‘না, না, জানে।’ ব্যগ্র উৎকণ্ঠা নিয়ে হৈমন্তী বললেন, ‘মৌ খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিতে পারে। আমার অফিসের রান্না কতদিন তো ওই করে দিয়েছে।’
‘ভালো।’ ইন্দ্রাণী চাটনি মাখিয়ে আঙুলটা চুষে নিয়ে বললেন, ‘অফিসের রান্না আর লোকজনকে খাওয়ানোর রান্না তো এক জিনিস নয়। এসব রান্না শিখতে হয়। আমি শিখেছি শাশুড়ির কাছে, তিনি শিখেছিলেন তার শাশুড়ির কাছে, এভাবেই আমাদের বংশের একটা খাওয়ার রুচি তৈরি হয়েছে। বাপের বাড়ির রান্না শিকেয় উঠে গেছে। আপনার মেয়ে সেটা পারবে তো! যদি পারে তা হলে আমাকে একটা ফোন করবেন।’
দুজনের মধ্যে একবারও বিয়ের কথা কেউ তুললেন না। দুজনেই যেন জেনে গেছেন—তাদের মনের ইচ্ছাটা কোন পথ ধরে চলেছে। দুজনেই যেন জানে কথাটা একবার পাড়লেই অপরজন রাজি হয়ে যাবে। দুজনেই জানে, এটা হল শুধুই প্রাথমিক সম্মতিপর্ব, তারপর হবে লাখ কথা এবং এন্তার দাবিদাওয়ার সমাধান হলে তবেই দু—হাত এক হবে।
‘আপনার কাছে কলম আছে?’
‘আছে।’ হৈমন্তী বাঁ হাতে ধরা ছোট্ট হাতব্যাগ, যেটা সর্বদা হাতে রাখেন, সেটা এঁটো হাতেই খুলে কলম বার করলেন। খাওয়ার পর হাত মোছার জন্য কাগজের রুমাল রাখা ছিল, সেটা টেনে নিয়ে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনার নম্বরটা বলুন।’
মেট্রোয় ফেরার সময় ইন্দ্রাণী তরুণকান্তিকে বললেন, ‘মিনুর জন্য মেয়ে দেখলুম, আমার খুব পছন্দ হয়েছে, বারিন্দির বামুন, তা হোক। মেয়ের মা ফোন করবে কালপরশুই, ভালো করে কথা বোলো।’
‘মিনু মেয়ে দেখেছে?’ অবাক তরুণকান্তি মাথাটা পরিষ্কার রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত হলেন।
‘নিশ্চয় দেখেছে, ওর পাশে বসেই তো খাচ্ছিল।’
ফোনটা এল পরশু দুপুরেই। অফিস থেকে হৈমন্তী জানায় ‘মৌসুমী বলেছে পারবে, যদি আপনি শিখিয়ে দেন।’
‘নিশ্চয়ই দেব। আমার শাশুড়ি তো তাই করেছিলেন। আপনি তা হলে সামনের রবিবার আমাদের বাড়িতে আসুন। নিজের চোখে দেখে যান ছেলের বাড়ি ঘরদোর…না, না, আমার কোনো দরকার নেই আপনার বাড়ি দেখার, মিনু তো আর থাকতে যাবে না আপনার সংসারে।’
রবিবার দুপুর শেষে হৈমন্তী এলেন এক বাক্স সন্দেশ হাতে নিয়ে। ঘুরে দেখলেন ইন্দ্রাণীর সঙ্গে পুরোনো একশো বছরের বাড়ি। মোটা দেওয়াল, কাঠের কড়িবরগা, খড়খড়ির পাল্লার জানলা। রাস্তার উপর বারান্দায় ঢালাই লোহার নকশাকাটা রেলিং, বারান্দাটাকে ধরে রেখেছে দেওয়ালে আঁটা লোহার ব্র্যাকেট।
তরুণকান্তি বললেন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে হৈমন্তীকে ‘তখন আমার বাবার সদ্য বিয়ে হয়েছে। এখানে তখন সরু সরু রাস্তা বড়োবাজার পোস্তা গেছে। লরি আর মোষের গাড়ির যেতে খুব অসুবিধে হত তাই সি আই টি নতুন চওড়া রাস্তা তৈরি করল বাড়ি ভেঙে। যাদের বাড়ি ভাঙা পড়ল তারা টাকা পেয়ে কলকাতার বাইরের দিকে, কেউ হাওড়ায় কেউ দক্ষিণেশ্বরে বাড়ি করে কিংবা কিনে চলে গেল। আমাদের বাড়িটা বেঁচে গেল কান ঘেঁষে। শুধু গাড়ি বারান্দাটার খানিকটা ভাঙা পড়ল। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেটা সেই ভাঙা বারান্দার অংশ। এরকম ঘটেছে অনেক বাড়ির। এই আমাদের পাশের দত্তবাড়ি। ওদের তো আধখানা বাড়িই ভেঙে ফেলা হল ফুটপাথ বার করার জন্য। বেআব্রু হয়ে গেল বাড়িটা। ছাদে চলুন দেখাচ্ছি।’
তরুণকান্তি ছাদে নিয়ে এলেন হৈমন্তীকে, সঙ্গে ইন্দ্রাণী। ছাদের তিনদিকে পাঁচিল। পাঁচিলের ধারে গিয়ে হৈমন্তী ঝুঁকে দেখতে লাগলেন। জন্ম থেকেই তিনি ভবানীপুরে লালিত। উত্তর কলকাতা দেখেছেন বাসে বা ট্যাক্সিতে যেতে যেতে। আজই প্রথম তিনি কলকাতার প্রাচীনত্বকে কাছের থেকে চাক্ষুষ করছেন। যে বাড়িটিকে দত্তবাড়ি বলে তরুণকান্তি দেখালেন সেটি দেখে অদ্ভুত লাগল হৈমন্তীর। চারতলা বাড়িটা যেন চাকলা করে বঁটি দিয়ে কাটা একটা ওল। বিবর্ণ লালচে শুকিয়ে আসা ঘায়ের মতো, বৃষ্টির জলের ঝাপটায় বালি বেরিয়ে এসেছে। দেওয়ালের দু—ধারের ঘরে দুটো করে জানলা, মাঝে দালান দেখা যাচ্ছে। দোতলার বাঁদিকের ঘরের জানলার পর্দা সরিয়ে একটি অল্পবয়সি বউ কৌতূহল নিয়ে প্রায় কুড়ি গজ দূর থেকে হৈমন্তীকে লক্ষ করছে। এই কুড়ি গজে রয়েছে খোলার চালের একটি বস্তি।
ইন্দ্রাণী বললেন, ‘দত্তরা এখানকার নামকরা বনেদি পরিবার। এখন অবস্থা পড়ে গেছে। ভাইয়ে—ভাইয়ে ঝগড়া, সম্পত্তি নিয়ে মামলা—মোকদ্দমা। ওটি ছোটোবউ।’
বউটি বুঝতে পারল ওরা তার দিকে তাকিয়ে। পর্দা নামিয়ে দিল। হৈমন্তী এধার ওধার চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন, একটু হতাশই হলেন।
‘গঙ্গা এখান থেকে কত দূরে?’
তরুণকান্তি জানালেন, ‘হেঁটে মিনিট পাঁচেক।’
হৈমন্তী বললেন, ‘তাহলে তো আপনারা রোজই গঙ্গাস্নান করতে পারেন।’
ইন্দ্রাণী হাসতে হাসতে বললেন, ‘এত বছর বিয়ে হয়েছে। আমি তিন—চার বারের বেশি গঙ্গাচ্চচান করিনি। যা নোংরা জল, তা ছাড়া সাঁতার জানি না। যদি ডুবে যাই! তবে বান দেখতে অনেকবার গেছি। একবার গেছি চক্ররেল কেমন চলছে দেখতে। চলুন এবার নীচে যাই।’
মৃণালকান্তি বাড়ি ছিল না দুপুর থেকে। এইমাত্র ফিরল। ইন্দ্রাণী ডাকলেন তার ঘরে। ‘মিনু শুনে যা, ইনি হলেন মৌসুমীর মা আর এই হল আমার ছেলে।’
ইতস্তত করছিল মৃণালকান্তি নমস্কার না প্রণাম কোনটা করবে, মা—র চোখের ইশারায় দ্বিতীয়টিই করল। হৈমন্তী এই প্রথম কাছের থেকে দেখলেন হবু জামাইকে। তার মনে হল ছেলেটি দুবলা, লাজুক, মুখের আদল মায়ের মতো, চাহনিতে নম্রতা। ওর গলার স্বর কেমন, তা শোনার জন্য তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সেদিন বউভাতে চেয়ারে বসা নিয়ে মৌ তোমাকে কিছু বোধ হয় বলেছিল। আমাকে ও পরে বলল। লজ্জা পেয়েছে। তুমি কিছু মনে কোরো না।’
