হেসে বিজলি বললেন, ‘আপনার নাতি’।
মহিলা অবাক হয়ে ভ্রু তুলে তাকালেন, ‘আমার!’
‘এ জ্যোতির ছেলে। এর জন্যই আমি এসেছি। জ্যোতি আমার ভাড়াটে। চার মাস আগে জ্যেতির বউ মারা গেছে। এই বাচ্চচাকে দেখার কেউ নেই। আমি ওকে রাখছি। কিন্তু আমার মনে হয় ওর নিজের রক্তের সম্পর্কের লোকেদের হাতেই বড়ো হওয়া উচিত। তাই নিয়ে এসেছি।’
‘আপনি এনেছেন না জ্যোতি পাঠিয়ে দিয়েছি, সম্পত্তির ভাগ নেবার জন্য এই দাবিদারটি তৈরি করে। দেখুন আমরা যথেষ্ট খোঁজ নিয়েছি, খবরও রাখি। জ্যোতি একটা মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করেছিল। এই ছেলেটি সেই মুসলমান মায়ের সন্তান।’
‘মাসিমা হাসিদি—!’ পদ্মর বিস্ফারিত চোখ স্তিমিত হয়ে গেল বিজলির একটি চাহনিতেই।
‘দেখুন এই দোতলায় আমাদের কুলদেবতা রয়েছেন। কথা বলতে চান যদি তাহলে নীচে চলুন।’ মহিলা কঠিন গলায় বললেন। বিজলির দু—কান গরম হয়ে উঠল। হঠাৎ নীচে যেতে বলার পিছনের কারণটা স্পষ্ট। দোতলায় কুলদেবতা এবং মুসলমান মায়ের সন্তান দু—জনের থাকা চলবে না। কিন্তু তিনি এসেছেন প্রার্থী হয়ে, যা বলে বলুক হজম করতে হবে।
ধানের বস্তায় অর্ধেক ভরা নীচে মহিলা তিনজনকে নিয়ে এসে একটা ঘরে তক্তপোশে বসালেন। বিজলি বললেন, ‘জ্যোতির সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি সে সম্পত্তির অংশ দাবি করবে না। আর এই শিশুটিকে আমিই এনেছি। জ্যোতি পাঠায়নি। এমনকী সে জানেও না। ওর নিজের বংশের লোকেদের সঙ্গে থেকে মানুষ হওয়া উচিত বলেই মনে করে ওকে এনেছি, ও আপনার নাতি এটা ভেবেই ওকে আপনার কাছে রাখুন।’
‘নাতি!’ মহিলা প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। ‘এই বাড়িতে মুসলমান মায়ের ছেলে থাকবে? দেখুন আপনি ধর্ম মানেন কিনা জানি না কিন্তু আমরা মানি।’
এই সময় পদ্ম বলে উঠল, ‘একটু জল দেবেন, ভুটু সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এখনও পর্যন্ত জল খায়নি।’
মহিলা বিরক্ত চোখে তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেলেন। পদ্ম অবসন্ন ভুটুকে পাশে বসিয়ে জনিয়ে ধরে রইল। মহিলা ফিরে এলেন প্লাস্টিকের হাতলভাঙা লাল মগে জল নিয়ে। দেখেই মগটাকে তিনি চিনতে পারলেন। তার মাথার মধ্যে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে গেল।
‘পদ্ম ও জল ছুঁবি না।’
ঘরে যেন বাজ পড়ল। বিপ্রদাস চক্রবর্তীর বউয়ের হাতের মগ কেঁপে উঠল। পদ্মরও তটস্থ অবস্থা।
‘আমাকে ধম্মো শেখাবেন উনি? পায়খানার মগে করে জল এনেছেন ভুটুকে খাওয়াবার জন্য! পদ্ম ওঠ, এ বাড়িতে আর এক মুহূর্তও নয়!’
বিজলিবালা কথাটা বলেই দ্রুতপায়ে এগোলেন সদর দরজার দিকে। ভুটুকে কোলে তুলে পড়িমরি তাকে অনুসরণ করল পদ্ম। বাড়ি থেকে বেরিয়ে তারা হাঁটতে লাগল। এখানে রিকশা পাওয়া যায় না। রাস্তার গর্তে পা পড়ে ভুটুকে নিয়ে পদ্ম হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। কোনোরকমে সামলে নিয়ে বলল, ‘মাসিমা আর একটু ভালো করে বললে না কেন, ধম্মো কি গায়ে লেখা থাকে? না ভড়ং দেখিয়ে পুজো করলেই ধাম্মিক হওয়া যায়। ধম্মো তো অন্তরে থাকে তাই না মাসিমা?’
বিজলি শুধু বললেন, ‘হুঁ।’
‘মাসিমা ওই টিনের চালের বাড়ির সামনে একটা বুড়ি, একটু জল চাও না।’
বিজলি এগিয়ে গেলেন বুড়ির দিকে। ‘মা এই শিশুটা অনেকক্ষণ জল খায়নি, একটু জল দেবে?’
কথাটা শুনে বুড়ি ‘দাঁড়াও বাছা’ বলে হনহনিয়ে বাড়ির ভিতর চলে গেল। একটা ছোট্ট রেকাবিতে চিনি আর ঝকঝকে স্টিলের গ্লাসে জল নিয়ে এল। ভুটু আধ গ্লাস জল শেষ করল বাকিটা আলগোছে খেল পদ্ম।
‘আর জল খাবে?’ বুড়ি জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ।’ বলেই পদ্ম খানিকটা চিনি মুখে দিয়ে রেকাবিটা বিজলির সামনে ধরল।
‘তুমি।’
‘আমিও।’ বিজলি বললেন রেকাবিটা হাতে নিয়ে।
জল খেয়ে ওরা রওনা হল বাস ধরতে। কিছুটা হেঁটে বিজলি বললেন, ‘ওরে আমি আর পারছি না, পায়ের যন্ত্রণাটা আবার চাগাড় দিয়েছে।’
‘তা হলে একটু দাঁড়াও, কমুক যন্তাোন্নাটা।’ ভুটুকে কোল থেকে সে নামাল।
বিজলি দাঁড়িয়ে পড়লেন। পদ্ম কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞাসা করল, ‘হাসিদি মুসলমান, একথাটা তো আমায় বলোনি।’ গলার স্বরে অভিমান স্পষ্ট।
‘তোর মনে আছে হাসি লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়েছে, নারায়ণ শিলা ছুঁয়েছে!’
‘তোমার মতো করে পেন্নামও করছে।’
‘লোকে জানলে কী বলবে কী ভাববে সেই ভয়ে আমি তোকে বলিনি। তোর পেটে তো কথা থাকে না! চল হাঁটি। দাঁড়িয়ে থেকে যন্ত্রণা কমবে না। ভুটুকে এবার মুতিয়ে নে।’
ওরা একটা মিনিবাস পেয়ে গেল। বর্ধমানে নেমে পদ্ম বলল, ‘মাসিমা এখানকার মিহিদানার খুব নাম, তুমি খেয়েছ?’
বিজলি কথার জবাব না দিয়ে ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে পদ্মর হাতে দিয়ে বললেন, ‘লোককে জিজ্ঞেস কর এখানে নাম করা দোকান কোনটে, এতে যতটা হয় কিনে আন। আমি ভুটুকে নিয়ে দাঁড়াচ্ছি।’
এবার ট্রেনে উঠে ওরা বসার জায়গা পেল। কামরার দেওয়ালে ঠেস দিয়ে মাথা ঠেকিয়ে বিজলি চোখ বুজলেন। জানলার ধারে বসে পদ্ম কমলালেবু খাওয়াতে লাগল ভুটুকে। এক একটা স্টেশন আসছে, যাত্রীরা ওঠানামা করছে, হকার চেঁচাচ্ছে, বিজলির চোখ একবারও খুলল না।
‘মাসিমা ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’
‘কেন?’ চোখ না খুলে বললেন বিজলি। পায়ের যন্ত্রণাটা এখন তাঁর মুখে ছাপ ফেলেছে।
‘ভুটু থাকবে আমাদের বাড়িতে?’ মুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে পদ্ম জানতে চাইল।
