‘আমার সুবিধে দুপুরে। তখন তো দোকানেই থাকবেন।’ হাতব্যাগে কাগজের টুকরোটা রেখে ফিসফিস করে মৌসুমী বলল, ‘পার্বতী আপনাকে এখনও ভালোবাসে। আপনার চিঠিগুলো ও রেখে দিয়েছে।’ বলেই সে দরজার দিকে এগোল। দোকান থেকে বেরোবার সময় ফিরে পিছনে তাকিয়ে দেখল প্রসাদ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
বেরিয়ে এসে পার্বতীকে দেখতে পাচ্ছে না মৌসুমী। এদিক—ওদিক তাকিয়ে খুঁজল। ধরে নিল বাড়ি চলে গেছে। এতদূর তো একাই এসেছে একাই ফিরে যেতে পারবে, তা ছাড়া লুকিয়ে বেরিয়েছে, তাড়াতাড়ি ওর ফিরে যাওয়াও উচিত।
হাতিবাগান মোড় থেকে ডানদিকে ঘুরেই সে দেখল ট্রাম স্টপে পার্বতী দাঁড়িয়ে। মুখ বিব্রত, থমথমে।
‘এখানে তুমি আর আমি খুঁজছি কোথায় গেলে!’
‘আমার এভাবে সিনেমা হলের সামনে হাঁটাহাঁটি করাটা ঠিক হয়নি। দুটো লোক পাশে এসে এমন অসভ্য কথা বলল আমি ভয় পেয়ে গেছলুম।’
‘কী অসভ্য কথা বলল?’ হাঁটতে হাঁটতে মৌসুমী বলল।
‘সে আমি বলতে পারব না। আমাকে খারাপ মেয়ে ভেবেছিল। যা লজ্জা করল। আমাকে দেখে কি রাস্তার মেয়ে মনে হয়?’
‘একদম নয়। লোকগুলোই খারাপ। এত দামি ঢাকাই শাড়ি রাস্তার মেয়ের পাবে কোথায়?’
‘এ শাড়িটা কেন পরেছি জানো? ও এটা দিয়েছিল আমার বিয়েতে।’
আড়চোখে ঝট করে মৌসুমী ওর মুখটা দেখে নিল। পার্বতীর চোখে আলো।
‘অনেকক্ষণ তোমরা কথা বলেছ, কী বলল?’
‘বিশেষ কিছু বলল না, শুনে গেল। বললুম পার্বতীকে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, ওর দাদাকে বলে বাপের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিন, ওর ডিভোর্সটাও যাতে হয় সেই চেষ্টাও করুন। বলল, এসব কাজ আমাকে করতে হবে কেন?’
কিছুটা হাঁটার পর পার্বতী বলল, ‘তুমি আর কিছু বলনি?’
‘আর কী বলব?’
‘ডিভোর্সের পর আর যেটা করতে হবে।’
‘না। দোকানে খদ্দের আসতে শুরু করল তখন ওসব বলার সুযোগ ছিল না। হুট করে কি সিরিয়াস কথা বলা যায়? ফোন নম্বর নিয়েছি, ফোনেই বলব।’
.
৬
স্টেশনেই একটি ছেলে বলল, ‘স্যার যাচ্ছেন কোথায়, কলেজ তো বন্ধ।’
মৃণালকান্তি অবাক হয়ে বলল, ‘সে কী! এখনও ঘেরাও চলছে?’
‘ঘেরাও তো রাত দশটায় পুলিশ এসে ভেঙে দিয়েছে। সত্যবাবু অজ্ঞান হয়ে পড়াতে ওঁকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। তারপরই ম্যানেজিং কমিটির কেউ পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ প্রিন্সিপাল আর মন্মথবাবুকে ঘর থেকে বার করে নিয়ে আসে। আজ কলেজে এসে দেখলুম গেটে একটা নোটিশ লটকানো, অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ রাখা হল। আপনি আর গিয়ে কী করবেন, পরের ট্রেনেই বাড়ি ফিরে যান।’
বর্ধমানের ট্রেন আসছে। ছেলেটি ছুটল ট্রেন ধরতে। সত্যরঞ্জন ঘোষের বাড়ি বলদেবপুরেই। মৃণালকান্তির প্রথমেই মনে হল ওঁকে একবার দেখে আসা উচিত। তারপরই মাথায় ঘা দিল ছেলেটির কথাগুলো। অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ রাখা হল। তার মানে অফিসঘরও বন্ধ। কালোবাবুর সঙ্গে কবে দেখা হবে তার ঠিক নেই।
বলরামের দোকানের দিকে সে হাঁটতে শুরু করল। এখন এই লোকটিই তার ভরসা। ভাগ্যিস, কাল সে ওর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিল। এখন তো এই প্রাইভেটে ছেলে পড়ানোই তাকে বাঁচাবে। বলরাম এর মধ্যে কী ব্যবস্থা করল সেটার খোঁজ নেওয়া দরকার। করিতকর্মা লোক। বলা মাত্র হাতে পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিয়েছে যখন টাকাটা তুলে নেবার জন্য তখন চেষ্টা তো করবেই। কোচিংয়ের জন্য ঘর দিচ্ছে, ছাত্রও জুটিয়ে আনবে শুধু কিশোরকে গ্র্যাজুয়েট করার জন্য। হোক গ্র্যাজুয়েট।
দোকানে এসে মৃণালকান্তি আবার অবাক হল। লাল কালিতে বড়ো অক্ষরে লেখা একটা পোস্টার দরজায় সেঁটে ঝুলিয়ে দেওয়া—’ছাত্রদের জন্য সুখবর। অঙ্ক ও ইতিহাস শিক্ষার মহা সুযোগ। মধুসূদন বিশ্বাস সেন্টিনারি কলেজের সুযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক শ্রীমৃণালকান্তি চ্যাটার্জি, এমএ (গোল্ড মেডেলিস্ট) কলেজ ছুটির পর সপ্তাহে দু—দিন একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রদের অঙ্ক ও ইতিহাস কোচিং করবেন। অনুসন্ধান করুন এই দোকানে।’
‘গোল্ড মেডেলিস্ট’ দেখে মৃণালকান্তির কান গরম হয়ে উঠল। বলরাম বলল, ‘ঘর রেডি, ব্ল্যাক বোর্ড আজই পেয়ে যাব, রংটা শুকোতে দু—দিন সময় লাগবে। চেয়ার আছে, শেতলপাটিও আছে, টেবিলের কি খুব দরকার?’
‘হলে ভালো হয়, কিন্তু এটা কী লিখেছেন, ‘গোল্ড মেডেলিস্ট’? আমি গোল্ড কেন ব্রোঞ্জেরও মেডেল পাইনি।’
বলরাম ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে বলল, ‘চুপ চুপ। গ্রামেগঞ্জে এসব ভালো খায়, ইমপ্রেসড হয়। ওই যে শুভেন্দু ডাক্তার ওর এম বি বিএস—এর পাশে যে ডিজিএফ, ডিএমএস লেখা—এই নামে কোনো ডিগ্রি আছে নাকি? দেখুন গিয়ে চেম্বার ছাপিয়ে বাইরের রাস্তায় রুগি বসে।’
‘ওর এম বিবিএস—টা তো সত্যি।’
‘আপনার এমএ—টাও তো সত্যি। আপনি কি এখন কলেজে যাবেন? যা শুনছি তাতে কলেজ খোলার জন্য আন্দোলন হবে। আর সত্য ঘোষ যদি মরে—টরে যায় তা হলে এ কলেজ কত মাস যে বন্ধ থাকবে কেউ বলতে পারবে না। যত বন্ধ থাকবে তত আপনার কোচিংয়ে ছাত্র আসবে, ওদের তো পরীক্ষায় পাশ করতে হবে। আপনি ইংরেজি পড়াতে পারবেন? পারলে আপনারও রোজগার তিনগুণ বেড়ে যাবে।’
মৃণালকান্তি দ্রুত ভেবে নিল। বলরাম মন্দ পরামর্শ দেয়নি। সে বলল, ‘ভেবে দেখি। মাধ্যমিকের ইংরিজিটায় মনে হয় অসুবিধে হবে না, চালিয়ে দিতে পারব। ক্লাস ফাইভে এ বি সি ডি শেখা মাস্টারদের থেকে তো ভালো পারব। আপনাকে পরে জানাব। কিশোর কোথায়, সত্যবাবুর বাড়িটা চিনিয়ে দিত। ওকে একবার দেখে আসা উচিত।’
