‘বোধহয় প্রেমট্রেম উবে গেছে। আর এটাও তো এক ঝামেলার ব্যাপার। মামলা—মোকদ্দমা, টাকা খরচ, দৌড়োদৌড়ি, কে আর পুরোনো প্রেমের জন্য এসব ঝক্কি পোয়াতে চাইবে!’
উদবিগ্ন স্বরে মৌসুমী বলল, ‘তা হলে পার্বতীর কী হবে?’
শিথিল গলায় মৃণালকান্তি বলল, ‘কী আর হবে, যেমন চলছে তেমনই চলবে। তুমি যেমন ফোনে কথা বলছ তেমনই কথা বলবে আর গলায় দড়ি দিতে দেখলে চিৎকার করে থামিয়ে দেবে। এ ছাড়া আর কী তুমি আমি করতে পারি? নিজের বাবা—মাই যদি ওর পাশে দাঁড়াতে না চায় আমরা তো পর।’
মৃণালকান্তির কথা শেষ হতে—না—হতেই দত্তবাড়ির দোতলা থেকে চাঁদুর কর্কশ চিৎকার আর বাসন ছোঁড়ার শব্দ উঠল।
‘ওই শুরু হল।’ মৌসুমী ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে গেল। পার্বতীর ঘরের জানালা বন্ধ দেখে ফিরে এল।
‘দেখতে পেলে?’ মৃণালকান্তি হাতের ম্যাগাজিনটা নামিয়ে জানতে চাইল।
‘জানলা বন্ধ। কাল ফোন করব।’
পরদিন দুপুরে মৌসুমী ফোন করল।
‘কাল কী হয়েছিল? জানতে পেরেছে কি কোথায় গেছলে?’
‘না জানে না। রান্নায় নাকি নুন বেশি হয়েছে, আসলে নুন ঠিকই ছিল। মারধোর করার জন্য একটা ছুতো দরকার তো। দিদি ওর কাছ থেকে যে টেলিফোন নম্বরটা আনলে সেটা দেবে? আমি নিজে ওর সঙ্গে কথা বলব।’
প্রসাদের মোবাইল নম্বর দিয়ে মৌসুমী বলল, ‘দুপুরে কোরো তখন দোকানে থাকে।’
দিন তিনেক পর পার্বতী ফোন করল দুপুরে। মৌসুমী তখন টিভি দেখছিল শব্দ কমিয়ে। ফোনটা কাছেই ছিল, দ্বিতীয় রিং হবার আগেই তুলে নিয়ে ‘হ্যালো’ বলল।
‘পার্বতী।’
‘খবর কী?’
ওধারে চুপ।
‘আরে খবর কী, ফোন করেছিলে দেবদাসকে?’
‘হ্যাঁ’। মৌসুমী ফোঁপানির শব্দ পেল। বুঝে নিল প্রসাদ নির্ঘাত বলেছে এত লোক থাকতে আমি কেন? বা এই রকম কিছু।
‘পরে কেঁদো, এখন বলো কী বলেছে?’
‘বলেছে অল্প বয়সে যা হয়েছে ওসব কেউ মনে করে রাখে না। ওরকম একটু—আধটু সবার জীবনেই ঘটে আবার ভুলেও যায়, তুমিও ভুলে যাও। বলল আর যেন ফোন না করি ওকে। দিদি আমি বিশ্বাস করেছিলুম ও আমাকে ভালোবাসে। এখন দেখছি ভুল ভেবেছিলুম—ভুল ভুল ভুল। মানুষ কীভাবে যে বদলে যায়!’
‘তা হলে তুমিও এবার বদলে যাও। সবথেকে ভালো হয় তুমি একা হয়ে যাও।’
‘তাই যাব।’ পার্বতী ফোন রেখে দিল।
মৌসুমী বিষণ্ণ বোধ করতে লাগল। টিভি বন্ধ করে ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করতে শুরু করল নিজের বলা ‘একা হয়ে যাও’ কথাটা নিয়ে, কথাটা আলটপকা মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল কিন্তু এর কোনো মানে হয়? চেষ্টা করলেই কি একা হওয়া যায়? এজন্য মনের বিশেষ একটা অবস্থা তৈরি হওয়া দরকার সেটা পার্বতী পাবে কী করে? একা তো জগৎসংসার স্বামী স্বজনদের কাছ থেকেই হয়ে যাওয়া নয়, নিজের কাছ থেকেও একা হয়ে যাওয়া, এটা হতে পারার ক্ষমতা পার্বতীর নেই। সুতরাং যন্ত্রণার মধ্যে ওকে আজীবন বাস করতে হবে। এইরকম ভাবতে ভাবতে মৌসুমী ঘুমিয়ে পড়ল, বহুদিন পরে দুপুরে।
বিকেলে ঘুমটা ভেঙে গেল বিরাট একটা হইচইয়ের আওয়াজে।
‘ও বউমা শিগগির এসো, দেখে যাও।’
ইন্দ্রাণীর উত্তেজিত ডাক শুনে মৌসুমী ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। শাশুড়ি রান্নাঘর থেকে ডাকছেন। সে দ্রুত রান্নাঘরে গেল। শাশুড়ি জানলায় দাঁড়িয়ে।
‘দেখো দেখো, বউটার কাণ্ড দেখো!’
মৌসুমী যা দেখল তা স্তম্ভিত হয়ে যাওয়ার মতো। দোতলার দু—ধারের ঘরের মাঝের বারান্দায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের একদিকে লাল শাড়ি পরা পার্বতী, হাতে টিন, তাই থেকে কেরোসিন বা পেট্রোল ঢালছে বারান্দায় ছড়িয়ে ছড়িয়ে। আগুনের আর একদিকে দাঁড়িয়ে তার মেজো জা সঙ্গে দুটি ছোটো ছেলে। ওরা আগুনের ভয়ে চিৎকার করছে। পাশের বস্তির লোকেরা মুখ তুলে চেঁচাচ্ছে ‘দমকল ডাকুন, দমকল, নইলে সারা বাড়ি পুড়ে যাবে।’
মৌসুমী দেখল পার্বতী ঘরে ঢুকে দু—হাত ভরতি শাড়ি জামা প্যান্ট এনে আগুনে ছুড়ে দিল। আগুন আরও দাউদাউ করে উঠল। পার্বতী আবার ঘরের ভিতর গেল।
এবার টানতে টানতে যে জিনিসটা আনল তা দেখে মৌসুমী মুখে হাত চাপা দিয়ে দমবন্ধ হওয়া মানুষের মতো আর্তনাদ করে উঠল। জিনিসটা চাঁদু।
মৃত চাঁদুর দেহটা আগুনে ঠেলে দিয়ে ঘরে থেকে বিছানার চাদর বালিশ এনে চাঁদুর উপর রাখল। তিনতলা থেকে লোক নেমে এসেছে, একতলা থেকেও উঠে এসেছে। জা আর তার দুই ছেলেকে তারাই সরিয়ে নিয়ে গেল। পার্বতীর হাঁটাচলার মধ্যে মৌসুমী উন্মত্ততার কোনো চিহ্ন খুঁজে পেল না।
দমকলের ঘণ্টি শোনা গেল। উপরতলা আর নীচের তলা থেকে বালতি করে জল এনে ততক্ষণে আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। পার্বতী তখন শান্ত পায়ে রেলিংয়ের কাছে এসে দু—হাত মাথার উপর তুলল, যেভাবে পদক গলায় ঝুলিয়ে ভিকট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বিজয়ীরা দু—হাত তোলে। চেঁচিয়ে কী যেন বললও। মৌসুমী শুনতে পেল শুধু একটি শব্দ—’বিধবা’ আর দেখতে পেল মেঝেয় কাত হয়ে পড়ে থাকা চাঁদুকে।
পার্বতীর কাঁধ ঝুঁকে পড়েছে। অবসন্ন শরীরটাকে ধীরে বসিয়ে দিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিল। দুই হাঁটুর মধ্যে মুখটা গুঁজে রাখল। এবার ওকে ঘিরে দাঁড়াল বাড়ির ও বাইরের কয়েকটা লোক। পার্বতীকে কিছুক্ষণ পর মৌসুমী দেখতে পেল ওরা যখন দুটি বাহু ধরে ওকে ধীরে ধীরে নীচে নিয়ে গেল।
