাছের থেকে।’ হাতটা বাড়িয়ে সে চার হাত দূরের একটা জায়গা দেখাল।
মৌসুমী বলল, ‘আমরা সব দেখিনি, ঘরের মধ্যে কী হয়েছে আমরা জানি না। পুলিশকে দেখলুম একটা বঁটি হাতে বেরোল।’
রমার মা গলা নামিয়ে গোপন খবর দেওয়ার মতো করে বলল, ‘আরে ওই বঁটি দিয়ে তো বউদি দাদাবাবুর নলিটা কেটেছে। দুপুরে বাড়ি এল মদে চুরচুর হয়ে। দোতলাতে উঠতে গিয়ে সিঁড়িতে পড়ে যায়। মেজো বউদি ধরে তোলে। ঘরে এসে বিছানায় ধপাস করে পড়েই বেহুঁশ। তখনই তো গলায় বঁটিটা বসায়, কী সাহস বলো তো! তুমি আমি পারব স্বামীকে এভাবে খুন করতে! তারপরই তো রান্নাঘর থেকে কেরোসিন তেলের টিনটা আনল। কালকেই আমি টিন ভরতি তেল এনে দিয়েছি, সবটা ঢেলেছে।’
‘ওকে পুলিশ নিয়ে গেছে?’ ইন্দ্রাণী বললেন।
‘যাবে না তো কি রেখে দিয়ে যাবে? শান্তশিষ্ট লক্ষ্মীমেয়ের মতো গুটিগুটি গিয়ে জিপে উঠল। আর দাদাবাবুকে কাটাছেঁড়া করতে নিয়ে গেল।’
রাত্রে মৃণালকান্তি বউয়ের পাশে শুয়ে বলল, ‘ব্যাপারটা খুব ট্র্যাজিক, মেয়েটার জন্য কষ্ট হচ্ছে, তোমার হচ্ছে না?’
মৌসুমীর মনে হল প্রশ্নটার জবাব না দিলেও চলে। সে বলল, ‘ও বিধবা হতে চেয়েছিল, সফল হল। অনেকেই কিছু একটা করবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেও করে ফেলে, তারা কখনো একা হতে পারে না। পার্বতী কিন্তু সত্যিই আজ একা হয়ে গেল, নিজের কাছেও।’
দুটি তিনটি ঘর
এক
সমবায় আবাসনটির নাম ‘আনন্দ নিকেতন’। সবাই ছোটো করে বলে আনন্দ। চারতলা পাঁচটি বাড়িতে আশিটি ফ্ল্যাট এই আবাসনে আছে, এর অর্ধেক দুই শয্যাঘরের বাকিগুলি তিন শয্যাঘরের। মফসসল কলেজের অধ্যক্ষপদ থেকে অবসর নেবার ছ—মাস আগে থেকে পূর্ণেন্দু গুপ্ত যখন তার স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় বসবাসের জন্য বাড়ি খুঁজছেন কিন্তু দামের অঙ্ক শুনে মুখ শুকিয়ে ফেলছেন তখন বাল্যবন্ধু কল্যাণ দত্তর সঙ্গে রাণাঘাট লোকাল ট্রেনে হঠাৎ তার দেখা হয়ে যায়। কথা প্রসঙ্গে কল্যাণ জানায় সে সল্ট লেকে বাড়ি করে বাস করছে এবং একটি বড়ো ব্যাঙ্কের মানিকতলা শাখার ম্যানেজার। তার শাখার এক কাস্টমার শুভেন্দু হালদার বাগমারিতে একটি সমবায় আবাসনের সেক্রেটারি। শুভেন্দু তিনদিন আগে কথায় কথায় তাকে বলেছিল তার আবাসনে এখনও একতলার দুটি ছোটো ফ্ল্যাট রয়ে গেছে। কিন্তু উচ্চচশিক্ষিত, ভদ্র এবং ভালো পদে চাকরি করে অথবা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এমন লোককে ছাড়া সমবায়ের মেম্বার করানো হবে না এবং দু—কামরার ফ্ল্যাট নেবার জন্য তেমন লোক শুভেন্দু এখনও পায়নি।
ট্রেনে সেদিন কল্যাণ তাকে বলে সে যদি আগ্রহী হয় তা হলে ‘শুভেন্দুর কাছে কলেজ প্রিন্সিপালের নাম রেকমেন্ড করবে।’ পূর্ণেন্দু সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন বাল্যবন্ধুর দুটি হাত ধরে। উত্তর কলকাতার ভাড়াবাড়িতে ফিরে পূর্ণেন্দু খবরটা স্ত্রী মায়াকে দেন। সব শুনে মায়া প্রথমেই বলেন, ‘শোবার ঘর তো দুটো, একটায় রবু আর নবু শোবে, অন্যটায় আমরা দুজন, তাহলে ছায়া শোবে কোথায়? বাইরের লোকজন এলে বসবেই বা কোথায়?’
পূর্ণেন্দু বিব্রত হয়ে বলেন, ‘শোয়াশুয়ির কথা ভাবলে আমরা যা পুঁজি তাতে ফ্ল্যাট নেওয়া যাবে না।’
বিরক্ত হয়ে মায়া বলেন, ‘ফ্ল্যাট তো কিনব থাকার জন্য, তা হলে শোয়াবসার কথা আগে ভাবব না?’
পূর্ণেন্দু বোঝাবার চেষ্টায় বলেন, ‘আগে দরকার মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই সেটা পেলে তখন শোয়াবসাটা ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে। হয়তো একটু অসুবিধে হবে, তা হোক। ভাড়াবাড়ি নয় নিজস্ব মালিকানা। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ, নতুন প্রতিবেশী নতুন করে জীবন শুরু করা এটাই তো বড়ো লাভ।’
মায়া বলেন, ‘তা হোক নেবার আগে একবার গিয়ে দেখে আসা দরকার। তুমি কল্যাণবাবুকে বলো আমরা ফ্ল্যাটটা আগে দেখব।’
পূর্ণেন্দু অতঃপর কল্যাণের ব্যাঙ্কে যান খবর নিতে। কল্যাণ হাসিমুখে তাকে জানায়, ‘বলেছি তোর কথা শুভেন্দুবাবুকে। ওদের হাউজিংয়ে হেডমাস্টার আছে কিন্তু প্রিন্সিপাল নেই। রাজি হয়ে গেছে। আমি বুঝিয়ে বলেছি এডুকেশনিস্টরা মার্জিত নম্র ভদ্র হয়, সাতেপাঁচে থাকে না, ঝগড়া করে না, ঘোঁট পাকিয়ে দলাদলি করে না, যা হয় এইসব হাউজিংগুলোয়। তবে একটা কথা যেটা শুভেন্দুবাবু বলল, ওকে কিন্তু সব ব্যাপারে তোকে সাপোর্ট দিতে হবে। কমিটি গড়ার জন্য যখন ভোট হবে তখন ওর প্যানেলকে ভোটটা দিবি, অর্থাৎ তুই ওখানে ওর লোক হয়ে থাকবি।’
