স্টাফ রুম থেকে দুজনে বেরিয়ে এসে দেখল ছাত্রদের উত্তেজিত মুখ। মৃণালকান্তির মনে হল এমন মুখ যে দেখেছে ফুটবল ম্যাচের শেষ মুহূর্তে মাঠের গ্যালারিতে। বদ্ধ জলাশয়ে যেন ঢিল পড়েছে। একটা ঘটনা ঘটেছে, যে ঘটনার মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য ভরা আছে। সেটাকে খুলে দেখতে ইচ্ছে করছে অথচ ভয়ও হচ্ছে। রোমাঞ্চক উত্তেজনার ঘোর চোখেমুখে। প্রিন্সিপালের ঘর থেকে ধীরাজের ধমক শোনা গেল। কী বলছে বুঝতে পারল না মৃণালকান্তি।
‘তোমাদের দাবির কত দূর কী হল?’
নিরীহ ধরনের যাকে জিজ্ঞাসা করলেন প্রিয় চৌধুরী সেই ছেলেটি অপ্রতিভ হয়ে বলল, ‘জানি না স্যার, আমি এইমাত্র আসছি।’ বলেই সরে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে আর একটি ছেলে, দেখতে সপ্রতিভ, বলল, ‘প্রিন্সিপ্যাল বলেছেন সাতজনকে পাশ করিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা বিবেচনা করবেন তবে পাশ কোর্সের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রদের ফি মকুব করতে পারবেন না, ছাত্রদের ভরতির কনসেশন দেবেন না। উনি কিন্তু অনেককে কনসেশন দিয়েছেন, পার্টির নেতাদের চিঠি নিয়ে যারা এসেছে তাদের দিয়েছেন অথচ প্রকৃত গরিব ঘরের ছেলেরা পায়নি। এটা তো পক্ষপাতিত্ব, নয় কি?’ তারা দু—জন অস্বস্তিতে পড়ে চুপ করে রইল। ছেলেটি বলে চলল, ‘আপনারা তো দেখছেন গ্রামের ছেলেই বেশিরভাগ, গ্রামের স্কুলে কী পড়ানো হয় তাও জানেন। একটু সহানুভূতি নিয়ে তো এদের দেখা উচিত। এভাবে ফেল করিয়ে দেওয়ার কোনো মানে হয়?’
প্রিয় চৌধুরি চিমটি কাটলেন মৃণালকান্তির কনুইয়ে। ‘চলুন মৃণালবাবু, মনে হচ্ছে সমস্যাটা এখুনি মিটবে না, ঘেরাও চলবে।’ সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে গলা নামিয়ে তিনি বললেন, ‘আমাদেরই টাকা দিতে পারে না ঠিক সময়ে আর কনসেশন দেবে!’
‘ওঁরা কতক্ষণ ঘেরাও হয়ে থাকবে? সত্যবাবুর শরীর তো ভালো নয়।’ মৃণালকান্তির স্বরে উদবেগ।
‘শরীরটরির নিয়ে ওরা মাথা ঘামায় না। দাদারা বলে দিয়েছে ঝামেলা পাকাও, আন্দোলন করো, তাতে দু—একটা মরলে আন্দোলনটা ঝড়ে পরিণত হবে। দোষটা কলেজের ঘাড়ে ফেলা যাবে। কলেজ বন্ধ থাকবে মরবে পার্ট টাইম শিক্ষকরা। মৃণালবাবু কোমরে গামছা বাঁধার জন্য তৈরি হন। এখন যাবেন কোথায়?’
‘স্টেশনে।’
‘চলুন একটা রিকশা নেওয়া যাক শেয়ারে যাওয়া যাবে।’
প্রিয় চৌধুরি যাবেন হাওড়ার উলটো দিকে জৌগ্রামে, ট্রেনে আধ ঘণ্টার পথ। রিকশা থেকে নেমে তিনি গেলেন প্ল্যাটফর্মে, মৃণালকান্তি এল বলরামের দোকানে। দোকানটির সম্মুখভাগ বেশি বিস্তৃত, কাচ ও কাঠের তৈরি কাউন্টারটিও চওড়া। শুধু মনোহারী জিনিসই নয়, নানাবিধ খেলনা ও উপহারসামগ্রী, কিছু গল্প—উপন্যাসের বই, নিরীহ ওষুধপত্রও বিক্রি হয় বেবি ফুড, লিপস্টিক, বিস্কুট, বডি লোশনের সঙ্গে। জিনিস বিক্রির জন্য আছে দুজন কর্মচারী। পুষ্প ভ্যারাইটি বলদেবপুরের অন্যতম সমৃদ্ধ দোকান এবং বলরাম রায় বৈষয়িক বুদ্ধিতে অত্যন্ত দড়, সম্পন্ন কৃষিজীবী। বর্গাদারদের অভাবের সুযোগ নিয়ে তাদের কিছু টাকা ধরিয়ে বা জমির আংশিক মালিকানা দিয়ে একটু একটু করে নথিভুক্ত জমি হাতিয়ে এখন সে ধানের বড়ো ব্যবসায়ী। তার প্রবল ইচ্ছা বা সাধ ছেলে কিশোরকে গ্র্যাজুয়েট করবে, বংশে যা কেউ হয়নি।
মৃণালকান্তি কাউন্টারের উপর পোর্টফোলিয়ো ব্যাগটি রাখল।
বলরাম হেসে বলল, ‘ঝামেলা চলছে? কলেজ করা হল না।’
‘না। মনে হয় কিছুদিন চলবে।’ মৃণালকান্তির স্বরে হতাশা, সেটা লক্ষ করল বলরাম।
‘তা হলে কী করবেন? বাইরে দাঁড়িয়ে কেন ভেতরে এসে বসুন।’
ট্রেনের অনেক দেরি, বিস্কুটগুলোও খেতে হবে। মৃণালকান্তি কাউন্টারের ওধারে গিয়ে টুলে বসল। ব্যাগ থেকে বিস্কুট বার করে বলল, ‘এক গ্লাস জল হবে?’
জলের গ্লাস কাউন্টারের উপর রেখে বলরাম বলল, ‘এখন কী করবেন?’
জল খেতে খেতে মৃণালকান্তির মনে হল এই লোকটা জানে সে গেস্ট লেকচারার। বোধ হয় জানে ক্লাস পিছু সে কত টাকা পায়। বোধ হয় জানে সামার ভেকেশনে, পুজোর ছুটিতে, সেকেন্ড ইয়ার আর থার্ড ইয়ারে যখন ছাত্র থাকে না তখন ক্লাসও থাকে না। ক্লাস না থাকলে, বলরাম নিশ্চয় খবর রাখে এইসব মাস্টাররা তখন দয়ার পাত্র হয়ে ওঠে।
‘কী আর করব! আসব কলেজে, ক্লাস হলে করব, না হলে চলে যাব।’
‘চলে যাবার আগে কয়েকটা টাকা রোজগার করে তারপর চলে যান।’
বলরামকে মিটমিটিয়ে হাসতে দেখে মৃণালকান্তি বুঝে গেল ও কী বলতে চায়।
‘কিশোরকে অঙ্কে পণ্ডিত করে দেওয়া?’
‘এই তো ধরেছেন কথাটা। শুধু কিশোর কেন আরও কয়েকটা ছেলে জুটিয়ে দেব। অঙ্ক বড়ো জটিল সাবজেক্ট, হায়ার সেকেন্ডারির অঙ্ক তো কড়াকিয়া গণ্ডাকিয়া নয়! হেল্প না পেলে মাথায় ঢোকে না। আমার বারবাড়ির একতলার দালানে ধানের বস্তাগুলো সরিয়ে জায়গা করে দেব। আপনি কোচিং খুলে ফেলুন। ভাড়া দিতে হবে না। কিশোর বলছিল আপনি নাকি দারুণ সহজ করে বোঝান।’
প্রিয় চৌধুরির কথাগুলো মৃণালকান্তির মাথার মধ্যে ঝনাত করে উঠল—’প্রাইভেট টিউশনি শুরু করুন—কোমরে গামছা বাঁধার জন্য তৈরি হোন।’ মা—র কথাটাও মনে পড়ল, ‘অন্য কলেজ দেখুক।’ মুখ নীচু করে মৃণালকান্তি এক মিনিট ভাবল, মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে বলল, ‘ঠিক আছে, করব।’
‘তা হলে দুটো দিন সময় দিন গুছিয়েগাছিয়ে নেবার জন্য। একটা ব্ল্যাকবোর্ড তো লাগবেই। মাদুরে বসবে ছেলেরা, বাড়িতে চেয়ার আছে, ইলেকট্রিক আলো আছে। কলেজ করে চলে আসবেন। মাইনেটা কলকাতার মতো নিলে কিন্তু হবে না, বেশিরভাগ তো গরিব ঘরের ছেলে।’
