গৌরীর বাড়িতেও এইভাবে কথা হবে নিশ্চয়।
‘তোমার মা কষ্ট পাবে।’
‘তা পাবে। আমি চিঠি লিখে যাব।’
‘কবে যাবে?’
‘এখনও দিনটিন ঠিক করিনি, টাকাপয়সা ব্যবস্থা করার ব্যাপার আছে তো, সংসার পেতে বসার জন্য সবই তো কিনতে হবে।…তোমায় যাবার আগে বলব। এখন যাই, আর আসতে হবে না।’
‘আমায় বলবে কী করে?’
‘ভাইয়ের হাতে চিঠি দোব, যখন খেতে আসবে তোমায় দেবে…চলি।’
গৌরী রাস্তা পার হয়ে চলে যাচ্ছে। ভিড়ের মধ্য দিয়ে তার নিতম্বের দোলা, আর ফ্রকের গাঢ় নীল ফুলছাপ আর ভিজেচুল যতক্ষণ দেখা যায় অনন্ত দেখার চেষ্টা করল। আশা করেছিল একবার অন্তত পিছন ফিরে তাকাবে, কিন্তু গৌরী তাকায়নি। এতক্ষণ যে মৃদু আঁচ তার মনকে তাজা ঝরঝরে করে রেখেছিল গৌরী চলে যাওয়ামাত্র সেটা নিবে আসছে। ওর চলে যাওয়ার মধ্যে কেমন একটা নিষ্ঠুর ভঙ্গি রয়েছে যাকে বলা যায় কাঠিন্য। তবে ওর মায়া—মমতাও আছে। একবার আলুর দমের দাম নেয়নি, আজও ফ্রাই খাওয়াল। অথচ কী এমন তার সঙ্গে পরিচয়? পাঁচ মাস ধরে দুপুরে কিছুক্ষণের জন্য দেখা হওয়া আর কয়েকটা সাধারণ কথাবার্তা! কত সহজভাবে তার সঙ্গে কথা বলল আজ। কত তাড়াতাড়ি তাকে বিশ্বাস করেছে, নয়তো বাড়ি থেকে পালাবার কথা কি বলত?
একটা গুপ্ত খবর জেনে যাওয়ার এবং সেটাকে কোনোমতেই প্রকাশ না করার সংকল্প থেকে তৈরি হওয়া চাপ তার মধ্যে উত্তেজনা এনে দিয়েছে। বাড়ির উদ্দেশে হাঁটতে হাঁটতে অনন্তের মনে পড়ল পান খাওয়াবার জন্য গৌরীকে আর বলা হল না। মুখে কি গন্ধ হয়েছে? নিজের মুখের গন্ধ টের পাওয়া যায় না। হাতের চেটোয় ভাপ দিয়ে সে শুঁকল, কিছু বুঝতে পারল না। তাইতে অস্বস্তিবোধ করতে লাগল। সে ঠিক করল আজ সবার সঙ্গে দূর থেকে কথা বলবে। মুখটা অন্যদিকে ঘোরাবে মা যখন ঝুঁকে থালায় কিছু দিতে থাকবে।
কিংবা বলেই দেবে গৌরী তাকে খাইয়েছে। কে গৌরী? চাওয়ালার মেয়ে, রোজ ওর সামনে বেঞ্চে বসে আলুর দম দিয়ে রুটি খাই, তখন কথাবার্তা বলি। নানান রকমের কথা, সিনেমা, জামাকাপড়, হাঁটার স্টাইল, পুরুষদের কতরকমভাবে মেয়েদের দিকে তাকানো, বাড়িওয়ালাদের বদমাইশি, আরও অনেক রকম কথা। খুব ভালো মেয়ে, একদমই গায়েপড়া নয়। বয়স? প্রায় সমানই কিংবা দু—এক বছরের ছোটো।
মা কীভাবে নেবে? খারাপ কিছু ভাববে কি? সন্দেহ করার মতো মন মায়ের নয়। তা যদি হত তা হলে নিশ্চয় জেনে যেত মিনু নামে একজনের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক ছিল।
অনন্ত যখন বাড়ি পৌঁছল শীলা তখন অবিনাশের সঙ্গে কথা বলছে। অনু ঘরে নেই, বোধহয় পাশের বাড়িতে কিংবা দোতলায় আর অলু তক্তাপোশের এককোণে কাত হয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছে। ভিজে শার্ট আর ধুতি উঠোনের তারে মেলে দিয়ে অনন্ত ঘরে আসতেই অবিনাশ বলল, ‘রাস্তার জল কমেছে?’
‘এদিকে বিশেষ জল জমেনি। আমাদের ওদিকটায় খুব জমেছে!’
‘ঠাকুরপো অনেকক্ষণ এসেছেন, অফিসে নাকি লোক নেবে, তাই বলছিলেন…
‘কিন্তু ও তো স্কুল ফাইনালটাও পাশ করেনি, টাইপও জানে না।…তাই বলছিলুম প্রাইভেটে পরীক্ষাটা দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে আর সেইসঙ্গে টাইপটাও শিখে নিলে ভালো। এমপ্লয়ির ছেলে, ধরাধরি করলে হয়ে যাবে। ইউনিয়নও এসব ক্ষেত্রে বাগড়া দেবে না, আমি কথা বলেছি। তুই সামনের বছরই পরীক্ষা দেবার জন্য তৈরি হ। এখানে না হোক অন্য কোথাও চেষ্টা করা যাবে। কোয়ালিফিকেশন না থাকলে তো কোথাও কিছু পাবি না। দপ্তরির কাজ করে কত টাকা আর পাবি, নিজে কারবার খুলেও যে কিছু করবি তা—ও সম্ভব নয়।’
‘না, আমি দপ্তরিখানা ছেড়ে দেব, এখানে আমার ভবিষ্যৎ নেই।’
অনন্ত ভারী গলায় বিজ্ঞের মতো তার সিদ্ধান্ত জানাল। শীলা চকিতে একবার অলুর দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, ‘মেয়েদের বিয়ের টাকা ভাঙিয়ে খাচ্ছি। তা—ও তো একদিন শেষ হয়ে যাবে, তারপর?’
অবিনাশ মেঝের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হল। অনন্ত একদৃষ্টে দেওয়ালে চোখ রাখে, কোলের উপর হাতদুটি। শীলা এই নীরবতাকে ভাঙার চেষ্টা করল না।
‘অমরকে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি।’
দু—জনে অবিনাশের মুখে জিজ্ঞাসু চোখ রাখল।
‘ওকে ওইভাবে অপদস্থ করা অনন্তর উচিত হয়নি…জীবনে এসব জিনিস বহু ঘটে, সামান্য ব্যাপার, তাই নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি…ছেলেটার মনে খুবই লেগেছে।’
অনন্ত মাথা নামাল। তারও একসময় মনে হয়েছিল, সে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। অনুতপ্ত বোধ করে ভেবেছিল অমরের খোঁজ নেবে পাড়ায় ওর বন্ধুদের কাছে অথবা কলেজে। কিন্তু কিছু সে করেনি।
‘কোথায় গেছে?’
‘জানি না!’
‘ও থাকলে, চার—পাঁচ বছরের মধ্যেই সংসারটাকে মোটামুটি নিশ্চিন্ত করে দিতে পারত।’
অনন্তের মনে হল, আর একটা বোঝা তার ঘাড়ে এসে পড়ল। সংসারের নিশ্চিন্ত হওয়ার একটা পথ ছিল কিন্তু তার জন্যই সেই পথ হারিয়ে গেল। এখন তার উপরই দায়িত্ব পড়ল আবার পথ বার করে নিশ্চিন্তি এনে দেওয়ার। নিশ্চিন্তি মানে টাকা রোজগার করতে হবে কিন্তু কীভাবে করবে?
‘আমাকে তা হলে স্কুল ফাইনাল পাশ করতে হবে?…কিন্তু আমি তো সব ভুলে গেছি।’
তার করুণ স্বর অবিনাশের গম্ভীর মুখে হাসি ফোটাল। অলু একবার বই থেকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল।
‘বই জোগাড় কর। পারিস তো একটা কোচিংয়ে ভরতি হয়ে যা। রোজ যদি ঘণ্টাচারেক করেও বই নিয়ে বসিস তা হলে ছ—মাসেই তৈরি হয়ে যাবি, পারবি না?’
