মৌসুমী কান্না চাপার শব্দ পেল। কী বলে সান্ত্বনা দেবে সে ভেবে পেল না। নিজেকে সামলে নিয়ে পার্বতী আবার বলতে শুরু করল, ‘জানেন আমার পেটে একটা বাচ্চচা এসেছিল, সাত মাসে সেটা নষ্ট হয়ে যায় ওর ঘুসি খেয়ে। আজও পেছন থেকে এমন একটা লাথি মারল যে ছিটকে ঘরের বাইরে পড়ে গেলুম।’
‘দেখেছি সেটা। তুমি এখন চুপচাপ থাক। ঝগড়াঝাঁটি করে বরকে চটিয়ে দিয়ো না। তোমার ফোন নম্বরটা দাও। কখন ফোন করব?’
‘এই রকম সময়ে করবেন, আমিও করব। আজ আপনি যদি না চেঁচিয়ে উঠতেন তা হলে ঠিক আমি ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়তুম। এইভাবে বেঁচে থাকতে আর ইচ্ছে করে না।’
‘এখন কী ইচ্ছে করছে?’
উত্তরের জন্য উদগ্রীব হয়ে প্রতীক্ষা করল মৌসুমী। কিছুক্ষণ পর ক্ষীণ স্বরে পার্বতী বলল, ‘হ্যাঁ,’ আর একটু পর বলল, ‘কতদিন ইচ্ছে করবে জানি না। এ বাড়িতে কেউ আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলে না, আমার বাইরে বেরনো বারণ। মাঝে মাঝে মনে হয় যেদিকে দু—চোখ যায় চলে যাই।’
‘তোমার ফোন নম্বরটা এখনও বলনি। দাঁড়াও কাগজ আনি।’
মৌসুমী ঘর থেকে খাতা আর কলম নিয়ে এসে দেখল শাশুড়ি কলঘরে যাচ্ছে। সে রিসিভার তুলে বলল, ‘বলো।’ নম্বরটা লিখে নিয়ে বলল, ‘আজ এই পর্যন্ত, এখন আমি ফোন রাখছি।’
‘কে ফোন করেছিল বউমা?’ ইন্দ্রাণী কলঘর থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘আমার এক বন্ধু।’
রাত্রে বিছানায় শুয়ে মৌসুমী বলল, ‘আজ একটা ব্যাপার হয়েছে।’
মৃণালকান্তি অবাক হয়ে বলল, ‘ব্যাপার! আমারও তো আজ একটা হয়েছে। আগে শুনি তোমার ব্যপারটা।’
মৌসুমী তার সঙ্গে পার্বতীর টেলিফোনে যেসব কথাবার্তা হয়েছে তা বলল। মৃণালকান্তি ভারী স্বরে বলল, ‘তুমি একটা প্রাণ বাঁচিয়েছ। কাজটা খুব ভালো, তবে পার্বতীর ওই ভাবে বাঁচতে কতদিন ইচ্ছে করবে জানি না। ব্যাপারটা কিন্তু খুব গোলমেলে। এদের মতিস্থিরতা খুব কম, এরা খুব ইমোশনাল হয়, হয়তো কালই দেখবে ঝুলে পড়েছে।’
শুনেই মৌসুমীর বুকের ভিতরটা বসে গেল, নিজেকে সাহস জোগাবার জন্যই যেন বলল, ‘ও নিঃসঙ্গ বলেই এত ডিপ্রেশনে ভুগছে, জীবন সম্পর্কে এমন নেগেটিভ মনোভাবের খপ্পরে পড়েছে। আমি ভাবছি এবার থেকে ওর সঙ্গে কথা বলব। আচ্ছা তুমি ওর স্বামীকে চেনো? তোমার পাশের বাড়িরই তো ছেলে।’
‘চাঁদু আমার থেকে বয়সে একটু বড়ো। মাধ্যমিকটা টুকে পাশ করেছে তারপর আর পড়া এগোয়নি, পাড়ার ছেলে হলেও আড্ডাটা দিত অন্য পাড়ায়। এখানে ও মনের মতো বন্ধু পায়নি। রাস্তায় দেখা হলে, ‘কেমন আছিস’, আলাপটা ওই পর্যন্ত। যারা লেখাপড়া করত তাদের ও দু—চক্ষে দেখতে পারত না, আমাকে তাই খুবই অপছন্দ করে। ওদের বাড়ির শিক্ষাদীক্ষা কালচার কেমন সেটা তো পার্বতীর কথা থেকেই বুঝে গেছ। খুব বড়ো ধরনের মাস্তান না হলেও আমাদের আর আশপাশের মধ্যবিত্ত পাড়ার পক্ষে যথেষ্ট ভয়াবহ, ক্ষতিকর। ঘরের মধ্যে চাঁদু কাকে মারধর করছে তাই নিয়ে ওকে ঘেন্না ছাড়া আর কী করতে পারি!’
‘পার্বতী কোর্টে যেতে পারে। স্বামী অত্যাচার করে বলে ডিভোর্স চাইতে পারে খোরপোশ সমেত।’
অত্যাচার যে করে তার প্রমাণ দিতে হলে সাক্ষী দরকার। একজন সাক্ষীকেও পার্বতী কোর্টে নিয়ে যেতে পারবে না। তার থেকে বরং তুমি ওকে জিজ্ঞেস করো ওর কোনো প্রেমিক ছিল কি না। যদি থাকে তা হলে খোঁজ নিতে বলো সে এখনও আনম্যারেড কি না, যদি আইবুড়ো থেকে থাকে তা হলে এক্ষুনি যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রেমটা ঝালিয়ে নেয়। তারপর বাড়ি থেকে টুক করে কেটে পড়ে প্রেমিককে বিয়ে করে ফেলুক। ছেলেপুলে নেই অসুবিধে হবে না। হেসো না, এমন ঘটনা এই পাড়াতেই ঘটেছে, তা না হলে বুদ্ধিটা আমার মাথায় এল কী করে?’
‘ডিভোর্স না করেই আবার বিয়ে করা যায় নাকি?’
‘না, না, আগে ডিভোর্স।’
‘মামলাটা এখানে থেকেই করবে?’
‘তা কেন, বাপের বাড়িতে গিয়ে সেখান থেকে করবে।’
‘বাপ—মা করতে দেবে না।’
‘দেবে, দেবে, আগে নিজের বিয়ের ব্যবস্থাটা করে ফেলুক তখন দেবে।’
.
৫
‘পার্বতীর কথা থাক এবার বলো তোমার আজ কী ব্যাপার হয়েছে।’
মৌসুমী পাশ ফিরে স্বামীর বুকের উপর হাত রাখল। মৃণালকান্তি চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ পর অধৈর্য হয়ে মৌসুমী বলল, ‘কী হল, চুপ করে আছ কেন?’
‘বলছি। তোমাকে যে পাঁচশোটা টাকা দিলুম, কীভাবে টাকাটা পেয়েছি জান?’
‘না বললে কী করে জানব!’
‘প্রাইভেট টিউশনি কখনো করব না, মন দিয়ে ছাত্র পড়াব, নিজে পড়াশুনো করব, ফাঁকি দেব না পড়াতে—আমার এই প্রতিজ্ঞা বিক্রি করে টাকা এনেছি।’ মৃণালকান্তি উত্তেজিতভাবে উঠে বসল। ‘আমি তোমাদের ঠকিয়েছি। আমি মোটেই প্রফেসর নই, গেস্ট লেকচারার, অতিথি—শিক্ষক, কী গালভরা একটা নাম। যেকোনো সময় কলেজ আমায় ছাঁটাই করে দিতে পারে। এসব তোমরা জানতে না, তোমরা খোঁজখবর করনি।’
‘কে বলল আমরা করিনি!’ মৌসুমী ছাড়া গলায় বলল। ‘মা অফিসের একজনকে দিয়ে মধুসূদন বিশ্বাস কলেজে দু—তিনজনের কাছে খোঁজ নিয়েছিল। তোমার চাকরি সম্পর্কে সব শুনেও মা রাজি হয়েছে। আমিও সব শুনেছি। মাইনে প্রায় কিছুই নয়, তাতে কী হয়েছে, বিয়ের জন্য ওটাই কি একমাত্র ক্রাইটেরিয়া?’
‘কী বলছ, রোজগারটাই তো আসল জিনিস!’ মৃণালকান্তিও অবাক হল। সে আশা করেনি তার বউ এমন সহজভাবে ব্যাপারটা নেবে।
