ইন্দ্রাণী এই বক্তৃতার চাপে সংকুচিত হতে হতেও মাথা তোলার চেষ্টায় তার যুক্তিটা দেখাবার চেষ্টা করেছিলেন, ‘যদি ওরা দিতে চায় নেব না কেন? সমাজে তো এইরকম দেওয়া—নেওয়া চলে। ওরা যদি ওদের মেয়েকে সাজিয়ে দিতে চান তা হলে আমরা আপত্তি করার কে? সংসারে একটা লোক এলে খরচ বাড়ে না? ওদেরও তো খরচ কমবে। তা ছাড়া খালি হাতে বউ এলে লোকে কী বলবে?’
‘লোক না পোক।’ সুযোগ পেলেই তরুণকান্তি কথাটা বলে দেন। ‘লোকের কথা শুনে চললে দুনিয়ায় বাস করা যায় না।’
মুখ ভার করে ইন্দ্রাণী বলেছিলেন, ‘এতকাল ধরে দুনিয়ায় লোক বাস করে এল আর তোমারই অসুবিধে হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ হচ্ছে।’ তরুণকান্তি রুক্ষস্বরে বলেছিলেন, ‘দুনিয়াটা আর আগের মতো নেই, বদলে গেছে, আমাদেরও বদলাতে হবে। যদি ওঁরা মেয়েকে গয়নাগাটি দিতে চান দেবেন, তার বেশি আর কিছু নয়। না খাট—বিছানা, না টিভি, ফ্রিজ—ওসব আমাদের আছে।’
‘মিনুকে যদি কিছু দিতে চায়?’
‘ওটা মিনুর ব্যাপার। যদি নিতে ইচ্ছে করে নেবে।’
ইন্দ্রাণী স্বামীর এই কথাটা মনে রেখেছিলেন। হৈমন্তীকে যখন তরুণকান্তি বললেন, ‘এতসব দেবেন কী করে?’ এবং হৈমন্তী যখন জানালেন এতসব দেবার জন্য তার সঞ্চয়ের কথা, ইন্দ্রাণী তখন বললেন, ‘মেয়ের বিয়েতে সবই খরচ করে দেবেন, এটা কীরকম কথা! না না অত খরচ করতে যাবেন না, নিজের জন্য কিছু রাখুন। আমাদের যা খাট বিছানা চেয়ার টেবিল তাতে আশা করি আপনার মেয়ের অসুবিধে হবে না।’
‘না, না, অসুবিধে হবে কেন? সাধারণ গেরস্তভাবেই ও মানুষ হয়েছে। যেকোনো অবস্থার সঙ্গে মৌ মানিয়ে নিতে পারে। এই গুণটা আমার মেয়ের আছে। তা হলে আমি কি ধরে নিতে পারি আপনাদের চাওয়ার কিছু নেই।’ হৈমন্তী মৃদু স্বরে জানতে চেয়ে দুজনের মুখের দিকে প্রত্যাশাভরে তাকালেন।
‘আমার বা আমার স্ত্রীর চাওয়ার কিছু নেই। না যৌতুক না পণ। আংটি, ঘড়ি, খাট, বিছানা, কোনো জিনিসপত্তর নয়। স্ট্রিক্টলি বারণ।’ তবে ছেলের কিছু চাওয়ার থাকতে পারে, এই বাক্যটি অনুক্ত রাখায় কয়েক সেকেন্ড তরুণকান্তি মনে একটা খচখচানি বোধ করলেন, তবে সেটা ঢেকে গেল একটা ফুরফুরে সুখে। কাজের মতো একটা কাজ তিনি করলেন, জীবনে এই প্রথম। সাধারণ স্তর থেকে নিজেকে তুলতে পেরেছেন। হৈমন্তীর চোখে কৃতজ্ঞতার হালকা ছায়া ভেসে যেতে দেখে তিনি আনন্দ ও সুখ দুটোই বোধ করলেন।
‘বিয়ের দিনক্ষণটা আপনিই ঠিক করে আমাদের জানাবেন, পাকাদেখার কোনো দরকার আছে বলে তো মনে হয় না।’ তরুণকান্তি বললেন।
‘আপনি যা বলবেন সেইরকমই হবে।’
ইন্দ্রাণী বললেন, ‘ব্যস্ত হবেন না। গুছিয়ে জোগাড়যন্ত্র করতে সময় লাগবে। আমাদের তাড়া নেই।’
‘তা হলে এবার আমি আসি।’ উঠে দাঁড়ালেন হৈমন্তী।
‘আপনি যাবেন কীভাবে, মেট্রো দিয়ে?’ তরুণকান্তি জানতে চাইলেন।
‘ট্যাক্সিতেই যাব।’ হৈমন্তী এখন খুশির মেজাজে। কয়েকটা টাকা বেশি খরচ হবে। হোক। ব্যাঙ্কের চাকরিটা পাওয়ার চিঠি হাতে নিয়ে ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরছিলেন, তারপর আজ পেলেন। এই নিশ্চিন্তি। ঘর থেকে বেরোনোর জন্য পা বাড়ালেন।
‘দাঁড়ান। মিনু আপনার সঙ্গে যাক, ট্যাক্সি ধরে দেবে।’ তরুণকান্তি ব্যস্ত হয়ে বললেন। ইন্দ্রাণী দ্রুত গেলেন মৃণালকান্তির ঘরে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে হৈমন্তী পিছু ফিরে মুখ তুলে দেখলেন বারান্দায় স্বামী—স্ত্রী দাঁড়িয়ে। ইন্দ্রাণী হাত নাড়লেন। হৈমন্তীর মনে হল বাড়িটার মতো এরা তত পুরোনো নয়। মৌয়ের অসুবিধা হবে না মানিয়ে নিতে। সদর দরজার পাশে দুটো ঘর। মাথায় সাইনবোর্ড। দরজা বন্ধ সাইনবোর্ড থেকে হৈমন্তী বুঝলেন একটিতে বসেন হোমিয়োপ্যাথি ডাক্তার, অন্যটি ইলেকট্রিক্যাল দ্রব্য সারাইয়ের।
মৃণালকান্তি বলল, ‘আমাদের ভাড়াটে। খুব ধরাধরি করায় বাবা বছর দুয়েক হল ওদের দিয়েছে। নয়তো খালিই পড়েছিল।’
বড়ো রাস্তায় খদ্দেরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল একটা ট্যাক্সি। মৃণালকান্তি বলল, ‘ভাগ্য ভালো। আজ রবিবার বলে পেলুম, অন্য দিন হলে এত সহজে ট্যাক্সি মিলত না।’
মৃণালকান্তি প্রণাম করতেই হৈমন্তী স্মিত হেসে মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘থাক বাবা দীর্ঘজীবী হও, সুখে থাকো।’
বাড়ি ফেরার সময় রমার মায়ের সঙ্গে রাস্তায় তার দেখা হল। কৌতূহলে টসটস করছে রমার মা—র মুখ। ‘দাদাবাবু আজ যার আসার কথা ছিল আপনাকে দেখতে ইনিই কী সেই?’
‘হ্যাঁ।’
‘খুব সুন্দর দেখতে তো, মেয়েও নিশ্চয় সুন্দরী হবে।’
‘হতে পারে।’ মৃণালকান্তি এড়িয়ে যেতে চায় এই স্ত্রীলোকটিকে। এ—বাড়ির হাঁড়ির কথা সে—বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ায় রমার মা যে অতীব পারদর্শী, সেটা সে জানে। সে চায় না তার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে এই খবর পাড়ায় এখনই ছড়িয়ে পড়ুক। কিন্তু এখন বুঝে গেল খবরটা আর গোপন থাকল না। শকুনের মতো ওর দৃষ্টি। তল্লাটে কখন কোথায় কী ঘটনা তৈরি হচ্ছে, কে কী বলল বা করল, সব যেন ও টের পায় বা শুনতে পায়। তারপরই ঝাঁপিয়ে খবর থেকে নাড়িভুঁড়ি বার করে ছড়িয়ে দেয়। মৃণালকান্তির এক এক সময় মনে হয় রমার মাকে পুলিশের চরের কাজ নিতে বলবে।
বাড়ি ফিরতেই ইন্দ্রাণী বললেন,’দেখলুম রমার মাকে তোর সঙ্গে কথা বলতে।’
