‘রোজগার তো লোক ঠকিয়ে বহু লোক করে, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ টাকা করে, শুধু তারাই কি ভালো লোক, ভালো জামাই, ভালো স্বামী? মা বলেছিল ‘মৌ তোকে একটা সৎ ছেলের হাতে দিতে চাই, একটা ভদ্র শিক্ষিত ঘরে দিতে চাই, তুই সুখে থাক আজীবন। বেশি আকাঙ্ক্ষা বেশি লোভ করিসনি।’ মৃণাল, আমি আকাঙ্ক্ষা করি কিন্তু লোভী নই।’ মৌসুমী অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে খুঁজল মৃণালকান্তির হাত। সেটা পেয়ে আঁকড়ে ধরে বলল, ‘তোমার বোধহয় ভয় হত?’
‘কীসের ভয়?’
‘প্রফেসর নও এটা যদি জেনে ফেলি!’
‘হ্যাঁ হত। বুকের মধ্যে একটা জায়গা সবসময় কুঁকড়ে থাকত। সবার কাছে নানাভাবে চাপা দেবার চেষ্টা করে গেছি, মা এখনও জানে না। বাবা জানে আমি ফুলটাইমার নই, সামান্য টাকা পাই, তাই ইলেকট্রিক বিলের টাকা ছাড়া আর কিছু চাননি আমার কাছে। ওটাও নেন আমার মুখরক্ষার জন্য, যাতে আমি ভাবি, সংসারে কিছু দিচ্ছি। কিন্তু আমি জানতুম না তুমিও আমায় এত দিচ্ছ।’
‘কী দিচ্ছি?’
মৃণালকান্তি জবাব দিতে গিয়ে চুপ করে গেল।
‘বলো না, কী দিচ্ছি।’ স্বামীর ঊরুতে চিমটি কাটল মৌসুমী।
‘সহানুভূতি। এটা যে কী বিরাট ভরসা আর সাহস এখন আমাকে দিল, কী যে হালকা লাগছে নিজেকে! তুমি যে আমার পাশে প্রথম দিন থেকেই আছ এটা জানতুম না। বুক থেকে একটা পাষাণভার নেমে গেল।’
মৌসুমীর হাতের তালু নিজের বুকে চেপে ধরে মৃণালকান্তি বলল, ‘দেখো।’
মৌসুমী বুকে হাত বুলিয়ে বলল, ‘সেই জায়গাটা কই যেখানটা সবসময় কুঁকড়ে থাকত?’
‘ভালো করে না খুঁজলে পাবে কী করে?’
‘তা হলে খুঁজি।’ মৌসুমী গলা ধরে স্বামীকে টেনে আনল বুকের উপর।
‘আমি কিন্তু আর প্রফেসর নই এখন থেকে অতিথি—শিক্ষক। মনে থাকবে?’
.
পরদিন মৌসুমী দুপুরে ফোন করল। একবার বাজতেই রিসিভার উঠল তাইতে সে বুঝল পার্বতী ফোনের অপেক্ষায় ছিল।
‘কে, পার্বতী? আমি মৌ, আর গোলমাল হয়নি?’
‘হয়নি।’
‘একটু তাড়াতাড়ি উত্তর দেবে। শ্বশুর—শাশুড়ি ঘুমোচ্ছে, ওরা জানে না তোমার সঙ্গে কথা বলেছি, তবে আমার বরকে জানিয়েছি। শোনো পার্বতী তোমার কোনো দেবদাস আছে?’
‘মানে!’
‘মানে কখনো প্রেম করেছ?’
ওধারে চুপ। মৌসুমী বুঝল প্রশ্নের উদ্দেশ্যটা বুঝতে চাইছে। কিছু একটা ব্যাপার একসময় কারও সঙ্গে ছিল। লজ্জায় বলছে না।
‘কী হল চুপ কেন, আরে বলো বলো আমার সময় কম।’
‘হ্যাঁ।’ অস্ফুটে বলল পার্বতী। ‘তবে ওপর ওপর। কেন জিজ্ঞেস করছেন?’
‘ওই যে বললে যেদিকে দু—চোখ যায় চলে যেতে ইচ্ছে করে। তাই একটা মতলব আমার বরের মাথায় এসেছে। এ ছাড়া তোমার পক্ষে বাঁচার আর কোনো রাস্তাও দেখছি না। শোনো তোমাকে সাহসী হতে হবে, বেপরোয়া হয়ে একটা কাণ্ড করে ফেল তো।’
‘কী করব?’ গলাটাকে উৎসুক মনে হল মৌসুমীর।
‘সে লোকটা কে যার সঙ্গে ওপর ওপর মানে, কীরকম ওপর ওপর? তোমার কি মনে হয় এখনও সে তোমাকে মনে রেখেছে?’
‘জানি না। বিয়ের আগে বাড়িতে ফোন করত, দাদার সঙ্গে খুব ভাব ছিল, আমাদের পাশের পাড়ার। অন্য কেউ ফোন ধরলেই দাদাকে চাইত।’
‘চিঠিপত্র দিত?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি দিয়েছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তোমার কাছে ওর চিঠি আছে?’
একটু চুপ থেকে, ‘আছে।’
‘একসঙ্গে কোথাও গেছ?’
‘দু—বার সিনেমায়, ম্যাটিনি শোয়ে। তা ছাড়া স্কুলে যাবার সময় ও সঙ্গে সঙ্গে যেত।’
‘কতদিন এটা চলছে?’
‘ক্লাস এইট থেকে।’
‘শোনো পার্বতী, ওর বাড়ির লোকজন, অবস্থা কেমন? বিয়ে—থা হয়ে গেছে কি না জান?’
‘হয়নি। ওরা দুই ভাই, ও বড়ো, আর আছে বাবা মা। নিজেদের বাড়ি। বি এ পাশ। ছিট কাপড়ের দোকান আছে হাতিবাগানে। রাধা সিনেমার কাছে । দোকানটার নাম ‘ভগবতী’। ওর ঠাকুরমার নাম। ‘দ্রুত বলে গেল পার্বতী।
‘ওর নাম কী?’
‘প্রসাদ, ওরা বসাক।’
‘আমি যদি গিয়ে প্রসাদের সঙ্গে কথা বলি তাতে তোমার আপত্তি আছে?’
‘কী জন্য কথা বলবেন?’
‘তোমাকে বিয়ে করার জন্য।’
‘আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে।’
‘হোক না, আবার করবে। মেয়েরা কি দু—বার বিয়ে করতে পারে না? পার্বতী, এই যে মার খাচ্ছ, আত্মহত্যা করতে যাচ্ছ এসব তো উচিত নয়। তোমার লেখাপড়া বেশিদূর নয়, ভালো কোনো কাজ তুমি পাবে না যে ডিভোর্স করে আলাদা থাকতে পারবে। হ্যাঁ, তোমাকে এই স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে যেতে হবেই চিরকালের মতো। তুমি নিশ্চয় এই লোভী নিষ্ঠুর লোকটাকে ভালোবাস না।’
‘না। একদমই না। আমি যদি বিধবা হয়ে যাই তা হলে সুখে থাকব। ভগবানের কাছে এই প্রার্থনাই করি আমাকে বিধবা করে দাও।’ মৌসুমী এই প্রথম পার্বতীকে উত্তেজিত গলায় কথা বলতে শুনল। তার মনে হল কথাগুলো সে অন্তর থেকে বলল।
‘বিধবা হতে হবে না, সধবা থাকারই চেষ্টা করো! তোমার একটা আশ্রয় চাই। দেখি প্রসাদ সেটা দিতে পারে কিনা। ও কখন দোকানে থাকে জানো?’
‘তখন তো সকালে ওর বাবা দোকান খুলত, ও যেত দুপুরে, খেয়েদেয়ে সন্ধেবেলায় ভাই যেত। দু—জন কর্মচারী ছিল। আচ্ছা দিদি আপনি কবে যাবেন ওর সঙ্গে দোকানে দেখা করতে?’
‘দেরি করব না, কাল দুপুরেই তিনটে নাগাদ যাব। এখন ফোন রাখছি অনেকক্ষণ কথা হল।’
পরদিন দুপুর তিনটেয় মৌসুমী বাড়ি থেকে বেরোল। ইন্দ্রাণীকে বলে রেখেছিল হাতিবাগানে যাবে ব্লাউজের কাপড় কিনতে। অটোরিকশা নেবে কি না একবার ভেবে নিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। মিনিট দশেক পর হাতিবাগানের মোড়ের কাছে পৌঁছে সে অবাক হয়ে দাঁড়াল। ঢাকাই শাড়ি পরা, ঘোমটা দেওয়া শ্যামবর্ণা মিষ্টিমুখের যে বউটি ট্রাম স্টপে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে, ওই তো পার্বতী! কী আশ্চর্য ও এখানে কেন? প্রসাদের সঙ্গে দেখা করবে বলে!
