জবাব দিলেন না বিজলি। হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে অনেকটা পথ প্ল্যাটফর্ম দিয়ে হেঁটে গেটে টিকিট দিয়ে বেরিয়ে এসে বিজলি বললেন, ‘শরীর আর বইছে নারে পদ্ম, ট্যাক্সি করে বাড়ি যাব।’
ট্যাক্সিতেই তারা বাড়ি ফিরল। বিজলি দেওয়াল ধরে ধরে দোতলায় উঠে খাটে শরীর এলিয়ে দিয়ে পদ্মকে বললেন ‘আলো নিভিয়ে পাখাটা খুলে দে। আমাকে এখন জ্বালাতন করবি না।’
‘আয় ভুটু আমরা নীচে গিয়ে মিহিদানা খাই।’ পদ্ম ভুটুর হাত ধরে সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে। মিহিদানার বাক্সটা থলির মধ্যে ঘরেই রয়ে গেছে। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। পদ্ম চেঁচিয়ে উঠল ‘কে?’
‘আমায় চিনবেন না। একবার দরজাটা খুলুন।’
‘দাঁড়া ভুটু কে এল দেখে আসি।’
ভুটুর হাত ছেড়ে দিয়ে সে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল। গুটি গুটি পায়ে ভুটু বিজলির ঘরে ফিরে এল। সদর দরজা খুলে পদ্ম অবাক। হাঁটু পর্যন্ত সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা পরা কৃষ্ণকায় এক দীর্ঘদেহী পুরুষ, গালে চাপ দাড়ি। সন্ধ্যার মুখের এমন একটি অচেনা লোককে সদরে দেখে তার বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। ঢোক গিলে বলল ‘কাকে চাই?’
‘এই বাড়িতে হাসিনা থাকে?’ গলার স্বর মৃদু, চাপা। পদ্ম ভরসা পেল।
‘হাসিনা আবার কে? হাসিদি থাকত, সে তো মারা গেছে।’
‘আমি হাসির বাবা। আমাকে যিনি ফোন করেছিলেন তিনি কি আছেন?’
পদ্মর গলার স্বর মৃদু ও ব্যথিত হয়ে গেল। বলল, ‘কে ফোন করেছিল তা তো আমি জানি না। আচ্ছা দাঁড়ান মাসিমাকে জিজ্ঞাসা করে আসি।’
পদ্ম ছুটে দোতলায় উঠে ঘরের দিকে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। কীরকম একটা শব্দ হচ্ছে, মেঝেয় পাথর গড়ানোর মতো। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। এমন সময়েই তো রাধুমাসিরা বেরোয়! কান খাড়া করে শুনল, কেমন যেন একটা গলার আওয়াজ, তারপরই কিছু একটা পড়ার শব্দ আর ভুটুর কেঁদে ওঠা, পদ্ম দ্রুত ঘরে ঢুকে আলোর সুইচ টিপল। যা দেখল তাতে চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হল। খাটের দিকে তাকিয়ে দেখল বিজলি ওপাশ ফিরে বালিশ জড়িয়ে শুয়ে।
তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল পদ্ম, ‘ও মাসিমা গো দ্যাখো গো, কী সব্বোনেশে কাণ্ড করেছে ভুটু। দ্যাখো উঠে একবার দ্যাখো।’
নারায়ণ শিলা খাটের তলায়। সিংহাসন সমেত রাধাকৃষ্ণ মেঝেয় উপুড় হয়ে, জগন্নাথ আলাদা হয়ে রয়েছে সুভদ্রা বলরামের সঙ্গে। গায়ত্রী দেবীর মাথা নিখোঁজ। ভয়ে জড়সড় ভুটু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে।
মুখ না ফিরিয়ে বিজলি বললেন, ‘তুই দ্যাখ,ভাঙাভাঙির আওয়াজ আগেই পেয়েছি।’ বিজলি এবার পাশ ফিরে পদ্মর দিকে তাকালেন, ‘তোকে আর গয়ায় গিয়ে পিণ্ডি দিতে হবে না, মুক্তি দেবার লোক আমি পেয়ে গেছি। কে এসেছে নীচে?’
‘হাসিদির বাবা।’
‘যা ওনাকে এখানে নিয়ে আয়। আমার পায়ের যন্ত্রণা এখনও কমেনি।’
একা হয়ে যাওয়া
১
সকালে দাড়ি কামাবার সময় তরুণকান্তি টেলিভিশনে খবর দেখেন। খাওয়ার দালানের বেসিনের উপর আয়না। টেলিভিশন সেটটা ডানদিকে একটা চাকালাগানো টেবলের উপর, মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে তাকালেই ছবি দেখা যায়, তাই দেখছিলেন।
সকাল আটটা—এখন আর আজকের খবর কী করে দেবে, সবই গতকালের বাসি, তরুণকান্তি তাই দেখছেন। এই সময় খবরের কাগজটা পড়ে নেয় ছেলে মৃণালকান্তি, কেন না তাকে পৌনে দশটায় আহিরিটোলা ফেরিঘাটে গিয়ে লঞ্চ ধরে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে ট্রেন ধরতে হবে। মৃণালকান্তি ট্রেনে চল্লিশ কিলোমিটার যাবে, তারপর দেড় কিলোমিটার ট্রেকারে এবং মধুসূদন বিশ্বাস সেন্টিনারি কলেজে সে সাড়ে বারোটায় ক্লাসে ঢুকবে। কলেজটির এখন বয়স আটচল্লিশ। মৃণালকান্তি এখানে ইতিহাসের শিক্ষক গত দু—বছর।
তরুণকান্তি টিভিতে খবর দেখতে দেখতে ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন, সেফটি রেজারটা গালের থেকে সরিয়ে রেখে চেঁচিয়ে ছেলেকে ডাকলেন, ‘মিনু মিনু, শিগগিরি আয়, দেখে যা।’
ঘর থেকে খবরের কাগজ হাতে মৃণালকান্তি বেরিয়ে এল যখন, শববাহী কাচের গাড়িটার পিছন দিক, মুখ আঁচল চেপে ফোঁপানো মাঝবয়সি দুজন মহিলা আর শোক প্রকাশের জন্য ব্যাঙের মতো মুখ করা কয়েকটা লোককে তখন দেখা গেল একঝলক।
‘ইসস, অম্বিকা লাহিড়ী কাল দুপুরে মারা গেল! আগে জানলে নার্সিং হোমে যেতুম।’ তরুণকান্তির স্বরে আপশোস, ‘নিশ্চয় কাল সন্ধের খবরে দেখিয়েছে।’
মৃণালকান্তি বলল, ‘দুপুর থেকে ওয়ান—ডে ম্যাচটা যদি না দেখতে তা হলে খবরটা মিস করতে না। কিন্তু নার্সিং হোমে যাওয়ার কি খুবই দরকার ছিল? খুব কি বড়ো সাহিত্যিক! ইদানীং তো ওঁর লেখা পড়া যায় না, লোকে বলত।’
‘লোক?’ তরুণকান্তি বিরক্ত চোখে তাচ্ছিল্যভরে বললেন, ‘লোক না পোক। লোকের কথা শুনে সাহিত্য শিল্পের জাত বিচার হয় নাকি?’ আবার তিনি গালের উপর অসমাপ্ত কাজটা শেষ করায় মন দিলেন। ছেলের মুখ অপ্রতিভ হয়ে যাওয়াটা লক্ষ করেছিলেন। মনে একটা খচখচানি শুরু হয়ে গেল। গলার স্বর এতটা রুক্ষ না করলেই হত।
মৃণালকান্তি যখন ভাত খেতে বসেছে, খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে টেবলে ছেলের মুখোমুখি বসে বললেন, ‘ছবিটা ওর যৌবনকালের, এখনকার নয়। আমি প্রথমে যখন দেখি তখন এইরকম চেহারা ছিল।’
তরুণকান্তি খবরের কাগজের ষোলো পাতাটা একটু তুলে ধরলেন। মৃণালকান্তি একবার তাকিয়ে খাওয়ায় মন দিল। ছেলের নিরাসক্ত মুখ দেখে তরুণকান্তি খচখচানিটা আবার টের পেলেন। রান্নাঘর থেকে বাটিতে মাছের ঝোল এনে টেবলে রাখল মৌসুমী। তরুণকান্তি ছেলের সঙ্গে রফা করার একটা সুযোগ চাইছিলেন, পুত্রবধূকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘বউমা তুমি তো গল্প উপন্যাস পড়োটড়ো। অম্বিকানাথের লেখা কেমন লাগে?’
