‘ঠিক বলেছেন’, ইন্দ্রাণী বলে ওঠেন। ‘চলুন বাইরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই।’
দুজনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন কথা বলছেন, তখন মৌসুমী মায়ের কাছে এসে বলে, ‘মা তুমি এখানে? আমি সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমাদের ক্লাসের বিনীতার সঙ্গে দেখা হল। পাশের বাড়িতেই থাকে, আমি এখন ওদের বাড়িতে যাচ্ছি। পাঁচ মিনিট। তুমি আবার যেন খোঁজাখুঁজি শুরু করে পুলিশে খবর দিয়ো না।’ বলেই সে দ্রুত চলে যায়।
ইন্দ্রাণী দেখছিলেন টকটকে লাল সিফনের শাড়িতে জড়ানো ছিপছিপে সুঠাম দেহের ফর্সা মেয়েটিকে। আয়ত চোখ, টিকলো নাক, শাঁখের মতো গলা, খইয়ের মতো দাঁত আর মিষ্টি স্বর। তিনি মুগ্ধ হলেন।
‘মেয়ে বুঝি!’ বলাটা নিরর্থক বুঝেই তিনি যোগ করেন, ‘ওরা ক—ভাইবোন?’
‘আমার এই একটিই সন্তান। এবার বিএ পাশ করল।’
‘আরও পড়বে?’
‘যদি ইচ্ছে হয় পড়বে। পড়াশুনোর ব্যাপারে কখনো নাক গলাইনি, ছেলেমেয়ের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করায় আমি বিশ্বাসী নই। আমি চাই বিয়ে দিয়ে দিতে। একা মানুষ, দেখার কেউ নেই, যা দিনকাল পড়েছে ঘরে রাখতে অস্বস্তি হয়। ওকে বলেওছি, জবাব এক কথা, বিয়ে তো যখন তখন করা যায়, এত ব্যস্ত হবার কী আছে?’
‘ছেলে দেখেছেন?’
‘দেখার সময় কোথায় আমার! ওই অফিসের দু—তিনজনকে বলে রেখেছি। ভাবছি এবার ওকে বলব, নিজের পছন্দের কাউকে যদি বিয়ে করতে চাস তো করে ফেল।’ হৈমন্তী হাসলেন, নিরুপায়ের হাসি। ‘মেয়ে বিয়ে করে একটা ছেলেকে সঙ্গে করে এনে বলবে, মা তোমার জামাই আনলুম, অমন বিয়ে আমি মেনে নিতে পারব না।’
‘আমার জাঠতুতো দেওর এমনটা করেছিল, চল্লিশ বছর আগে। ঘোমটা দেওয়া সিঁথিতে সিঁদুর লেপা শাঁখাপরা একটি মেয়েকে এনে বলল, মা তোমার দাসী এনেছি। মা তো ভিরমি খেয়ে পড়ল। ডাক্তার ডাক, ডাক্তার ডাক, হুলুস্থুলু কাণ্ড। এখন আর ওভাবে লুকিয়ে বিয়ে করে না কেউ, বলেকয়েই করে।’
হৈমন্তী জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনারা থাকেন কোথায়?’
‘আহিরিটোলায়। আপনি?’
‘এখানেই, ভবানীপুরে। যার বউভাত সে আমার কলিগের ছেলে।’
‘ও হল আমার খুড়তুতো বোনের ছেলে, আপনার কলিগ হলেন আমার ভগ্নিপতি। এতক্ষণ কথা বললুম, আপনার নামটি কিন্তু জানা হল না ভাই। আমার নাম ইন্দ্রাণী, পদবি চাটুজ্জে।’
‘আমি হৈমন্তী মৈত্র। এইরকম অনুষ্ঠানে এলে একটা লাভ হয়, নতুন নতুন লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়।’
ব্যস্ত হয়ে তখন এলেন ছেলের মা। ইন্দ্রাণীকে বললেন, ‘ন—দি এবার বসে পড় ছাদে পাত খালি হয়েছে। মিসেস মৈত্র আপনিও। মেয়ে কোথায়?’
‘পাশেই বন্ধুর বাড়িতে গেছে। চলুন দিদি, ছাদের কাজটা সেরে ফেলি। মৌসুমীর জন্য অপেক্ষা করে কাজ নেই, কাল আমার অফিস আছে।’
‘তাই চলুন, আমারও সকালে রান্নার তাড়া আছে। ছেলেকে ন—টার মধ্যে ভাত দিতে হবে।’
তিনতলায় পাশাপাশি দুটি ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া হয় বিয়ের জন্য। চারতলায় ছাদ। ওঁরা দুজন ছাদে এসে দেখেন, খাওয়ার টেবিলে জায়গা পাবার জন্য মিউজিক্যাল চেয়ার চলছে।
‘মা এই যে এখানে।’ মৌসুমী দাঁড়িয়ে উঠে হাত নাড়ছে। তার পাশে একটা খালি চেয়ার দখল করে রেখেছে মায়ের জন্য।
হৈমন্তী বিব্রত হয়ে বলল, ‘মৌ এনাকে বসার একটা চেয়ার দেখে দে।’
‘আপনি আমারটায় বসুন, আমি একটা জায়গা দেখে নিচ্ছি।’ ইন্দ্রাণীকে হাত ধরে বসাল মৌসুমী।
এই সময় চেয়ার দখলটা অতি দ্রুতবেগে করে ফেলতে হয়। মৌসুমী তাই করল। সে দেখল উলটো দিকের সারিতে একটা খালি চেয়ার। ঠেলেঠুলে গিয়ে সেই চেয়ারে বসতে যেতেই পাশের চেয়ারে বসা যুবকটি বলল, ‘এখানে লোক আছে।’
‘কোথায় লোক?’ চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মৌসুমী বলল।
যুবকটি আঙুল তুলে দেখাল। মৌসুমী দেখে বলল, ‘উনি তো আমার চেয়ারে বসেছেন, আমিই ওঁকে বসতে দিয়েছি, এই চেয়ারে আমি বসব।’ প্রায় ঝগড়ার সুরে বলল মৌসুমী। ম্রিয়মাণ যুবক মন দিল বেগুনভাজায়।
ইন্দ্রাণী লক্ষ করলেন, সুরূপা একটি মেয়ের পাশে তার ছেলেকে উজ্জ্বল ও সুদর্শন দেখাচ্ছে। দেখে গভীর তৃপ্তি অনুভব করেন এবং তখনই একটা ইচ্ছা তার মনে জাগল। পাশে ঝুঁকে বলেন, ‘আপনার মেয়ের পাশে যাকে দেখছেন ওটিই আমার ছেলে। একমাত্র সন্তান, আপনার মেয়ের মতোই।’
হৈমন্তী বারকয়েক তাকিয়ে দেখে নিলেন ধুতি ও গরদের পাঞ্জাবি পরা গৌরবর্ণ, রমণীসুলভ সুকুমার মুখশ্রীর যুবকটিকে। তারপর বলেন, ‘আপনার ছেলে কী করে?’
‘প্রফেসার। কলেজে পড়ায়।’ ইন্দ্রাণীর কণ্ঠে এমন একটা স্বর ছিল যেটা একটা খাদের মধ্যে ধ্বনিত হওয়া শব্দের মতো শোনাল। রোমাঞ্চিত হলেন হৈমন্তী।
‘কোন কলেজে? কী পড়ায়?’
‘এই তো সবে এক বছর হল পাশ করে বেরোল, ইতিহাস পড়ায়। এখন মফস্সলের একটা কলেজে আছে বলদেবপুরে। বেশি দূর নয়, লোকাল ট্রেনে এক ঘণ্টা হাওড়া থেকে।’
ব্যস! এই খবরটুকুই যথেষ্ট মনে হল হৈমন্তীর। তিনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করার দরকার বোধ করলেন না। ‘প্রফেসার’ শব্দখণ্ডটি ঠং ঠং করে তার মাথার মধ্যে বেজে যেতে লাগল।
পাতে চাটনি পড়ার পর হৈমন্তী বললেন, ‘আমার মেয়েকে তো দেখলেন, কেমন লাগল?’
ইন্দ্রাণী ইতিপূর্বে নেওয়া বাসনাটি কীভাবে প্রকাশ করবেন মনে মনে তাই নিয়ে অস্বস্তি বোধ করছিলেন, হৈমন্তীর প্রশ্নটায় হাঁফ ছাড়লেন। ‘কেমন লাগল’ কথাটা তিনি এর আগে তিনবার শুনেছেন এবং প্রতিবারই বলেছেন ‘ভালোই তো’। তারপর কন্যাপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছেন পছন্দ হয়নি। কিন্তু এখন পছন্দটা তো নিজেই আগ বাড়িয়ে মনে মনে করে ফেলেছেন। কেমন লাগল মানে পছন্দ হয়েছে কি না জানতে চাইছে মেয়ের মা। তার মানে সম্বন্ধের প্রস্তাবটা দেওয়া, তবে কিনা তার উত্তরের উপর সেটা নির্ভর করছে। ইন্দ্রাণী গম্ভীর হয়ে গেলেন, মেয়ের মায়ের কাছে ছেলের মায়ের যতটা ব্যক্তিত্ব বিচ্ছুরণ করতে হয় গলার স্বরে তার চেষ্টা করে, এঁটো তর্জনীটা তুলে বললেন, ‘বেশ ভালোই তো। গায়ের রং, গড়ন, পেটন, হাইট, গলার স্বর, মাথার চুল, বিএ পাশ—রান্নাটা বোধহয় জানে না।’
