‘তুমি বাড়ি থেকে এত দূরে একা এসেছ? সাহস তো কম নয়! বাড়ির কেউ জানে?’
‘পাগল। চুপি চুপি বেরিয়ে পড়েছি। আমি কিন্তু ওর সঙ্গে দেখা করব না। একবার শুধু ওকে দেখব বাইরে থেকে।’ পার্বতী হাসল।
ঝকঝক করে উঠল মুখটি। ‘একা বেরিয়েছি জানলে কপালে মার আছে।’ আবার সে হাসল।
‘দোকানটা নিশ্চয় তুমি আগে দেখেছ।’
‘দেখেছি।’
‘তা হলে দূর থেকে আমায় দেখিয়ে দাও। আর প্রসাদকে দেখতে কেমন?’
‘ফর্সা। বাঁদিকে পাট করে আঁচড়ানো চুল। ফুল হাত সাদা শার্ট পরত, এখনও পরে কি না জানি না—।’
‘ব্যস, ওতেই হবে।’
পার্বতী পনেরো গজ দূর থেকে ‘ভগবতী’কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে, সামনে মুখ তুলে সোজা হেঁটে চলে গেল, মৌসুমী দোকানে ঢুকল। ডানদিকে ইংরেজি ‘এল’ আকৃতির মতো লম্বা কাউন্টার, তার পিছনে দেওয়ালে দুই থাকে কাচের শো—কেস। নানা রঙের দামি ব্লাউজের কাপড় পাকিয়ে রিল করে এবং ভাঁজ করে সার দিয়ে দাঁড় করানো। কাউন্টারের উপর স্তূপ করা শার্ট ও ট্রাউজার্সের কাপড়। আর একদিকে বেডকভার ও পর্দার কাপড়। ফ্লুরোসেন্ট আলো কাচে প্রতিবিম্বিত হয়ে ঘরটা ঝকমকে দেখাচ্ছে। দিনের এই সময়ে দোকানে ক্রেতা কম থাকে, ভগবতীতে এখন একজনও খদ্দের নেই। মৌসুমী খুশি হল।
কাউন্টারের লোকটি এগিয়ে এল। এ যে প্রসাদ নয় দেখেই মৌসুমী বুঝল। বরং কাউন্টারের শেষ প্রান্তে মাথা নামিয়ে খবরের কাগজ পড়া টুলে বসা লোকটিকেই তার মনে হল প্রসাদ। গায়ের রং, চুল আর শার্ট পার্বতীর বলা বর্ণনারই মতো। লোকটি তাকে একবার দেখে নিয়ে আবার পড়ায় মন দিল।
‘ব্লাউজের কাপড় চাই রানি রঙের।’
কর্মচারীটি একটি কাপড় জড়ানো রিল বার করে গড়িয়ে দিয়ে মেলে ধরল। মৌসুমী আঙুল ঘষে কাপড়ের মসৃণতা পরখ করে বলল, ‘মিটার কত করে?’
‘আশি টাকা।’
‘এর থেকে ভালো আছে?’
ঘুরে দাঁড়িয়ে লোকটি আর একটা রিল বার করছে। মৌসুমী তখন চট করে দেখে নিল কাগজ—পড়া লোকটিকে। হাতে কাগজ ধরে মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে।
‘এটা দেখুন একশো টাকা মিটার।’
পঁচাশি সেন্টিমিটার ব্লাউজের কাপড় কিনে লোকটির কথামতো বিলটা হাতে নিয়ে মৌসুমী দাম দিতে সরে গেল কাগজপড়ার দিকে। দাম দিয়ে খুচরো ফেরত নিয়ে সে ঝুঁকে বলল, ‘আপনি কি প্রসাদবাবু?’
খুবই অবাক হয়ে প্রসাদ বলল, ‘হ্যাঁ’।
‘আপনি পার্বতীকে চেনেন?’
ভ্রূ কুঁচকে উঠল প্রসাদের, ‘চিনি। কেন?’
ফিসফিস করে মৌসুমী বলল, ‘পার্বতীর খুব বিপদ আপনার সাহায্য দরকার।’
‘বিপদ! আমার সাহায্য? কী ব্যাপার বলুন তো? আপনি কে?’
‘আমি ওর পাশের বাড়িতে থাকি। আমার নাম মৌসুমী। আপনি কি শুনেছেন ওর স্বামী লোকটি কেমন?
‘আহিরিটোলায় আমার চেনাশোনা অনেক লোক আছে তাদের কাছ থেকে আর আমার বন্ধু পার্বতীর দাদা পূর্ণেন্দুর কাছ থেকে যা শুনেছি তাতে তো ও একটা রাসকেল। বরং জানোয়ার বললেই ঠিক বলা হয়।’
মৌসুমী কর্মচারীটির দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করল। প্রসাদ তা লক্ষ করে বলল, ‘আপনি ভেতরে এসে কথা বলুন।’
কাউন্টার ঘুরে মৌসুমী ভিতরে গেল। প্রসাদ একটা টুল এগিয়ে দিতে সে দরজার দিকে মুখ করে বসল।
‘আপনি ঠিকই শুনেছেন লোকটা একটা জানোয়ারই। আমাদের বাড়ি থেকে ওদের ঘরটা দেখা যায়। দেখি তো পার্বতীকে যে কী মার মারে, দেখে শিউরে উঠতে হয়!’
মৌসুমী দেখল প্রসাদের মুখে বেদনার ছায়া পড়ল। খবরের কাগজটা মুঠোয় পাকিয়ে দুমড়ে ফেলল। ‘কেন, কেন এই অত্যাচার?’
‘টাকার জন্য।’
‘আমিও তাই শুনেছি পূর্ণেন্দুর কাছে।’
‘অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পার্বতী গলায় দড়ি দিচ্ছিল, আমি দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে না উঠলে ও ঠিক ঝুলে পড়ত। সহ্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে।’ মৌসুমী তখন দেখল বড়ো করে ঘোমটা দিয়ে পার্বতী দোকানের সামনে দিয়ে চলে গেল। চট করে একবার দোকানের ভিতরে তাকিয়েও নিল।
‘ওকে এখন বাঁচাতে হবে আর আপনিই তা পারেন। আপনি কি ওকে অন্তর থেকে ভালোবেসেছিলেন?’
প্রসাদ আজ কার মুখ দেখে উঠেছিল কে জানে! একটার পর একটা বিস্ময়ের ধাক্কায় সে বিভ্রান্ত হয়ে চলেছে।
‘ওসব কথা এখন আসছে কেন, পার্বতী এখন পরস্ত্রী।’
‘ওকে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আর আপনিই পারেন ওকে বার করে আনতে।’
স্থির চোখে তাকিয়ে রইল প্রসাদ। মৌসুমী অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। দু—জন মহিলা ক্রেতা দোকানে ঢুকল। অবশেষে প্রসাদের চোখ নড়ে উঠল, পলক পড়ল।
‘বেরিয়ে এসে ও যাবে কোথায়?’
‘বাপের বাড়িতে। ওকে যাতে থাকতে দেয় সেই ব্যবস্থাটা আপনাকে করতে হবে আপনার বন্ধুকে বলে। হয়তো জানেন দু—বার ও বাপের বাড়িতে এসে আশ্রয় চেয়েছিল, বাবা—মা ফিরিয়ে দেয়। এবার যাতে ফিরিয়ে না দেয়ে সেটা আপনি করুন আর একটা কাজ করুন, মানবতার খাতিরে করুন, পার্বতীর ডিভোর্সটা। একজন উকিলের সঙ্গে কথা বলা দরকার, সেটাও আপনাকে করতে হবে।’
‘এতসব কাজ আমাকে কেন করতে হবে, আর কি লোক নেই?’ প্রসাদ অধৈর্য বিরক্ত গলায় বলে দাঁড়িয়ে উঠল। খদ্দেররা দাম দিতে এসেছে প্রসাদ সরে গিয়ে কাউন্টারের ড্রয়ার খুলল। মৌসুমী উঠে দাঁড়াল।
‘আপনার টেলিফোন নম্বরটা দিন পরে কথা বলব। যদি পার্বতীর সঙ্গে কথা বলতে চান তা হলে ওর নম্বরটাও দিতে পারি।’
‘দরকার নেই।’ প্রসাদ খবরের কাগজের ওপর দিকের সাদা অংশে তার মোবাইল ফোনের নম্বর লিখে ছিঁড়ে দিল। ‘রাত দশটার পর আর সকাল বারোটার আগে দরকার হলে করবেন।’
