খবরের কাগজে অম্বিকা লাহিড়ীর মৃত্যুসংবাদটা দেখা হয়ে গেছে মৌসুমীর। শ্বশুরের প্রশ্নটার একটা প্রাসঙ্গিকতা আছে এটা সে বুঝল কিন্তু তাকে কেন জিজ্ঞাসা করা ‘কেমন লাগে?’ তাই সে অবাক হয়ে সব দিক বজায় রেখে বলল, ‘ভালোই তো। বেশ ঝরঝরে গদ্য, টানা গল্প বলে যাওয়া। খুব স্মার্ট সংলাপ, ওঁর যে বয়স আশির কাছাকাছি একদমই বোঝা যায় না লেখা থেকে।’
তরুণকান্তির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘ঠিক এইজন্যই ওঁর প্রথম উপন্যাস পড়েই, নামটা বোধহয় ‘গ্রীষ্মের দুপুর’, তখন কলেজে পড়ি, ওঁর ভক্ত হয়ে যাই। বাম ঘেঁষা লেখা, স্ট্রাইক চলছে এমন এক কারখানার শ্রমিক আর তার পরিবার নিয়ে লেখা। তখনও জানতুম না উনি আমাদের পাড়ার ব্যানার্জিদের দূরসম্পর্কের জামাই। পাড়ার কালীপুজো উদবোধনে ওঁকে একবার আমরা আনিয়েছিলাম। সুন্দর একটা বক্তৃতা দিলেন। তারপর ব্যানার্জিরা নিয়ে গেল খাওয়ার জন্য। আমরা দু—তিনজন, যারা ওঁর ভক্ত সঙ্গে গেলুম। ওঁকে একেবারে শোওয়ার ঘরে খাটে বসানো হল। উনি বালিশটা বগলে নিয়ে খাটে পা ছড়িয়ে কাত হয়ে গল্প শুরু করলেন। একেবারে ঘরোয়া। চলে আসার আগে প্রণাম করলুম। তখন দেখলুম পায়ের নখগুলো বেশ বড়ো আর ময়লা, আর গোড়ালিতে লম্বা লম্বা ফাটার দাগ আর ফাটার মধ্যেও ময়লা জমে। লোকে তো আর পা দেখে না তাই পায়েরও যত্ন নেয় না। যারা ধুতি আর চটি পরে তাদের কিন্তু নেওয়া উচিত। আজ যখন টিভি ক্যামেরা ওঁর পা দেখাল ক্লোজআপে, তখন কী আশ্চর্য, সেই ফাটা গোড়ালিই দেখতে পেলুম। এত বছরেও ওঁর হুঁশ হয়নি, তাঁর শরীরে একটা অপরিচ্ছন্ন জায়গা রয়ে গেছে।’ বেশ হতাশ হয়েই তিনি কথা শেষ করলেন।
‘কিছু একটা গলদ ওঁর রয়ে গেছিল।’ মৃণালকান্তি মুখ থেকে মাছের কাঁটা বার করতে করতে বলল।
‘কী গলদ?’ তরুণকান্তি প্রশ্ন করলেন।
‘বড্ড বেশি লিখতেন। যতটা পুঁজি তার থেকে বেশি খরচ করতেন।’
রান্নাঘর থেকে ইন্দ্রাণী চেঁচিয়ে বললেন, ‘মিনু আর ভাত দেব?’
‘না।’ উত্তর দিয়ে মৃণালকান্তি নিজেকে বলল, ‘এক গাদা ভাত খেয়ে দৌড় দিয়ে লঞ্চে ওঠা তারপর দৌড়ে গিয়ে ট্রেন ধরা। পারা যায় না।’
খাওয়া দ্রুত শেষ করে সে উঠে পড়ল। মৌসুমী থালাবাটি তুলে নিয়ে রান্নাঘরের এক ধারে রাখতে গেল। তরুণকান্তি ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে খবরের কাগজটা খুলে চোখের সামনে ধরলেন।
ধুতি পরতে পরতে মৃণালকান্তি বলল, ‘পঞ্চাশটা টাকা দাও তো, আজও মাইনে পাওয়া যাবে কি না জানি না।’
মৌসুমী বলল, ‘পঞ্চাশ হবে না, গোটা কুড়ি দিতে পারি।’
‘তা হলে মা—র কাছ থেকে চেয়ে দাও। বলো আমি ধার চাইছি, শোধ দিয়ে দেব। কাছাটা গুঁজে কোঁচার দৈর্ঘ্য ঠিক করায় সে ব্যস্ত হল। ভ্রূ কুঁচকে কী ভেবে ঝুলটা বাড়িয়ে আঙুল ঢেকে দিল।
‘মা পঞ্চাশটা টাকা দিন। ধার।’ মৌসুমী মৃদু কুণ্ঠিত স্বরে বলল।
ইন্দ্রাণী শুধু বললেন, ‘আবার!’
শোওয়ার ঘরে এলেন, পিছনে পুত্রবধূ। চাবি ঢুকিয়ে দেরাজ খুলতে খুলতে বললেন, ‘কী কলেজ রে বাবা, মাইনে ঠিক সময়ে দেয় না! ছেড়ে দিক এমন চাকরি, অন্য কলেজ দেখুক।’
টাকাটা এনে স্বামীর হাতে দিল মৌসুমী। মুখ থমথমে।
‘মা কিছু বলল?’
‘অন্য কলেজ দেখতে বললেন।’ শুকনো স্বর মৌসুমীর।
বাইরে ইন্দ্রাণীর খিঁচিয়ে বলা কথা শোনা গেল। ‘রমার মা, আবার তুমি দাদার বেরোনোর সময় ঘর মুছতে এসেছ? কতদিন বলেছি ঝাঁটা, খালি বালতি দেখে বাড়ি থেকে বেরোলে অকল্যাণ হয়। দাঁড়াও এখন, আগে দাদা বেরোক।’
রমার মা সকালে এসে বাসন মেজেই অন্য দুটো বাড়ি দৌড়য় কাজ সারতে। তারপর ফিরে এসে ঘর ঝাঁট ও মোছার কাজ করে। সাধারণত সে মৃণালকান্তি বেরিয়ে যাবার পরই আসে, আজ সময়ের হিসেবে ভুল করে ফেলেছে।
‘তা হলে মাকেই বল অন্য কলেজটা দেখে দিতে।’ কথাগুলো বলে পোর্টফোলিও ব্যাগটা তুলে চট করে আয়নায় মুখ দেখে নিয়ে, মৌসুমীর ঠোঁটে আলতো চুমু দিয়ে পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে গেল। ওদের বিয়ে হয়েছে এগারো মাস। গাঢ় চুম্বন ক্রমশ আলতো হয়ে আসার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
.
২
মৌসুমী বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান। স্বামী ক্যানসারে মারা যেতে ইউনিয়নের চেষ্টায় হৈমন্তী স্বামীর ব্যাঙ্কের অফিসেই যখন চাকরি পায় মৌসুমী তখন পাঁচ বছরের। অভিভাবকহীন হয়েই সে বড়ো হয়েছে। ঘরে বেশিরভাগ সময় একা, দ্বিতীয় মানুষ বলতে ছিল দিনরাতের এক বৃদ্ধা কাজের লোক—সতীমাসি। সঙ্গীহীন মৌসুমী ধীরে ধীরে জেদি, একরোখা, চাপা স্বভাবের হয়ে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে হয়ে ওঠে সুমুখশ্রী, লাবণ্যময়ী ও গড়নে সুঠাম এক তরুণী। স্বাভাবিকভাবেই কলেজে কয়েকজন ছেলে তার ঘনিষ্ঠ হতে চায়। মৌসুমী তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তাদের সে বন্ধু হিসাবে ভাবতে রাজি তার বেশি আর কিছু নয়। তাই শুনে সবকটি ছেলেই পিছিয়ে যায়। বাংলা অনার্সের ছাত্রী মৌসুমী পড়াশুনোয় ছিল সাধারণ মানের, তবে পাশ করেছিল অনার্স সহ দ্বিতীয় বিভাগের উঁচু দিকে থেকে।
তার বিয়েটা সম্বন্ধ করে বা প্রণয়জনিত কারণে হয়নি। ভবানীপুরে ব্যাঙ্কের এক সহকর্মীর ছেলের বউভাতে মেয়ে—সহ হৈমন্তী নিমন্ত্রিত হয়ে যান। নিমন্ত্রিত ছিল তরুণকান্তিও সপরিবারে। নববধূকে যে বড়ো ঘরে বসানো হয়েছিল সেখানেই বসেছিল নিমন্ত্রিত মহিলারা। ইন্দ্রাণীর পাশেই বসেছিলেন হৈমন্তী। রজনীগন্ধা, বেল, জুঁই আর সেন্টের গন্ধের সঙ্গে ভ্যাপসা গরমে হৈমন্তীর গা গুলিয়ে উঠেছিল। বিড়বিড় করে বলে ওঠেন, ‘নাহ আর বসা যায় না, মাথা ধরে যাবে।’
