কলেজের কাছাকাছি আসতেই সে দেখল ছাত্ররা রাস্তায় জটলা করে রয়েছে। রিকশা থেকে মৃণালকান্তি নেমে পড়ল। তার মনে হচ্ছে কলেজে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে। একটি ছেলেকে ডেকে বলল, ‘ব্যাপার কী তোমরা এখন কলেজের বাইরে যে!’
হাসিমুখে ছেলেটি বলল, ‘সকাল দশটায় কলেজে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্সিপালকে তার ঘরে ঘেরাও করেছে ধীরাজরা, সত্যবাবু, মন্মথবাবুরা তখন ওর সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন তাঁরাও ঘেরাও হয়ে গেছেন। আপনি যাবেন না স্যার গেলে আপনাকেও ঘরে ঢুকিয়ে আটকে দেবে।’
‘অফিসঘরটাও কি ঘেরাও হয়েছে?’
‘খোলেইনি তো ঘেরাও করবে কাকে?’
মৃণালকান্তি বুকের থেকে সবটুকু বাতাস বেরিয়ে গেল। শ্বাস নিতে গিয়ে ব্যথা উঠল। সে কলেজের দিকে এগোল। ছেলেটির কথা সত্যি কি না স্বচক্ষে দেখে যাচাই করবে। একফালি জমি পেরিয়ে কলেজের কোলাপসিবল গেট। দোতলার বারান্দায় ছেলেরা ভিড় করে। হই—হট্টগোল চলছে। মৃণালকান্তি একজনও শিক্ষককে দেখতে পাচ্ছে না। স্টাফ রুমটা দোতলায়। হয়তো সেখানে তাঁরা বসে আছেন।
মন্থর পায়ে সে দোতলায় উঠে এল। দোতলার করিডরে গিজগিজে ভিড়। প্রিন্সিপালের ঘর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। স্লোগান চলছে। মৃণালকান্তির কানে ছেঁড়াছেঁড়া শব্দ ‘অন্যায় জুলুম’, ‘গরিব ছাত্র’ ‘কলেজ বনধ’ ভেসে এল।
স্টাফ রুমে শান্তি গাঙ্গুলি আর প্রিয় চৌধুরি বসে। তাঁকে দেখে যেন তাঁরই প্রতীক্ষা করছেন এমনভাবে সমস্বরে তাঁরা বলে উঠলেন, ‘আসুন।’
শান্তি গাঙ্গুলি বললেন, ‘অফিসঘর কি খোলা দেখলেন?’
‘বন্ধ।’
প্রিয় চৌধুরি বললেন, ‘বলছে দাবি মেনে না নিলে সারারাত ঘেরাও করে রাখবে। সত্যবাবু আর মন্মথবাবু কেন যে তখন প্রিন্সিপালের ঘরে ঢুকতে গেলেন! সত্যবাবুর আবার হাই ব্লাড প্রেশার। এইরকম পরিস্থিতিতে ওঁর কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। ধীরাজকে কি বলব ওকে ছেড়ে দিতে?’ অনুমোদনের জন্য তিনি দুজনের মুখের দিকে তাকালেন।
‘লাভ হবে না। যদি পুলিশ ডাকে তা হলে উদ্ধার পেতে পারে।’ শান্তি গাঙ্গুলি বললেন, ‘তবে তাতে আগুনে ঘি পড়বে, ঘেরাওটা তখন ধর্মঘট হয়ে যাবে।’
‘তখন তো মারা পড়ব আমরা গেস্ট লেকচারাররা।’ প্রিয় চৌধুরী শুকনো হাসলেন, ‘নো ওয়ার্ক নো পে। দাবিটা তো সামান্য, ক—জনকে পাশ করিয়ে দিলে কলেজের কী এমন ক্ষতি হবে!’
বেয়ারা বিনয় ঘরে ঢুকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা কি বসে থাকবেন?’
‘তা হলে আর কী করব?’ মৃণালকান্তি বলল।
‘বাড়ি চলে যান। ক্লাস তো হবে না মিছিমিছি সময় নষ্ট করছেন।’
‘তা হলে।’ শান্তি গাঙ্গুলি উঠে পড়লেন। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে প্রিয় চৌধুরি তিক্তস্বরে বলল, ‘ওনার আর কী, কলেজ খোলাই থাকুক আর বন্ধ থাকুক ফুলটাইম লেকচারার, মাস গেলে তো হাজার বিশেক টাকা গ্যারান্টেড। ক্লাস পিছু দিনে আমাদের মতো পঁচাত্তর টাকার জন্য উঞ্ছবৃত্তি করতে তো হয় না ওনাকে। শুনেছি বর্ধমানের বাড়িতে কোচিং স্কুল খুলে ফেলেছেন। তাতে কত হাজার টাকা কামাচ্ছেন কে জানে!’
চোখে সহানুভূতি নিয়ে মৃণালকান্তি চুপ করে প্রিয় চৌধুরির মনের জ্বালার তাপ অনুভব করল। কথাগুলো তো তার নিজেরও।
‘জানেন মৃণালবাবু, ছোটো ছেলেটার টাইফয়েড হল এক হপ্তা কলেজে আসতে পারিনি, সাড়ে চারশো টাকা লস হল। আঠারোশো টাকা থেকে অতগুলো টাকা চলে গেলে কী থাকে বলুন? পাঠশালার মাস্টারেরও অধম আমরা।’
মৃণালকান্তি ঢোঁক গিলল। বাড়ির কেউ এখনও জানে না তার এই অধমত্ব। সবাই জানে সে গরিব দুঃস্থ এক মফস্সল কলেজের প্রফেসার যে—কলেজ প্রফেসারদের ঠিক সময়ে মাইনে দিতে পারে না। তার ভাগ্য ভালো সংসারটা এখনও ব্যাঙ্কের রিটায়ার্ড অফিসার বাবাই চালাচ্ছে। পেনশন পোস্ট অফিসের সুদ আর দোকানভাড়ার টাকায়। ভয় মৌসুমীকে নিয়ে। সে এখনও জানে তার স্বামী প্রফেসার। কথাটার অর্থ কি ও জানে?
‘মৃণালবাবু প্রাইভেট টিউশনি শুরু করুন। আপনি তো ভাগ্যবান মশাই, টুয়েলভে অঙ্ক করান আর বিএ ক্লাসে ইতিহাস পড়ান, আমার ডাবল রোজগার করেন। অনেক ছাত্র পেয়ে যাবেন, শুরু করুন শুরু করুন।’ বলতে বলতে প্রিয় চৌধুরি উঠে দাঁড়ালেন। ‘চলুন ওদিকে কী হচ্ছে একবার খোঁজ নেওয়া যাক।’
মৃণালকান্তির কানে ক্ষীণভাবে একটা ঈর্ষার সুর ছুঁয়ে গেল। দুটো বিষয় পড়ালে রোজগার তো দ্বিগুণ হবেই আর কে না আয় বাড়াতে চায়। বিএ—তে তার স্পেশাল পেপার ছিল অঙ্ক, অনার্স ছিল ইতিহাসে। যজ্ঞেশ্বরবাবুর মেয়ে একটি ছেলের সঙ্গে নিরুদ্দেশ হওয়ায় তিনি কলেজে আসছিলেন না, পরপর তিন দিন টুয়েলভ ক্লাসে অঙ্ক পড়ানো যায়নি। চিন্তায় পড়ে যান বঙ্কিম সাহা। মৃণালকান্তি নিজের থেকেই তাঁকে বলে, ‘স্যার যদি বলেন তো আমি অঙ্কের ক্লাসটা নিতে পারি। বিএ—তে আমার স্পেশাল পেপার অঙ্ক ছিল। হায়ার সেকেন্ডারিতে লেটার পেয়েছি।’ প্রিন্সিপ্যাল সেই দিনই তাকে ক্লাস নিতে পাঠান। মৃণালকান্তি যখন অঙ্ক পড়াচ্ছে তখন তিন মিনিট ক্লাসের দরজায় এসে তিনি দাঁড়ান, দেখেন, শোনেন এবং ফিরে যান। সেই দিনই তিনি মৃণালকান্তিকে ডেকে বলেন, ‘কাল থেকে আপনি ইলেভেন—টুয়েলভে অঙ্ক করান। ক্লাস পিছু চল্লিশ টাকা পাবেন। রাজি থাকেন তো করুন।’ সে ঘাড় নেড়ে বলেছিল ‘করব।’ তাকে হপ্তায় দশটা অঙ্কের ক্লাস নিতে হয়। আয় বাড়ল। এটাকেই প্রিয় চৌধুরি বললেন, ‘ডবল রোজগার’।
