‘জিজ্ঞেস করল, ইনিই কী সেই যার আসার কথা ছিল। তুমি বুঝি ওকে বলেছিলে ওই ভদ্রমহিলা আজ আসবেন?’
‘বলেছিলুম, তাতে হয়েছে কী? একদিন তো সবাই জানতেই পারবে। ও তো এবার এসে জিজ্ঞাসা করবে বিয়েতে দাদাবাবু কী কী পাবে। যা যা বলব দু—দিনের মধ্যে পাড়ার লোক জেনে যাবে।’
‘কী কী পাব?’ মৃণালকান্তির মুখে কৌতুক মেশানো কৌতূহল।
‘ঘর ঠান্ডা করার যন্ত্র, ফ্রিজ, টিভি, পাউরুটি সেঁকা আর খাবার গরম করার আর টিভিতে সিনেমা দেখার যন্তর, তা ছাড়া বক্সখাট, স্টিলের আলমারি, খাওয়ার টেবিল, সোফা, স্টিলের বাসনের সেট—’
‘বলো কী!’ মৃণালকান্তির চোখ বিস্ফারিত। ‘মোটরগাড়ি দেবে না?’
‘না, অতটা বললে লোকে বিশ্বাস করবে না’ ইন্দ্রাণী হেস উঠলেন।
‘সত্যি সত্যিই কি এত দেবে বলেছে?’
‘দিতে চেয়েছে তবে এতসব নয়। রমার মাকে বলার জন্য বাড়িয়ে বলতে তো হবে।’
‘কিন্তু লোকে যখন দেখবে অতসব জিনিস এল না, তখন?’ মৃণালকান্তির চোখে আতঙ্ক ফুটল।
ইন্দ্রাণী হাসতে শুরু করলেন। ডান হাতের তর্জনীটা নাড়াতে নাড়াতে বললেন, ‘একটা জিনিসও আসবে না। তোর বাবা সব বাতিল করে দিয়েছে।’ বলেই গম্ভীর হয়ে গেলেন।
মৃণালকান্তি বলল, ‘বাতিল মানে, নেবে না?’
‘হ্যাঁ, আমরা নোব না। ওরা বারো ভরি সোনার গয়না, খাট, বিছানা, আলমারি দেবেন তা ছাড়া বরাভরণ, ফুলশয্যার তত্ত্ব, নমস্কারি শাড়ি এসব যা যা দিতে হয় দেবেন। তোর বাবা শুনে বলল, মেয়েকে যা দিতে চান দেবেন তবে আমরা কোনো পণ—যৌতুক বা জিনিসপত্তর নোব না। আমরা মানে তুই বাদে আমরা দুজন। তোর তো খুব ভালো একটা ঘড়ির শখ ছিল, সেটাই বলব দিতে।’
শুনতে শুনতে মৃণালকান্তির দৃষ্টি স্থির হয়ে এল। যখন সে ভাবতে শুরু করে তখন তার চোখের মণি নড়ে না। বলল, ‘দিতে হবে না ঘড়ি। কিছুই না নিলে ওরা ক্ষুণ্ণ হতে পারেন, ভাববেন দয়া দেখাচ্ছে। ওই বরাভরণে জামা, জুতো যা দেবে সেটুকু মাত্র নেব, ব্যস। আর রমার মাকে কী বলবে সেটা ঠিক করো।’
‘বললুম তো, মেয়েপক্ষ এই এই দেবে বলেছে। শুনেই দাদাবাবু বলল একটাও কিছু নোব না, আমরা কি ভিখিরি? শ্বশুরবাড়ির দেওয়া জিনিস নিয়ে ফুটুনি করব? তুই বরং একবার ওকে শুনিয়ে এসব বলিস।’
মৃণালকান্তিকে আর বলতে হয়নি। রমার মা বিকেলে কাজে এল না। বারো বছরের রমা সন্ধ্যাবেলায় এসে বলল, ‘মা—র পা ভেঙেছে। সাবান জল দিয়ে দত্তবাড়ির সিঁড়ি ধুচ্ছিল। পিছলে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যায়। মা কাজে আসতে পারবে না যতদিন না পা জোড়া লাগে।’
শুনেই ইন্দ্রাণীর মাথায় বাজ পড়ল। জ্বরজারি নয় যে দু—চারদিন পরে আসবে। ‘তা হলে কাজ করবে কে? মাকে বল একটা কাউকে ঠিক করে দিতে আর বাসনগুলো তুই মেজে দিয়ে যা।’
বিয়ের কয়েকদিন আগে পাঞ্জাবির মাপ দিতে আর জুতো কিনতে মৃণালকান্তিকে নিয়ে হৈমন্তী দোকানে গেলেন। সঙ্গে নিলেন অফিসের তরুণ সহকর্মী দাশগুপ্তকে। সে হালের ফ্যাশনট্যাশনে খুব রপ্ত। দাশগুপ্ত ওদের নিয়ে গেল শেক্সপিয়র সরণিতে চর্মদ্রব্যের এক দোকানে, এখানে বিদেশি জিনিস পাওয়া যায়। মৃণালকান্তির পাম্পশু চাই ধুতির সঙ্গে পরার জন্য। চটির দাম দেড় হাজার টাকা। দেখেই সে বুঝে নিল পাম্পশু—র দাম দুই—আড়াই হাজারের কমে হবে না। সে আড়চোখে বগলে ব্যাগ চেপে রাখা ভাবী শাশুড়ির দিকে তাকাল। হৈমন্তী তখন চোখে মুগ্ধতা মাখিয়ে ব্যাকেটে ঝোলানো খয়েরি রঙের চামড়ার একটা পোর্টফোলিও ব্যাগের দিকে তাকিয়ে। মৃণালকান্তির চোখও ঝকঝক করে উঠেছে। হৈমন্তী ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, ‘আমাদের ইংরিজির প্রফেসার এইরকম একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে কলেজে আসতেন। তুমি ধরো তো এটা।’ মৃণালকান্তি ভূতে পাওয়ার মতো ব্যাগটা হাতে ধরল। ঘাড় কাত করে হৈমন্তী দেখলেন, হাসি ছড়িয়ে পড়েছে মুখে।
‘দাশগুপ্ত, দ্যাখো তো, এবার প্রফেসার বলে মনে হচ্ছে কি না!’
.
৩
মৃণালকান্তি পোর্টফোলিয়ো ব্যাগ হাতে হনহন করে হাঁটতে হাঁটতে ব্যাজার বোধ করল। মা কথাটা বউকে বলতে গেল কেন, ‘অন্য কলেজ দেখুক’, বলার মানেটা কি মা বোঝে? অন্য কলেজেই যদি পাওয়া যায় তা হলে মরতে তিন রকম বাহনে চড়ে দু—ঘণ্টা রাস্তা ঠেঙিয়ে ‘মধু’ কলেজে যাব কেন?
বি কে পাল অ্যাভেনু ছেড়ে মৃণালকান্তি আহিরিটোলা স্ট্রিটে ঢুকল। এই রাস্তাটি সোজা চলে গেছে গঙ্গার পাড়ে। তারপর বাঁদিকে কিছুটা হাঁটলে লঞ্চঘাট, তারপর নিমতলা শ্মশান। গঙ্গা পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটির দু—ধারে বাজার বসে সরু করে দিয়েছে। তার মধ্যে দিয়ে অটোরিকশাগুলোর ভ্রূক্ষেপহীন দ্রুতগতির যাতায়াত, ভাঙা রাস্তায় জমে থাকা জল ও কাদা, ট্যাক্সি, মন্থরগতির বৃদ্ধা, উবু হয়ে দরদাম করা ক্রেতা, আনাজের খোসা আর পাতা, মাছের আঁশটে গন্ধ, টানা একটা শব্দের আস্তরণে ঢাকা এই রাস্তা, দু—ধারে পলি জমা একদা চওড়া খালের মাঝখান দিয়ে সংকীর্ণ নালার মতো এই রাস্তাটা কোনোক্রমে মানুষ আর গাড়ি ঠেলে নিয়ে চলেছে।
ধবধবে ধুতি—পাঞ্জাবি, ঝকঝকে বিদেশি পোর্টফোলিয়ো ব্যাগটি জলকাদা ও ধাক্কাধাক্কি থেকে সামলে, বিশেষ করে জুতোর ঔজ্জ্বল্য, মৃণালকান্তি যখন ঘাটে এসে টিকিট কাটছে তখন দেখল বাগবাজার থেকে যাত্রী বোঝাই লঞ্চটি জেটিতে ভিড়ছে। এরপর দৌড়। যত লোক নামল তার দ্বিগুণ লঞ্চে উঠল। ঠেলাঠেলি করে ওঠার কিছুক্ষণ পর মৃণালকান্তির হুঁশ হল সে কারও পা মাড়িয়ে দিয়েছিল। আশপাশের কয়েকটি মুখ দেখে নিয়ে সে বুঝল এরা কেউ নয়। তার দিকে তাকিয়ে কেউ রাগি চোখে মুখ বিকৃত করছে না। আশ্বস্ত হয়ে সে ঘড়ি দেখল। ভাটার টানে লঞ্চ নির্দিষ্ট গতিতেই চলছে, ঠিক সময়েই পৌঁছে ট্রেনটা পেয়ে যাবে। হাওড়া ব্রিজের তলা দিয়ে যাবার সময় প্রতিবারের অভ্যাসমতো ব্রিজের তলাটা দেখল।
