উনি কী করে জানলেন আমি ভালো ছেলে? অনন্ত অবাক হল। বোধহয় সন্দেশ ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা থেকেই ওঁর ধারণা হয়েছে। বহুদিন সে মনে মনে আক্ষেপ করেছে, অমরকে ভাবে চোর প্রতিপন্ন না করালেও হত, হাজার হোক ভাই তো কিন্তু এখন তার মনে হল শাপে বরই হয়েছে।
‘হ্যাঁ করব।’ কোনোক্রমে কথাটা সে বলতে পারল। হাঁটুদুটো মাখনের মতো লাগছে হয়তো সে দুমড়ে পড়ে যাবে। চেয়ার আঁকড়ে থাকা আঙুলগুলোর গাঁট টনটন করে উঠল।
‘এখন যা পাচ্ছ তার থেকে বেশিই যাতে পাও দেখব। বোসো, একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি, কালই কি যেতে পারবে? সকাল দশটার পর…তার আগে ঘুম থেকে ওঠে না।’
অনন্ত মাথা হেলাল কিন্তু চেয়ারে বসল না। সাধন বিশ্বাস কলমদানি থেকে লাল কলমটা তুলে তাঁর নাম ছাপা প্যাডে যতক্ষণ ধরে চিঠি লেখায় ব্যস্ত রইলেন ততক্ষণ নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি ছাড়া আর কিছু শুনতে পেল না, চোখে একটা ঝাপসা পর্দা নেমে এসেছে যার ওধারে সাধন বিশ্বাসকে ছায়ার মতো লাগছে।
চিঠিটা চার ভাঁজ করে এগিয়ে দিলেন।
‘দেরি কোরো না কালই যাও।’
টেবলটা দ্রুত ঘুরে গিয়ে অনন্ত নীচু হল প্রণাম করতে। হরিণের চামড়ার চটির মাথায় পা ঢোকানো। গোড়ালিদুটো যেন শ্বেতপাথরের। চামড়ার উপর আঙুল বোলানোর সময় শিরশির করে উঠল তার মেরুদণ্ড।
‘থাক থাক…ভালো করে কাজ কোরো।’
‘কোথায় যেতে হবে?’
‘খুব বেশি দূরে নয়, রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটে পরেশনাথ মন্দিরের কাছেই, ঠিকানা লিখে দিয়েছি…সমীরেন্দ্র বসুমল্লিক, ফটকে লেখা আছে অঘোর এস্টেট…ওর ঠাকুরদার নাম।
সদর দরজায় অনু দাঁড়িয়ে, তার পাশে শীলা। তার জন্যই অপেক্ষা করছে। সাধন বিশ্বাসের ঘরটার আধখানা এখান থেকে দেখা যায়।
‘দাদা, তোকে কী লিখে দিল রে?’
অনন্ত দু—জনের মুখের দিকে বিহ্বলচোখে তাকিয়ে শুধু বলল, ‘ভগবান আছে।’
তিনজনে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। চেয়ারে হেলান দিয়ে সে প্রত্যেকের মুখের দমবন্ধ কৌতূহল তারিয়ে তারিয়ে চাখল।
‘বললেন একটা চাকরি আছে, করবে?’
‘কী বললি?’
‘করব বললুম।’
‘কোথায়, কীসের চাকরি, কত দেবে?’
সেদিন রাতে অনন্ত ঘুমের মধ্যে বার বার ছটফট করল। সকালে ঘুম ভেঙে যেতেই সে পাশের ঘরে কথাবার্তার শব্দ পেল।
‘ইস্ত্রি না করলে এই পরে যাবে নাকি? চেয়ে আন ইস্ত্রিটা। চটি জোড়ায় কালি দিয়ে দে।’
রাতে উঠোনে ধুতি আর শার্ট নিয়ে মা সাবান দিতে বসে। দোতলা থেকে তখন জেঠিমা চেঁচিয়ে বলেছিল, ‘এত রাতে কাচাকুচি করছ যে?’
‘অনন্ত কাল নতুন চাকরিতে জয়েন করবে।’
চিত হয়ে অন্ধকার ঘরে সে হেসেছিল। চাকরিই হল না আর কিনা জয়েন?
‘কোথায় গো?’
‘এক জমিদারের আপিসে।’
অঘোর—এস্টেট খুঁজে নিতে অনন্তর অসুবিধা হয়নি। লোহার ফটক থেকে মাটির পথ অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরে বারান্দার নীচে পৌঁছেছে। টানা তিন ধাপ সিঁড়ি, ডান দিকে বেলেপাথরের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে, বাঁদিকে পরপর কয়েকটা ঘর, সামনে পাথরের উঠোন আর ঠাকুর দালান।
সিঁড়ির পাশে একটা বেঞ্চে দুটি লোক বসে। চাহনি আর বসার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায় বাইরের লোক, কোনো কাজের জন্য এসেছে। বাঁদিকের ঘরগুলো থেকে লোকজনের গলা পাওয়া যাচ্ছে। অনন্ত উঁকি দিয়ে দেখল প্রথম ঘরটার অর্ধেক জুড়ে নীচু তক্তাপোশ, তাতে শতরঞ্চি পাতা। জানলার কাছে বাবু হয়ে বসে এক প্রৌঢ়, কোলের কাছে রাখা ডেস্কে ঝুঁকে একটা কাগজ থেকে দেখে দেখে খাতায় লিখছে। ঘরের কড়িকাঠ থেকে লোহার শিকে আটকানো দু—সারি কাঠের তাক ঝুলছে, মোটা মোটা ধুলো লাগা খাতা আর কাগজপত্রে সেগুলো ঠাসা। পাশের ঘরটায় কয়েকটা টেবল—চেয়ার। নানানরকমের কাগজে আর খাতায় টেবলগুলো ভরা। দেখে মনে হয় না ওগুলো কখনো নাড়াচাড়া করা হয়েছে। দুটো স্টিলের আলমারি ছাড়াও কাঠের র্যাক তিনদিকের দেওয়াল ঢেকে ফেলেছে। এখানেও খাতা আর কাগজ। পুরোনো একটা পাখা কিচকিচ শব্দ করে ঘুরছে। পিছন ফিরে একটি লোক চেয়ারে বসে।
অনন্ত বুঝতে পারছে না সমীরেন্দ্র বসুমল্লিকের সঙ্গে সে কীভাবে দেখা করবে। কোনো চাকর বা দারোয়ানকে দেখতে পাচ্ছে না। এত বড়োলোক এত বিষয়সম্পত্তি, সে ভেবেছিল দেখবে ঝকঝকে সাজানো অফিস, লোকজন গিজগিজ করছে। তার বদলে এমন নির্জন পুরোনো একটা বাড়ি, যার মেঝেয় সিমেন্টের চটা ওটা, দেওয়ালে নোনা, জানলা দরজার কাঠ ময়লা, শার্সির কাচ ভাঙা—দেখে সে দমে গেল।
‘কী চাই?’
অনন্ত ঘরে ঢুকল। প্রৌঢ় চশমাটা আঙুল দিয়ে ঠেলে নাকের উপরে তুলে তার দিকে তাকিয়ে।
‘সমীরেন্দ্র বসুমল্লিকের সঙ্গে দেখা করব।’
‘কী দরকার?’
‘একটা চিঠি এনেছি।’
‘কার কাছ থেকে?’
‘সাধন বিশ্বাস, অ্যাটর্নি।’
প্রৌঢ় হাত বাড়াল।
‘দেখি।’
অনন্ত চিঠিটা দিতে চটি খুলে তক্তাপোশে উঠল। চিঠিটা ইংরেজিতে। তাতে অল্প কথায় লেখা, যে—ছেলেটির কথা বলেছি তাকে পাঠালাম। অনেকক্ষণ ধরে পড়ার পর প্রৌঢ় তার আপাদমস্তক দেখে হাঁক দিল, ‘যুগল’। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই শুধু দোতলা থেকে কুকুরের ডাক শোনা গেল। প্রৌঢ় এবার গলা চড়িয়ে ডাকল।
‘কী বলছেন?’
দরজায় দাঁড়িয়ে ধুতি—গেঞ্জি পরা একটি লোক, প্রৌঢ়রই বয়সি। বোঝা যায় পুরোনো চাকর।
‘দেখা করতে এসেছে, অ্যাটর্নিবাবু চিঠি দিয়ে পাঠিয়েছেন।’
যুগল চিঠিটা নিয়ে দোতলায় উঠে গেল। মিনিট দুয়েক পর নেমে এসে বলল, ‘যান।’
