ব্যস্ত হয়ে মৃণালকান্তি বলল, ‘না না কিছু মনে করিনি। আমি তো ব্যাপারটা ভুলেই গেছি। নেমন্তন্ন বাড়িতে ওরকম একটু—আধটু হয়েই থাকে।’
হৈমন্তী সন্তুষ্ট হলেন কণ্ঠস্বরে। কলেজে পড়ায়, ক্লাসে লেকচার দিতে হয়। উচ্চচারণ এমন মার্জিত স্পষ্ট না হলে চলবে কেন!
‘বাড়ি থেকে কখন কলেজে বেরোও?’ কিছু একটা বলতে হবে তাই হৈমন্তী প্রশ্নটা করলেন বাক্যালাপ চালু রাখার জন্য।
‘সাড়ে ন—টায় বেরোই। প্রথম ক্লাসটা সাড়ে বারোটায়।’
‘তিন ঘণ্টা আগে, অত সকাল সকাল বেরোও!’ হৈমন্তী অবাক হলেন।
মৃণালকান্তি ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল। হৈমন্তী দেখলেন সাজানো দাঁত এবং মাড়ি বেরোল না। হাসিটা ভালো।
‘তিন ঘণ্টাতেও এক একদিন সাড়ে বারোটার ক্লাস মিস করি। তিন রকম বাহনে আমাকে যেতে হয়। প্রথমে লঞ্চে হাওড়া স্টেশন, যদি জোয়ার থাকে তা হলে লঞ্চ পনেরো মিনিটের পথ নেবে পঁচিশ মিনিট। তারপর ট্রেন। লেট থাকতে পারে, বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, লাইনে বসে পড়ে নানান তুচ্ছ কারণে অবরোধ হতে পারে। এই সব কারণের কিন্তু বাপ—মা নেই। ধর্ষণ, ডাকাতি, পঞ্চায়েত ইলেকশনে ফলস ভোট, গলায় দড়ি, বিদ্যুৎ না থাকা, মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি—সে যে কত রকমের অজুহাত হতে পারে রেল লাইনে বসে পড়ার তার ইয়ত্তা নেই। ট্রেন যদি গড়গড়িয়ে চলে তো ভালো। তারপর ট্রেকারে এক মাইল। যাতায়াত করে দুটি মাত্র ট্রেকার। স্টেশনে নেমে দেখলেন একটিও নেই। এবার কী করবেন?’ মৃণালকান্তি ছুড়েই দিল প্রশ্নটা হবু শাশুড়ির দিকে।
হৈমন্তী মজা পাচ্ছিলেন, তার মনে হচ্ছিল ছেলেটির রসবোধ আছে, কথা বলতে ভালোবাসে, বাস্তব জ্ঞানটাও ভালো, এ ছেলে মফস্সল কলেজ থেকে একদিন কলকাতায় কোনো কলেজে চলে আসবে, নয়তো ডিফিল করে যাবে মফস্সলের কোনো ইউনিভার্সিটিতে, এমন কথাই বলেছে তার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার।
গাছে না উঠতেই এককাঁদি এই অধৈর্য তত্ত্বে তিনি একদমই বিশ্বাসী নন। অতএব মৃণালকান্তির মফস্সল কলেজে ‘প্রফেসর’ থাকাকে সবুরের অফলিত মেওয়া হিসাবেই ধরে নিচ্ছেন।
মৃণালকান্তির কথা শুনতে শুনতে হৈমন্তীর মুখে মৃদু হাসি ফুটেছিল। সেটা লক্ষ করে ইন্দ্রাণী বললেন, ‘এবার কাজের কথাটা হোক। মিনু তুই এখন ঘরে যা।’
মৃণালকান্তি নিজের ঘরে চলে যাবার পর ইন্দ্রাণী স্বামীকে বললেন, ‘তুমিই বলো।’
তরুণকান্তি কেশে গলা পরিষ্কার করলেন। কপালের থেকে চুলের রেখা পিছনে সরে গেছে যতদূরে, সেখানে হাত বুলোলেন, তারপর বললেন, ‘মেয়ে তো ওনার মানে আমাদের পছন্দ হয়েছে, মনে হয় ছেলেকেও আপনি পছন্দ করেছেন।’ তিনি তাকিয়ে রইলেন মেয়ের মায়ের দিকে।
হৈমন্তী ঘাড় নেড়ে অস্ফুটে বললেন, ‘হ্যাঁ’।
‘তা হলে আমরা নেক্সট স্টেপ যেতে পারি। পাকা দেখা আর বিয়ের দিন ঠিক করা। তাড়াহুড়োর কিছু নেই । আমাদের দুই পরিবারেরই একমাত্র সন্তান। বুঝতেই পারছেন দুজনেই খুব আদরের। এই বিয়েতে পাড়া—প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের না ডেকে আমরা থাকতে পারব না। এই ডাকার মানে, বিয়ে আর বউভাতের জন্য খরচ, সেটা কিন্তু মোটেই কম নয়। এর জন্য টাকার জোগাড় রাখতে হয়। মিসেস মৈত্র আপনি কি এজন্য প্রস্তুত?’ বলার ভঙ্গি হৈমন্তীকে বুঝিয়ে দিল তরুণকান্তি কথাগুলো সাজিয়ে রেখেছিলেন।
‘আমি আমার সাধ্যের মধ্যে প্রস্তুত।’ হৈমন্তী হাসলেন এবং হাসিটা মোলায়েম ঠেকল না হবু বেয়াই ও বেয়ানের কাছে। তা হলেও তাঁরা হৈমন্তীর ‘সাধ্যের মধ্যে প্রস্তুত’কে নিয়ে জানতে চাইলেন না কতটা প্রস্তুত।
হৈমন্তী বললেন, ‘বিয়েতে যা দিতে—থুতে হয় সেসব তো দেবই। আপনাদের এ ছাড়াও কোনো দাবিদাওয়া থাকলে বলতে পারেন। মৌয়ের বাবা নেই, তিনি থাকলে যে—খরচ করতেন তা তো আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। তবু গা সাজিয়ে দিতে না পারলেও বারো ভরির গয়না দেব, খাট—বিছানা, আলমারি দেব। এ ছাড়াও ফুলশয্যার তত্ত্ব, বিয়েতে লোক খাওয়ানো, ছেলের ঘড়ি বোতাম আংটি—।’ তরুণকান্তিকে হাত তুলতে দেখে হৈমন্তী থমকে গেলেন।
‘আপনি তো চাকরি করে সংসার চালান এতসব দেবেন কী করে?’ প্রশ্ন এবং বিস্ময় তার চোখে।
‘মৌয়ের বাবা কিছু টাকা রেখে গেছেন, লাইফ ইনসিয়োরেন্স থেকেও কিছু পেয়েছিলাম সেটা রেখে দিয়েছি, আমার বারো ভরি সোনা। তা ছাড়া আমিও প্রতি মাসে কিছু কিছু করে জমিয়েছি, দরকার হলে পি এফ থেকে তুলব। সব মিলিয়ে মোটামুটি পেরে যাব, সংসার তো আমার খুব বড়ো নয়। খরচ যা হয়েছে তা শুধু মৌয়ের পড়াশুনোর জন্য, ওর বিয়েটা হয়ে গেলে আমি তখন একা, ঝাড়া হাত—পা।’ হৈমন্তী হাসলেন ম্লানভাবে।
বিয়ের এই দেনা—পাওনা ব্যাপারটা নিয়ে স্বামী—স্ত্রী নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, একা চাকরি করে মেয়ের মা এতগুলো বছর চালিয়েছেন এজন্য নিশ্চয় তাকে কষ্ট করতে হয়েছে। যা কিছু সঞ্চয় করেছেন তা যদি মেয়ের বিয়েতেই নিঃশেষ করে ফেলেন, তা হলে জীবনের বাকি দিনগুলো তো আরও কষ্ট করে কাটাতে হবে।
‘পেনশন একটা পাবেন বটে কিন্তু তাতে কতটা সুরাহা হবে সে তো নিজেকে দিয়েই বুঝেছি। বাড়ির ট্যাক্স থেকে পুজোর চাঁদা প্রতিটি ব্যাপারে খরচ বেড়েছে।’ তরুণকান্তি স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘মৌসুমী তো আর ছেলে নয় সে মায়ের ভরণপোষণ করবে, বিয়ে হলে তো শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, বাপের বাড়ির কোনো দায় ওর উপর থাকবে না। ভেবে দ্যাখো, মিনু যদি মেয়ে হত তা হলে আমার অবস্থাটা কী দাঁড়াত? তা ছাড়া এই যে মেয়ের বাড়ি থেকে জিনিসপত্তর নেওয়া এটা তো নিজেদের ছোটো করা।’
