সিঁড়িটা বাঁক নিতেই সামনের দেওয়ালে মানুষ প্রমাণ একটা আয়না। কাচের বহু জায়গায় কালো ছোপ পড়েছে। সোনালি চওড়া ফ্রেমটা বিবর্ণ। অনন্ত নিজের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে পেল। এই প্রথম সে জানতে পারল নিজের পুরো চেহারাটা কেমন।
সিঁড়িটা পৌঁছেছে লম্বা একটা দালান ঘরের প্রান্তে যার অপর প্রান্তে কয়েকটা সোফা এবং গদি আঁটা পুরোনো চেয়ার ও নীচু টেবল। পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পরা গৌরবর্ণ, সুদর্শন একটি লোক সোফায় হেলান দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন, পায়ের উপর পা তোলা। একটা অ্যালসেশিয়ান কার্পেটের উপর দেহ ছড়িয়ে দু—পায়ের মধ্যে মুখ গুঁজে, অনন্তকে সে চোখ তুলে একবার দেখল মাত্র।
টেবলে সাধন বিশ্বাসের চিঠিটা একটা অ্যাশট্রে দিয়ে চাপা। অনন্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। একসময় কাগজটা মুখের সামনে থেকে সরিয়ে তাকালেন, চোখের মণিদুটো বিষণ্ণ, গভীর ও বড়ো। ঘুমের রেশ তখনও জড়িয়ে রয়েছে।
অনন্ত ঠিক করে রেখেছিল প্রণাম করবে। করতে পারল না। কী যেন একটা নিস্পৃহ দূরত্ব মানুষটির অচঞ্চল ভঙ্গি থেকে তৈরি হয়ে রয়েছে, যা ভেদ করে এই ঘর, আসবাব, এমনকী বাইরের পৃথিবীও লোকটির কাছাকাছি যেতে অক্ষম। সে বুকের কাছে দুই মুঠি ধরে দাঁড়িয়ে রইল। এই লোকটির ইচ্ছা—অনিচ্ছার উপর তার জীবনের ধারা বদলাবে।
‘বয়স কত…কুড়ি?’
অনন্তের ভরসা হল না কথা বলতে। শুধু হাসল।
চিঠিটা তুলে চোখ বোলালেন, একবার তাকালেন অনন্তের দিকে। কয়েক সেকেন্ড কী ভাবলেন।
‘নীচে গিয়ে বোসো, আর অজয়বাবুকে পাঠিয়ে দাও।’
কে অজয়বাবু সে জানে না, নীচের ঘরের প্রৌঢ়ই সম্ভবত। সিঁড়িতে সে মুখ ফিরিয়ে আয়নায় আবার নিজেকে দেখল। এই কয়েক মিনিটে তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেছে বলে মনে হল না। সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে তার মনে পড়ল নমস্কার করে আসা হয়নি।
প্রৌঢ়ই অজয়বাবু। পরে জেনেছে ওর পুরো নাম অজয় হালদার। দোতলায় উঠে গিয়েই তাকে প্রায় তখুনি নেমে আসতে দেখে অনন্তের বুক কেঁপে উঠল। এত তাড়াতাড়ি ফিরে এল, তার মানে, বিদায় করে দাও! বেঞ্চে বসা লোকদুটিকে ইশারায় উপরে যেতে বলে অজয়বাবু গম্ভীরমুখে নিজের জায়গায় বসে বলল, ‘তোমার নাম কী?’
‘অনন্তকুমার দাস।’
‘বাবার নাম?’
‘ঈশ্বর শক্তিপদ দাস।’
‘বড়োছেলে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘কে কে আছে?’
‘মা, এক ভাই, দুই বোন। আমি বড়ো।’
‘কদ্দুর লেখাপড়া?’
‘স্কুল ফাইনাল দোব, প্রাইভেটে…রাতে কোচিং—এ পড়ি। বাবা হঠাৎ বাস অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন, তাই স্কুল…টাকাপয়সা কিছু রেখে যাননি।’
‘ঘটি না বাঙাল?’
‘ঘটি।’
‘এখানে বসে কাজ করার মতো ব্যাপার খুব কম। যখন জমিদারি ছিল তখন এখানে কাজ ছিল, অনেক লোকও ছিল। এখন যা—কিছু ব্যবসার কাজটাজ ধর্মতলা স্ট্রিটের অফিস থেকে হয়। বুলুবাবু ওখানেই বসেন।’
অজয়বাবু চশমায় ঠেলা দিয়ে জানলার বাইরে তাকাল। অনন্ত মনে মনে অধৈর্য হয়ে উঠেছে। ধান ভানতে শিবের গীত গাইছে, কাজটা হবে কি হবে না সেটা আগে বলুক। প্রৌঢ় জানলা থেকে চোখ ঘরের মধ্যে এনে তাকের উপর দিয়ে বিষণ্ণ চাহনি বুলিয়ে অনন্তের মুখে বসাল।
‘তুমি কাল থেকে কাজে এসো। যা করার সব কাল বুঝিয়ে দেব।’
‘এই সময়ে আসব?’
‘তাই এসো। আসল কাজ বাইরে, ভাড়াটেদের কাছ থেকে ভাড়া আদায়। অনেক টাকা মার গেছে, বছরের পর বছর ভাড়া বাকি, আদায় হয়েছে জমা পড়েনি…ভাড়াটে আছে কিন্তু আমাদের খাতায় নাম নেই অথচ তার কাছ থেকে ভাড়া আদায় হচ্ছে…এইসব। ভালো ভাড়াটেও আছে। রাজাবাজারের বস্তিটা গণিকে লিজ দেওয়া, গণির ভাড়ার টাকা মাসে মাসে ঠিক এসে যায়। এন্টালি আর আহিরিটোলার বাড়ি দুটোতেই যত ঝামেলা। সব পুরোনো ভাড়াটে, চল্লিশ—পঞ্চাশ বছর ধরে এক—একজন বাস করছে। আর দুটো বাড়ি টেরিটি বাজারে, সবই অফিস, ঠিক সময়ে দিয়ে দেয়।’
অজয়বাবু নীচু স্বরে ধীরে ধীরে যা বললেন তার বেশিরভাগই অনন্তের কানে পৌঁছল না। সে বুঝে গেছে কাজটা সে পেয়েছে, সত্যিকারের একটা চাকরি। সংসারের মাথার উপর এবার একটা চালা বসল।
ধীরে ধীরে তার চোখ জলে ভরে এল। কার কাছে সে কৃতজ্ঞতা জানাবে? সমীরেন্দ্র বসুমল্লিক…অজয়বাবু…সাধন বিশ্বাস নাকি অমর?
‘এস্টেটের নিয়ম হয়েছে ধর্মতলা অফিসের মতো এখানেও একই স্কেলে মাইনে দেওয়া হবে।…প্রথম ছ—মাস প্রোবেশনার, থোক আড়াইশো পাবে।’
‘কত?’
অজয়বাবু আবার বলল, অনন্তের কানে এল মা যেন বলছে, ‘আর একটু ভাত নে।’
‘কাঁদছ কেন?’
‘রাতে আমার ঘুম হত না। কী করে সংসারটা চালাব ভেবে পেতাম না। সবাই আমার মুখ চেয়ে আছে, বড়োছেলেই তো বাবার জায়গা নেয়।’
‘ছ—মাস পর যদি পাকা হও তখন হাতে তিনশো টাকার মতো পাবে।’
ছয়
রাস্তায় দাঁড়িয়ে সেদিন চারপাশের বাড়ি, মানুষ, যানবাহন, দোকান, ফেরিওয়ালা এমনকী রাস্তার জঞ্জালও তার কাছে নতুন এবং বিস্ময়কর মনে হচ্ছিল। অসহায়ভাবে সে বুঝতে পারছিল না তার পৃথিবীটা হঠাৎ বদলে যাচ্ছে কেন! তার বোধের আয়ত্তে থাকছে না কেন? সে কোথাও কোনো ত্রুটি দেখতে পাচ্ছে না। শুধু মনে হচ্ছে মানুষ এবং বাড়িগুলো একটু ছোটো হয়ে গেছে, অথচ সবই রয়েছে পুরোনো শৃঙ্খলা মেনে।
সেদিন হাঁটতে গিয়ে তার পদক্ষেপ বার বার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। লোকে কি মাতাল ভাববে? সে আপনমনে হেসে ইচ্ছে করে আরও এলোমেলো পা ফেলছিল। জামার হাতায় চোখের জল মুছেছিল। কী অদ্ভুতভাবে একটা নতুন রাস্তা তার সামনে এসে গেল। এই রাস্তা ধরে তাকে সাবধানে এগোতে হবে, সংসারটাকে সঙ্গে নিয়ে।
