অনন্ত শুধু তাকিয়ে রইল। ঠিক এইভাবে এই ঘরেই সে একদিন শুনেছিল, ‘ভাগ্য যদি অন্যরকম অবস্থায় ফেলে দেয় তা হলে আর কী করার থাকতে পারে। মা—কে দেখা, ভাইবোনদের মানুষ করে তোলা, নিজেকে নিজে বড়ো করা…’
সে মুখ নামিয়ে বুকের মধ্যে আটকে রাখা বাতাস নাক দিয়ে বার করার সময় বলল, ‘দেখি।’
‘দেখি আবার কী? তোর মতো ভালো ছেলের না পারার তো কথা নয়!’
‘পারবে না কেন, খুব পারবে।’
শীলা এমন এক সরল প্রত্যয় নিয়ে বলল যে ভয় পেয়ে অনন্ত রেগে উঠল। তীক্ষ্ন—চোখে সে তাকাল।
‘আমার পড়াশুনোর ব্রেন নেই, থাকলে কি ফেল করতুম?’
‘তোকে তো ফার্স্ট—সেকেন্ড হতে হবে না, শুধু পাশটা করতে হবে চাকরি পাবার জন্য। খাটলেই পাশ করা যায়।’
অনন্ত আবার মুখ নামিয়ে ফেলল। তাকে আবার বই নিয়ে বসতে হবে। আবার অঙ্ক, গ্রামার, এসে, সংস্কৃত, লেটার রাইটিং, মুখস্থ আর মুখস্থ। ভালো ছেলেরা পারে, পারতেই হয়, তাদের বড়ো হতে হয়, সবাইকে দেখতে হয়।
ক্লান্তচোখে সে তার ভবিষ্যৎ জীবনের দিকে তাকিয়েই যেন বলল, ‘ঠিক আছে।’
পাঁচ
ছ—মাসে নয়, অনন্ত প্রথমবার ফেল করে পরের বার কোনোক্রমে পাশ করেছিল। কিন্তু তারই মধ্যে জীবন একটা বাঁক নিয়ে কিঞ্চিৎ স্বস্তি এনে দেয় তাদের সংসারে। সে আড়াইশো টাকার একটা চাকরি পেয়ে যায়।
সেদিন অশোকবাবুর কোচিং থেকে ফিরতে তার রাত হয়ে গেছল। তাকে আটকে রেখেছিলেন একটা প্যাসেজ ইংরেজিতে নির্ভুল অনুবাদ করাবার জন্য। একসময় বিরক্ত হয়ে তিনি বলে ওঠেন, ‘বাড়ি যা, তোর দ্বারা এসব হবে না। তোর ভাইয়ের পেছনে এর ওয়ান—টেন্থও খাটতে হয়নি অথচ কী রেজাল্ট করল, আর তুই…’
অনন্ত বিষণ্ণমনে বাড়ি ফেরার সময় ঠিক করে ফেলে প্রত্যেকদিন ভোরবেলায় সে একপাতা করে গ্রামারও মুখস্থ করবে।
বাড়িতে পা দেওয়ামাত্র শীলা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘উৎপলদের চাকরটা তোকে ডাকতে এসেছিল, ওর বাবার কী যেন দরকার তোকে। এলেই যেতে বলেছে, কীজন্য তা আর বলল না।’
অনন্ত অবাক হয়ে বলল, ‘আমাকে! ব্যাপার কী? আমার সঙ্গে তো ওনার জীবনে কখনো কথা হয়নি।’
তারপরই মনে পড়ল সন্দেশগুলো সে ওঁকেই ফেরত দিয়েছিল, তখনই প্রথম দু—চারটে কথা বলেছিলেন। উৎপলের বাবা সাধন বিশ্বাস পেশায় অ্যাটর্নি। কাঁচাপাকা চুল, কখনো ইস্ত্রিবিহীন পাঞ্জাবি বা পাজামা পরেন না। গালদুটি সর্বদা মসৃণ, পায়ে চটি। একটা ভক্সহল মোটরে অফিসে বেরোন। সন্ধ্যার পর একতলার ঘরে ওঁকে দেখা যায়। চামড়ামোড়া গদির চেয়ারে বসে লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে। ঘরের এককোণে পিছন ফিরে একটা লোক টাইপ করে যায় রামকৃষ্ণদেবের ছবিটার নীচে চেয়ারে বসে।
‘গিয়ে দেখ না একবার, ঘরে তো আলো জ্বলছে।’
শীলার মতো অনু—অলুও উদগ্রীব চোখে তাকিয়ে। সে নিজেও কৌতূহলী হয়ে উঠেছে ওদের মতো।
সাধন বিশ্বাসের ঘরের দরজা থেকে সে সন্তর্পণে উঁকি দিল। টাইপিস্ট তার কাজে ব্যস্ত। সাধন বিশ্বাস চেয়ারে হেলান দিয়ে মনোযোগে কী একটা পড়ছেন। সে বুঝে উঠতে পারছে না এখন তার কী করা উচিত।
উনি মুখ তুললেন এবং দ্রুত আড়ালে সরে—যাওয়া অনন্তের উদ্দেশে বলে উঠলেন, ‘কে ওখানে?’ সাড়া না পেয়ে আবার বললেন, ‘ওখানে কে?’
‘আমি সামনের বাড়ির অনন্ত।’
চেনার জন্য কয়েক সেকেন্ড মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘ও, এসো।’
অনন্ত পা টিপে ঘরে ঢুকল। মোজাইকের ঝকঝকে মেঝেয় ফুলের নকশা, মাড়াতে অস্বস্তি হয়। চেয়ারের পিঠ ধরে সে দাঁড়াল।
সাধন বিশ্বাসের ঠোঁটে হাসি দেখে সে বিভ্রান্ত হল, কোনো ধারণায় আসতে পারছে না কেন তাকে ডেকেছেন!
‘দেরি করলে যে?’
‘কোচিং থেকে ফিরতে ফিরতে…’
‘কী পড়তে যাও?’
‘প্রাইভেটে স্কুল ফাইনাল দোব…দেবার ইচ্ছে আছে।’
‘সারাদিন কী করো?’
‘একটা দপ্তরিখানায় কাজ শিখতে যাই।’
‘অ্যাপ্রেন্টিস?…কত পাও?’
অনন্তর চোখে ভেসে উঠল গৌরীর মুখটা আর সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেল, ‘য়্যাঁ, মোটে চল্লিশ!’ টাকার পরিমাণটা অসম্মানজনক, যে—কেউ শুনলেই তার সম্পর্কে ধারণা নীচে নামিয়ে দেবে।
‘কমই দেয়…একশো চল্লিশ।’
একবার মুখের দিকে তাকিয়ে সাধন বিশ্বাস কলমটা টেবলে ঠুকতে শুরু করলেন। অনন্ত ভয় পেল, মিথ্যাটা কি ধরে ফেলেছেন? হয়তো কোনোভাবে শুনেছেন কত পায়।
‘একটা চাকরি আছে সৎ আর বিশ্বাসী লোক দরকার, তোমার কথা মনে পড়ল। করবে?’
‘কী কাজ?’ অনন্তের শ্বাসকষ্ট শুরু হল।
‘আমার বন্ধু আবার ক্লায়েন্টও, কলকাতায় অনেক বিষয়সম্পত্তি আছে, বস্তি আছে একটা, বাড়ি আছে গোটাচারেক, নতুন একটা ফ্ল্যাটবাড়িও তৈরি করছে পার্ক সার্কাসে, শিবপুরে পেট্রল পাম্প, দেশে জমিজমা সিনেমা হল আছে, তা ছাড়া কয়লার ব্যবসা ওষুধের দোকান…নিজে কিছুই দেখে না, বনেদি বড়োলোক হলে যা হয়, কর্মচারীরাই সব দেখে আর দু—হাতে চুরি করে…সে থাক গে, ওর এস্টেটে একটা চাকরি খালি আছে, করবে?’
‘কী চাকরি?’
‘ভাড়া আদায় করার। এতকাল যে করত তাকে সরিয়ে ওষুধের দোকানে বসাচ্ছে, বাবার আমলের লোক তাই আর ছাড়ায়নি। কাজটা টাকাপয়সা নিয়ে। ভাড়া কালেকশন করতে টেনান্টদের ঘরে ঘরে যাওয়া, ভাড়াটেদের দেখাশোনা, বাড়ির মেরামতি, ট্যাক্স দেওয়া, আদায়ের হিসাবপত্তর রাখা, টাকা জমা দেওয়া, এই হল কাজ। কিন্তু চুরির সুযোগ আছে তাই একজন সৎ বিশ্বাসী লোক এখুনি চাই। আজই কথা হচ্ছিল, আমি বলেছি আমার জানা একটি ভালো ছেলে আছে, সামনের বাড়িতেই থাকে।…করবে?’
