মৃণালকান্তি ছ—নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছানো মাত্র একটা ট্রেন ঢুকল। এটাই যাবে বলদেবপুর। সে তাড়াহুড়ো না করে ট্রেনে উঠল এবং বসার জায়গা পেল যা সচরাচর অন্যান্য দিনে পায় না। এবার সে সকাল থেকে এখন পর্যন্ত গত কয়েক ঘণ্টাকে ফিরে দেখার অবকাশ পেল এবং একবার মাত্র হোঁচট খেয়ে দেখল মসৃণভাবে বাকি সময়টা কাটাতে পেরেছে। হোঁচটটা মায়ের ওই কথাগুলো ‘অন্য কলেজ দেখুক’ আর মৌসুমীর থমথমে মুখ। এসবও মুছে যাবে যদি গত মাসের টাকাটা আজ পাওয়া যায়। কলেজে পৌঁছেই কালোবাবুর কাছে যেতে হবে। কালোবরণ ঘোষ ক্যাশিয়ার, সহৃদয় মানুষ। ক্যাশে টাকা থাকলে এবং প্রিন্সিপ্যাল বঙ্কিম সাহার অনুমতি পেলে সঙ্গে সঙ্গে টাকা দিয়ে দেন। উনি বলেছিলেন তেরো—চোদ্দো তারিখে একবার আসুন। আজ তো তেরো!
বলদেবপুর বর্ধিষ্ণু এবং প্রাচীন জায়গা। মধুসূদন বিশ্বাস জমিদার ও ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর বাড়িটিও বিশাল। সেই বাড়ির লাগোয়া হয়েছে সিনেমা হল এবং বাসস্ট্যান্ড, সাইকেল রিকশা দাঁড়িয়ে থাকে সার বেঁধে। ট্রেকার ছাড়ে এখান থেকেই। মৃণালকান্তি প্রথম চার দিন রিকশাতেই কলেজ গিয়েছিল। পঞ্চম দিনে রিকশার টায়ার ফেটে যাওয়ায় তাকে বাকি পথ হেঁটে কলেজে যেতে হয়। বঙ্কিম সাহা বলেছিলেন, ‘শুরুতেই লেটে আসা আরম্ভ করলেন!’ তার মুখভাব আর গলার স্বরে মৃণালকান্তির বুক দুরদুর করে উঠেছিল। অনেক যোগাযোগের সূত্র ধরে হাঁটাহাঁটি করে কাজটা সে পেয়েছে। চাকরিটা স্থায়ী নয়, প্রিন্সিপ্যালের মর্জির উপর তাকে টিকে থাকতে হবে এটা সে জেনে গেছে।
ট্রেন সময়মতো চলেছে। মৃণালকান্তির টেনশন হয়নি, যা অন্যান্য দিনে হয়। কলেজে ঠিক সময়েই পৌঁছতে পারবে, এই সম্ভাবনাটায় হালকা লাগছে তার নিজেকে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে তার প্রথম কাজ বলরামের পুষ্প ভ্যারাইটি স্টোর্স থেকে চারটি ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুট কেনা। তিনটের সময় সে বিস্কুট এবং এক গ্লাস জল খাবে। বলরামের ছেলে কিশোর, কলেজে উচ্চচ মাধ্যমিকের ছাত্র। এই তল্লাটে উচ্চচ মাধ্যমিক পড়ার স্কুল নেই তাই মধু কলেজে পড়াতে রাজি হয়। এমন দায়িত্ব এ রাজ্যের বহু কলেজ নিয়েছিল, পরে ছেড়েও দিয়েছে কিন্তু মধু কলেজ ছাড়েনি তাই এগারো—বারো ক্লাস এই কলেজে রয়ে গেছে।
বলরাম খাতির করে মৃণালকান্তিকে। তার ছেলেকে আলাদাভাবে অঙ্ক শেখাবার জন্য অনুরোধ করেছে কয়েকবার। মৃণালকান্তি তাকে বলে দিয়েছে, ‘প্রাইভেট কোচিং আমি করব না।’ বলরাম তবুও হাল ছাড়েনি।
আজ বলরামের দোকানে দাঁড়ানো মাত্র সে মৃণালকান্তিকে বলল, ‘স্যার কলেজে আজ ঝামেলা হতে পারে, হায়ার সেকেন্ডারির প্রি—টেস্টে যে সাতটি ছেলে তিন—চারটি বিষয়ে পাশ করেনি তাদের টেস্টে বসতে দিতে হবে, এই দাবিতে ইউনিয়ন নাকি আজ প্রিন্সিপ্যালকে ঘেরাও করবে বলে ছেলের কাছে শুনেছি।’
দু—দিন আগে মৃণালকান্তিও স্টাফ রুমে শুনেছে এইরকমই একটা কথা। তার সহকর্মীদের কথাবার্তা থেকে বুঝেছিল ছাত্রদের দাবি বঙ্কিম সাহা মেনে নেবেন না। ছাত্র ইউনিয়নের সেক্রেটারি ধীরাজকে সে মনে মনে ভয় পায়। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ইউনিয়ন দখলের ইলেকশন জিততে ছুরি বার করেছে, বোমা ফাটিয়েছে, বিরোধী প্রার্থীদের বাড়িতে গিয়ে তাদের বাবা—মাকে বলে এসেছে ছেলের শ্রাদ্ধের জন্য পুরুত ঠিক করুন। মৃণালকান্তির ভয়ের আর একটা কারণ, ফেল করা সাতটি ছেলের অঙ্কের খাতা সে দেখেছে, তাদের মধ্যে সর্বোচ্চচ যে পেয়েছে তার নম্বর সতেরো। বঙ্কিম সাহা তাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন, ‘করেছেন কী? আট, ছয়, দশ এসব কী নম্বর দিয়েছেন? আপনিই তো অঙ্ক শিখিয়েছেন! এত কম নম্বর পেলে তো আপনারই বদনাম হবে।’
‘যদি হয় তো হোক।’ মৃণালকান্তি বলেছিল। ‘শুধু আমিই তো কম নম্বর দিইনি। ইংরেজি, বাংলা, বিজ্ঞান এগুলোতেও তো ফেল করেছে। ক্লাসে তো এদের মুখই দেখতে পাই না। এদের অ্যানসার পেপারগুলো আপনি নিজে একবার দেখুন। স্যার, এরা টেস্ট পরীক্ষায় বসার উপযুক্তই নয়। ডাহা ফেল করবে।’
বঙ্কিম সাহা গম্ভীর মুখে টেবলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, ‘খাতাগুলো আমি দেখব, ধীরাজকেও দেখাব।’
তিন দিন পর মৃণালকান্তি প্রিন্সিপালকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘স্যার খাতাগুলো দেখলেন?’
‘দেখেছি, ঠিকই নম্বর দিয়েছেন। ধীরাজকেও দেখতে বলেছিলুম।’
‘কী বলল ধীরাজ?’
‘যেমনই অ্যানসার করুক না কেন ওরা গরিবের ছেলে পাশ করিয়ে দিতে হবে। ও খাতা না দেখেই বলেছে।’
‘পাশ করিয়ে দেবেন?’
‘দেখি।’
মৃণালকান্তি তখনই বুঝে গিয়েছিল একটা গণ্ডগোল ধীরাজরা পাকাবে। এটাই ওরা চায়। ম্যানেজিং কমিটি ওদের বিরোধী রাজনীতি করা লোকদের হাতে। এটা এখন হবে রাজনৈতিক লড়াই।
বলরামের চোখে উৎকণ্ঠা। বলল, ‘আজকের দিনটায় কলেজে নাই গেলেন। কিছু একটা হয়েটয়ে যদি যায়।’
মৃণালকান্তি বলল, ‘কিছু তো নাও হতে পারে। গিয়ে দেখব ঝামেলা মিটে গেছে। মিছিমিছি ভয় পেয়ে একটা দিন কেন নষ্ট করব। দিন বিস্কুট।’
ভয়ের থেকেও সে এখন মরিয়া। কালোবরণকে তার চাই। তেরো—চোদ্দো তারিখ বলেছে। প্রিন্সিপালকে তো দোতলায় তার ঘরে ঘেরাও করবে। অফিসঘরটা একতলায়। সেখানে নিশ্চয় কাজকর্ম যেমন চলে চলবে। মৃণালকান্তি ঘেরাও শব্দটি শুনেছে,কাগজে পড়েছে, কখনো চোখে দেখেনি। এটা যে কী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সেটা তার ধারণায় ছিল না। ট্রেকার না পেয়ে সে একটা রিকশায় উঠে কলেজ রওনা হল।
