‘চলুন, আমি ওঁর বাড়ি চিনি, আমিও দেখে আসি। কয়েকবার ওঁর কাছে হাঁটাহাঁটি করেছি। সায়েন্সের লেকচারার। ইচ্ছে ছিল কিশোরকে ওর কাছে দিই। আসলে ওঁকে দিয়েই কোচিং খোলাব ভেবেছিলুম। আজ সকালে যা শুনলুম মনে হয় না উনি আর টিউশনির বাড়তি ধকল নিতে পারবেন।’ চলতে চলতে বলছিল বলরাম। হঠাৎ উত্তেজিত উৎসাহভরে সে বলে উঠল, ‘ভালোই হয়েছে। ওনার গোটা বারো ছাত্র আছে। সেগুলোকে আমাদের অঙ্কের কোচিংয়ে আনতে পারলে অনেক টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
সত্য ঘোষের বাড়িটি একতলা। বাড়ির বাইরের দেওয়ালের আধখানায় প্লাস্টার হয়েছে। ছাদের কংক্রিট ঢালাইয়ের লোহার শিকগুলো এক হাত বেরিয়ে। টাকা জমিয়ে জমিয়ে সত্যবাবু বাড়িটি বানাচ্ছেন। এখন সকাল—বিকেল—রাত্রি তিন শিফটে পড়াচ্ছেন। রান্নাঘরের টালির চালটা এই মাসেই পাকা করবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন।
খাটে চিত হয়ে শুয়েছিলেন। ওদের দু—জনকে দেখে কাত হয়ে বিছানায় চাপড় দিয়ে সত্য ঘোষ বললেন, ‘বসুন, বসুন। কী পাপের ভোগ দেখুন, প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠিয়েছিলেন আমাকে আর মন্মথবাবুকে আর তখনই ধীরাজ হুড়মুড় করে দলবল নিয়ে ঢুকে পড়ল। তোরা তো প্রিন্সিপালকে ঘেরাও করতে এসেছিস আমাদের তা হলে ছেড়ে দে। দিল না। বললুম ডায়াবিটিস, ব্লাডপ্রেশার হাই, ইসকেমিক হার্ট। কে শোনে সে কথা! প্রিন্সিপাল জল খেতে চাইলেন, দিল না। মন্মথবাবু বাথরুম যেতে চাইলেন, দিল না। আমি পাখা চালাতে চাইলুম, দিল না। উৎকট বীভৎস গুমোট একটা পরিস্থিতি আর সেই সঙ্গে কানের পাশে স্লোগান।’
মৃণালকান্তি বলল, ‘বেশি কথা বলবেন না। এখন আপনার দরকার বিশ্রাম আর ঠিকমতো ওষুধ খেয়ে যাওয়া।’
বলরাম বলল, ‘দীর্ঘ বিশ্রাম। কম করে তিন মাস। কলেজে ছুটি নিন। বাড়িতে কোচিং বন্ধ করুন।’
‘ছুটি নিলে খাব কী? আঠারো বছর আগে মাসে একশো টাকায় ঢুকেছিলুম পার্ট টাইম লেকচারার হয়ে, আজও তাই। টাকাটা একটু যা বেড়েছে। গাধার মতো টিউশনি করে গেছি দিনে আট—ন ঘণ্টা। তার ফল এখন ফলছে। এত রকমের রোগ দেহে বাসা বেঁধেছে। এই কোচিংই আমার সংসারকে বাঁচিয়ে রেখেছে আর বলছেন কিনা বিশ্রাম নিতে! কথা কম বলতে?’ রাগ ক্ষোভ হতাশা সত্যবাবুর কথাগুলো থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঝরে পড়ল।
‘ডাক্তার দেখিয়েছেন?’ মৃণালকান্তি নরম গলায় সহানুভূতি দেখাল।
‘শুভেন্দুবাবু এসেছিলেন। প্রেশার মেপে বললেন নার্সিং হোমে ভরতি হয়ে যান, এখানে নয় শ্রীরামপুরে। অত পয়সা কোথায় যে নার্সিং হোমের টাকা গুনব। ভাবছি সরকারি হাসপাতালে ভরতি হব।’
বলরাম আঁতকে উঠল, ‘না, না, তার থেকে বাড়িতেই থাকুন সেবাযত্নটা অন্তত পাবেন।’
ফিরে আসার সময় বলরাম বলল, ‘তিন মাস কেন, তিন বছর বিশ্রাম নিলেও আর আগের মতো পারবেন না, অবশ্যি যদি বেঁচে থাকেন। মৃণালবাবু, আমার দালানটা বেশ বড়ো একসঙ্গে জনাতিরিশ বসতে পারবে। চলুন দেখবেন চলুন, এখনও তো দেখলেন না।’
‘তাই চলুন। অনির্দিষ্টকালটা যে কত দিনের জন্য কে জানে!’
.
সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরে এল মৃণালকান্তি। নিজের ঘরে চা খেতে খেতে সে মৌসুমীকে বলল, ‘কলেজ বন্ধ করে দিয়েছে ম্যানেজমেন্ট কমিটি। চিন্তায় পড়ে গেছলুম, উদ্ধার করল বলরাম।’ মৌসুমীকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, ‘যে কোচিং সেন্টারটা খুলব বলেছিলুম তার ঘর রেডি করে ফেলেছে বলরাম। লোক বটে একখানা, ওখানে সবথেকে বেশি ছাত্র পড়ায় আমাদের কলেজেরই সত্য ঘোষ, ফিজিক্সের লেকচারার, আমার মতোই পার্ট টাইমার। ভদ্রলোক কাল ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেছলেন। হার্টের রুগি চাপ সহ্য করতে পারেননি। অজ্ঞান হয়ে যান। ওঁকে দেখতে গেছলুম, সঙ্গে ছিল বলরাম। যা দেখলুম তাতে মনে হল না আবার আগের মতো কাজ করতে পারবেন। বলরামটা একটা শকুনি। নজর ভাগাড়ের দিকে, ভাগাড় মানে টাকা।’ খালি কাপটা মৌসুমীর হাতে দিয়ে বিছানায় গড়িয়ে পাশবালিশটা জড়িয়ে ধরল মৃণালকান্তি। ‘ভালো কথা, ওখানে ইংরিজি মাস্টারের ভালো ডিমান্ড আছে। পড়ালে বেশ কিছু ছাত্র পাওয়া যাবে। তুমি কেমন ইংরিজি জান?র্’
‘কেন আমাকে দিয়ে পড়াবে?’
‘না, না, তুমি ওখানে যাবে কেন। তোমার কাছ থেকে স্কুলের ইংরিজির এখনকার ব্যাপারটা বুঝে নিতুম। কতকাল আগে পড়েছি, বারো—চোদ্দো বছর তো হবে।’
‘বলরামকে শকুন বলছ কিন্তু এই লোকই তোমার ত্রাণকর্তা হয়ে এখন দেখা দিয়েছে। এদের নিয়ে ঠাট্টা করো না। ওর গাইডেন্সেই চলার চেষ্টা করো। আমাদের এটাও কিন্তু টিকে থাকার লড়াই।’ কথা বলতে বলতে মৌসুমীর চোখ পড়ল মৃণালকান্তির ব্যাগটায়। ‘এ কী চুনের দাগ লাগল কী করে?’ শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘষে চুন তুলে বলল, ‘এটা সবসময় হাতে রাখবে।’
‘রাখব। তোমার পার্বতীর খবর কী?’
‘ওহ, বলতে ভুলে গেছি, আজ দুপুরে দেবদাসের দোকানে ব্লাউজপিস কিনতে গেছলুম।’
‘তুমি কিছু বললে?’
বললুম ওকে উদ্ধার করুন নইলে ও মরে যাবে, এখনও আপনাকে ভালোবাসে, এইসব। লোকটা মানে প্রসাদ বসাক দেখলুম চাঁদুকে জানে। চাঁদুর সম্পর্কে খবর রাখে। বলল, ও তো রাসকেল জানোয়ার।’
‘তাই নাকি! তা হলে উদ্ধার করতে এগোবে?’
‘কথা শুনে তো মনে হল না। ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, এত কাজ আমাকে কেন করতে হবে, আর লোক নেই? পার্বতীর ফোন নম্বরটা নিল না, তার মানে কথা বলতে চায় না। তোমার কী মনে হচ্ছে?’
