বউটি ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে এসে তাদের রান্নাঘরের জানলার দিকে তাকিয়ে রেলিং ধরে দাঁড়াল। মৌসুমী জানলা দিয়ে হাত বার করে নাড়তে নাড়তে চেঁচিয়ে বলল, ‘না, না, কোরো না।’
বউটি ক্লান্তভাবে মাথাটি হেলিয়ে দিল, একচিলতে হাসি খেলে গেল ঠোঁটে। আঁচল দিয়ে মুখ মুছল। মৌসুমীর মনে হচ্ছে ও ভীষণ নার্ভাস। বোধহয় বুঝতে পেরেছে যমের বাড়ি থেকে ফিরে এল। সে আবার বারণ করার ভঙ্গিতে দু—হাত নাড়ল। এখন তার নিজেরই নার্ভাস লাগছে। বাধা পাওয়ায় রেগে গিয়ে যদি আবার চেষ্টা করে? বউটি একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল যেটা আগের নির্বোধ—হাসিটার মতো নয়, এতক্ষণে নিশ্চয় মাথায় সাড় ফিরে এসেছে নইলে এমনভাবে হাসতে পারত না। একটা জীবন রক্ষা করার আনন্দ এখন মৌসুমীর চেতনাকে ধুইয়ে দিচ্ছে, তার মনে হল বউটির সঙ্গে একবার কথা বলা দরকার। ওকে বুঝিয়ে বলতে হবে বেঁচে থাকার থেকে কাম্য আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু কী করে কথা বলা যায়? ওদের বাড়িতে তাকে শ্বশুর—শাশুড়ি যেতে দেবেন না আর ওর পক্ষেও এ বাড়িতে আসা সম্ভব নয়। ওদের ঘরে টেলিফোন আছে কি?
মৌসুমী হাত তুলে চেঁচিয়ে বলল, ‘দাঁড়াও।’ তারপর ছুটে শোবার ঘরে এল। খাতা থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে দ্রুত লিখল—যদি টেলিফোন থাকে তা হলে এই নম্বরে এখুনি আমায় ফোন কর। কথাগুলোর নীচে বড়ো অক্ষরে তাদের নম্বরটা লিখল।
এবার এটা ওর কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং গোপনে। একমাত্র উপায় ছুড়ে দেওয়া। অতদূর পর্যন্ত চেঁচিয়ে কোনোভাবে কথা হয়তো পাঠানো যায় কিন্তু এই কাগজটা? ঘরের চারধারে তাকাল সে ভারী একটা কিছুর খোঁজে। যা কিছুই চোখে পড়ল সবই হালকা, তাই দিয়ে ছুড়ে দিলে অতদূর পৌঁছবে না। কাশির সিরাপের খালি শিশিটা দেখে তার মনে হল বোধহয় এটায় চলবে। হাতে নিয়ে শিশিটার ওজন অনুমান করে দেখল বেশ ভারীই। কাগজটা ভাঁজ করে তার মধ্যে ঢুকিয়ে সে রান্নাঘরে এল। পলিথিনের থলিগুলো একধারে জড়ো করে রাখা তারই একটার মধ্যে শিশিটা ভরে প্যাঁচাল, রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধল। জানলা দিয়ে দেখল বউটি এখনও দাঁড়িয়ে, মৌসুমী ছাদে যাবার জন্য সিঁড়ির দিকে যেতে গিয়ে শ্বশুরের ঘরের ভেজানো দরজাটা সামান্য খুলে দেখে নিয়ে ছাদে উঠে গেল।
ঢিলটিল সে কোনোদিন ছোড়েনি। তার ভয় হল যদি শিশিটা দত্তবাড়ির বারান্দা পর্যন্ত না পৌঁছয়, যদি নীচের বস্তির খোলার চালের ওপর পড়ে! সে হাত তুলে পলিথিনের মোড়কটা বউটাকে দেখিয়ে ছোড়ার ভান করে বুঝিয়ে দিল এটা এখন ছুড়ব।
পাঁচিল থেকে দু—পা পিছিয়ে এসে একটু জোরে এগিয়ে গিয়ে মৌসুমী প্রাণপণে ছুড়ে দিল। বউটির চোখে বিস্ময়, কিন্তু মৌসুমী চোখে ভয় নিয়ে দেখল মোড়কটা দোতলার বারান্দার রেলিংয়ে লেগে ঠকাস একটা শব্দ করে নীচে পড়ে গেল। বউটি নীচে একবার তাকিয়েই সিঁড়ির দিকে ছুটল।
দুরু দুরু বুকে মৌসুমী অপেক্ষায় রইল। কী আছে নীচে? গলি? লোক চলছে? যদি কেউ ওটা তুলে নেয়? এক মিনিটের মধ্যেই বউটি উঠে এসে নিজের ঘরে ঢুকে গেল, হাতে মোড়কটা। মৌসুমীর বুক থেকে পাষাণভারটা নেমে গেল।
পর্দা সরিয়ে জানলায় মুখ দেখাল বউটি, হাতের কাগজটা নাড়িয়ে ফোন করার ভঙ্গিতে কানের পাশে মুঠো রাখল। মৌসুমী ছুটে নেমে এল দোতলায়।
টেলিফোনটা খাওয়ার টেবলের পাশে একটা টুলের ওপর। সে চেয়ারে বসা মাত্র ফোন বেজে উঠল। ‘ক্রিং’ শব্দ হতেই সে রিসিভার তুলে নিল। বেশিক্ষণ বাজলে শ্বশুর বা শাশুড়ির ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
চাপা স্বরে মৌসুমী বলল, ‘কে বলছেন?’
‘আমি পার্বতী। আমাকে ফোন করতে বলেছেন। আপনার নাম কী?’
‘মৌ, মৌসুমী। কতদিন আপনার বিয়ে হয়েছে?’
‘তিন বছর, মাধ্যমিক পাশ করতেই বিয়ে হয়।’
মৌসুমী বুঝল ওর বয়স মোটামুটি কুড়ির আশেপাশে। তার থেকে দু—তিন বছরের ছোটোই হবে। পার্বতীকে ‘তুমি’ বলা যায়।
‘কতদিন ধরে মার খাচ্ছ? তোমার স্বামীকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কিছু বলে না?’
‘না, বলে না। প্রথমদিন মার খেয়ে ছুটে বড়ো জা—র ঘরে ঢুকেছিলুম, আমাকে ঠেলে বার করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।’
‘তোমার বর তোমায় মারে কেন?’
‘বিয়ের আগে বাবার কাছে এক লাখ টাকা চেয়েছিল একজনের সঙ্গে বখরায় হেলথ ক্লাব করবে বলে। বাবা বলেছিল, অত টাকা এখুনি দিতে পারব না। মেজো বোনের বিয়ের কথাবার্তা তখন চলছিল, বড়দা ডাক্তারিতে ভরতি হবে। মা—র কিডনি অপারেশন হবে তখন অনেক টাকার দরকার। বিয়ের পর এরা টাকা চাইতে শুরু করে। বাবা পঁচিশ হাজার দেয়। তারপর আর দিতে পারেনি, শুরু হয় মারধর।’
‘তুমি বাপের বাড়ি গিয়ে থাকো না কেন?’
‘দু—বার চলে গেছলুম, বাবা থাকতে দিতে রাজি নয়, বলে, এত টাকাপয়সা গয়না দিয়ে বিয়ে দিলুম সে কি বাপের বাড়িতে থাকার জন্য? মা বলল, শ্বশুরবাড়িই মেয়েদের ঘর। লাথি—ঝাঁটা খেয়েও ওখানে পড়ে থাকবি। ভাই কী বলব, এইসব শুনে ঘেন্না ধরে গেল নিজের ওপর। মা বলল, তোর দাদাদের বিয়ে হবে, তাদের বউয়েরা তোকে তো দাসী করে রাখবে, আমরা আর ক—দিন তারপর তোকে দেখবে কে? মাকে গায়ের কাপড় খুলে মারের দাগগুলো দেখালুম, বললুম ও বাড়িতে আমাকে আর যেতে বলো না, এবার আমি ঠিক মরে যাব।’
