‘বলরামবাবু, আমাকে কি শ—পাঁচেক টাকা এখন দিতে পারবেন?’
ক্লান্ত করুণ স্বরে বলল মৃণালকান্তি।
‘কেন দিতে পারব না, এটা কী একটা কথা হল!’
.
৪
বলরাম যখন মৃণালকান্তিকে বলল, ‘আজ কলেজে ঝামেলা হতে পারে’ সেই সময় মৌসুমী রান্নাঘরের তাক থেকে কৌটো, শিশি—বোতল নামিয়ে ঝাড়মোছ করছিল। ইন্দ্রাণী পরিষ্কার করছিলেন গ্যাস বার্নারটা। মাসে একবার তাঁরা এই কাজটা করেন। দত্তবাড়ির দোতলার ঘরে হঠাৎ পুরুষের গলায় একটা ক্রুদ্ধ গর্জন আর মেয়ে গলায় চিৎকার উঠল।
‘অই আবার শুরু হল, ক—দিন বন্ধ ছিল, ভাবলুম শান্তিতে থাকা যাবে।’ ইন্দ্রাণী নির্বিকার মুখে হাতের কাজ করে চললেন।
মৌসুমী জানলায় গিয়ে দাঁড়াল। দত্তবাড়ির দোতলার ঘরের জানলাটা তাদের রান্নাঘরের জানলার প্রায় মুখোমুখি, মাঝখানে একতলা নীচু খোলার চালের ঘর। গর্জন ও চিৎকার থামছে না, সঙ্গে শব্দও হচ্ছে। যে—কেউই শুনলে বুঝবে একজন আর একজনকে প্রহার করছে।
‘ওদের বাড়িতে তো এত লোক, কেউ কিছু বলে না? এসে অন্তত থামাতে তো পারে!’
‘থামাবে কী? সবাই তো চাঁদুর মতোই বউ ঠ্যাঙানে। ওর বাবাও চাঁদুর মাকে পেটাত। ওই ঘরেই ওরা থাকত। তোমার মতো রান্নাঘর থেকে বিয়ের পর প্রথম দিন দেখে আমি তো ভয়ে কাঁটা হয়ে গেছলুম। কেমন জায়গায় বিয়ে হল রে বাবা! তোমার শ্বশুরকে বলতেই বলল, ‘পরের বাড়িতে যা হচ্ছে হোক তোমাকে তাই নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। যখন ওরকম হবে তখন জানলাটা বন্ধ করে দেবে।’ আমি তাই করতুম।’ ইন্দ্রাণী কথাগুলো বলে জুড়ে দিলেন, ‘তুমিও তাই করবে।’
ঠিক তখনই মৌসুমী দেখল চাঁদুর বউ ঘর থেকে ছিটকে বারান্দায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তার মনে হল চাঁদুর লাথি খেয়েছে বউটি অথবা গলাধাক্কা।
‘ইসস, দেখুন মা দেখুন, বউটার অবস্থা দেখুন।’
‘তুমি দেখ গে, আমার অনেক দেখা আছে। জানলা থেকে সরে এসো বউমা।’ নির্দেশটা দিলেন গলা চড়িয়ে একটু অধৈর্য স্বরে।
মৌসুমী সরে এল। আড়চোখে দেখল বউটি উবু হয়ে দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুজে বারান্দায় বসে। জামা পরতে পরতে চাঁদু ঘর থেকে বেরিয়ে তার পাশ দিয়ে নীচে চলে গেল।
‘বউটা তো মা বাপের বাড়ি চলে যেতে পারে।’
‘তা তো পারেই। গেছলও দু—বার।’
‘আপনি জানলেন কী করে?’
‘রমার মা থাকতে জানার অভাব হয়। দু—বারই ওর বাবা—মা ওকে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। বাপের বাড়ি তো কলুটোলায়, বেশি দূর নয়। বাবার সোনার গয়নার দোকান বউবাজারে। চার বোন তিন ভাই ওরা। ওই বড়ো মেয়ে। অবস্থা বেশ ভালোই।’
‘দেখতেও ভালো, বয়স তো খুবই কম। তা হলে এমন অত্যাচার হয় কেন?’ মৌসুমী অবাক হয়ে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
‘টাকা চায়। এটা তুমি বুঝবে না। তোমার মায়ের কাছে আমরা টাকা চাইনি, কোনো কিছুই চাইনি।’ ইন্দ্রাণীর গলায় প্রচ্ছন্ন গর্ব। ‘মিনুর বাবা তোমার মাকে কী বলেছিলেন নিশ্চয় তুমি শুনেছ।’
ইন্দ্রাণী পুত্রবধূর মুখভাব লক্ষ করলেন। দেখে সন্তুষ্ট হলেন। মনে মনে বললেন, মেয়েটা ভালো, পছন্দে ভুল করিনি। মিনুর বাবাও তাই বলে, মা—মেয়ে দু—জনেই কৃতজ্ঞ রয়েছে।
‘চাঁদু লোকটা কী করে?’
‘ওদের সর্ষের তেলের আড়ত আছে পোস্তায়, পাশের বস্তিটা ওদের, গোটা দুয়েক বাড়িও আছে, ছিল পাঁচ—ছটা। একে একে বিক্রি করেছে, এ ছাড়া কিছু করে বলে তো জানি না, আর যা করে সেটা বলার মতো নয়—গুন্ডামি, মস্তানি। ওর একটা দল আছে ইলেকশনের সময় টাকা নিয়ে কাজ করে, শুনেছি রাস্তার বাজারে তোলা আদায়ের কাজও করে।’
ইন্দ্রাণী হাতের কাজ শেষ করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মৌসুমী জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। বউটি একইভাবে হাঁটুতে মাথা গুঁজে বসে রয়েছে। দেখে ওর মায়া হল, বেচারা, কত দিন ধরে এভাবে মার খাচ্ছে কে জানে! খবরের কাগজে রোজই তো একটা দুটো খবর থাকে গৃহবধূ হয় আগুনে পুড়েছে, নয়তো গলায় দড়ি দিয়েছে, কখনোবা বাচ্চচাকে বিষ খাইয়ে নিজেও খেয়ে মরেছে।
দুপুরে মৌসুমী একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল। দুপুরে সে ঘুমোয় না। রান্নাঘরে ঠক করে বাসন সরানোর শব্দ হল। সে দ্রুত উঠে এসে দেখল একটা শালিক ভাত খেতে থালায় উঠেছে। তাকে দেখে পাখিটা জানলা দিয়ে উড়ে গেল। বন্ধ করে দেওয়ার জন্য সে জানলার কাছে এল। আপনা থেকেই চোখ চলে গেল দত্তবাড়ির বারান্দায়। ঘরের জানলাটা খোলা, পর্দাটা সরানো। ঘরের ভিতর খাটের এক দিকের বাজু আর সিলিংয়ে ঝোলানো পাখাটা দেখা যাচ্ছে।
তাকিয়ে দেখেই মৌসুমী আর্তনাদের মতো চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই এই কী করছ, কী করছ। নামো নামো, শিগগির নামো।’
বউটি টুলের উপর দাঁড়িয়ে একটি ওড়না ছুড়ছে পাখা লক্ষ্য করে। ওড়নার অন্য প্রান্ত গলায় বাঁধা। মৌসুমীর চিৎকার শুনে থতমত হয়ে বউটি ভীত চোখে তাকাল। তাড়াতাড়ি টুল থেকে নেমে এসে জানলা বন্ধ করে দিল। থরথর করে কাঁপছে মৌসুমীর গোটা শরীর। বউটি কি আবার টুলে উঠবে! বাড়ির দোতলা তিনতলার বারান্দায় লোক নেই। দুটো ঘরের জানলা খোলা কিন্তু সে কারও নাম জানে না যে চেঁচিয়ে ডেকে বলবে কী কাণ্ড হতে চলেছে তাদের বাড়িতে।
দু—হাতে জানলার গরাদ ধরে সে দাঁড়িয়ে রইল। কাউকে দেখতে পেলে ডেকে বলবে দোতলা ঘরের বউ গলায় ফাঁস লাগাচ্ছে শিগগির ওকে ধরে ফেলুন। বন্ধ জানলার ওধারে এখন কী হচ্ছে কে জানে! আবার কি ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়ার চেষ্টা শুরু করবে? কতক্ষণ লাগবে পাখার হাঁড়িটায় ওড়না জড়াতে? সময়ের হিসেব করল মৌসুমী। বড়োজোর দু—মিনিট। গলায় ফাঁস তো আগেই দিয়ে রেখেছে। টুলটা এবার পা দিয়ে ফেলে দেওয়া তারপর দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে কতক্ষণ লাগবে? এক মিনিট দু—মিনিট তিন মিনিট—গুনতে গুনতেই মৌসুমীর চোখ বিস্ময়ে কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল।
