‘তিনকোনিয়া যান সেখানে থেকে ছাড়ে কাটায়োর বাস।’
‘কত দূরে তিনকোনিয়া?’
লোকটি তাঁদের দু—জনকে আপাদমস্তক দেখে বলল, ‘রিকশা করুন।’
রিকশায় মিনিট পাঁচেক গিয়ে বাস টার্মিনাস। বাসের রুট বোর্ডে নাম দেখে, কনডাকটরকে জিজ্ঞাসা করলেন বিজলিবালা, ‘হ্যাঁ বাবা, এই বাস মল্লিকপুর যাবে?’
‘যাবে।’
‘কতক্ষণ লাগবে যেতে?’
‘পঞ্চাশ মিনিট।’
পদ্ম বলল, ‘ভাড়া কত?’
‘তেরো টাকা’ বলেই কনডাকটর যোগ করল, ‘এটা সুপার বাস।’
তারা বাসে উঠল এবং বসার জায়গা পেল। টিকিট কেনার সময় বিজলি বললেন, ‘বাবা মল্লিকপুরে নামিয়ে দিয়ো, আমরা নতুন যাচ্ছি, কিচ্ছু চিনি না।’
দশ মিনিট যাবার পরই বিজলি উদবিগ্ন স্বরে বলে উঠলেন, ‘মল্লিকপুরে নামব, মনে আছে?’
অল্পবয়সি কনডাকটর চিৎকারে ভাঙা গলা যথাসাধ্য কোমল করে বলল, ‘ঠিক নামিয়ে দোব দিদিমা, ব্যস্ত হবেন না।’
মিনিট চল্লিশ পর সে বলল, ‘দিদিমা মল্লিকপুর। গেটের কাছে আসুন।’
বাস থেকে নেমে তারা এধার—ওধার তাকাচ্ছে। এক ভ্যান রিকশাওয়ালা তাকে লক্ষ করছিল। বলল, ‘যাবেন কোথায়?’
‘মল্লিকপুর।’
‘কাদের বাড়ি।’
‘চক্রবর্তীদের।’
‘কোন চক্রবর্তী, নাম কী?’
মুশকিলে পড়লেন বিজলি। জ্যোতির বাবার নাম একবার মাত্র শুনেছেন,এখন মনে পড়ছে না, জ্যাঠার নামও জ্যোতি বলেছিল সেটাও ভুলে গেছেন।
তাঁর বিপন্ন ক্ষুব্ধ মুখ দেখে রিকশাওয়ালা সাহায্য করল।
‘ওই বইয়ের দোকানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে আসুন।’
খাতা কাগজ কলমের রিফিল আর স্কুলপাঠ্য বইয়ের সঙ্গে পাঁজি এবং উপন্যাস নিয়ে বইয়ের দোকান। দুপরে ক্রেতা নেই। এক প্রৌঢ় কাউন্টারের পিছনে টুলে বসে।
বিজলি শুরু করলেন, ‘জ্যোতির্ময় চক্রবর্তী নামে একটি ছেলে থাকত মল্লিকপুরে। বাড়ির অবস্থা ভালো। বর্ধমান শহরে বাড়ি আছে, চালের আড়তও আছে। বোনের বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামে পুজুরি ব্রাহ্মণের সঙ্গে। জ্যোতির্ময়ের বাবার নাম জানি না, আপনি কি বলতে পারবেন ওনার বাড়িটা কোথায়?’
প্রৌঢ় একমনে শুনে বললেন, ‘বিপ্রদাস চক্রবর্তী। দ্বিতীয় পক্ষের বউ।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ। জ্যোতির্ময় প্রথম পক্ষের।’ বিজলি স্রোতে ভাসতে ভাসতে ধরার মতো একটা কাঠ যেন পেলেন।
‘তা বিপ্রদাসকে কী দরকার। তার তো হাঁপানি, বাতেও পঙ্গু। শয্যাশায়ী।’
‘ওর সঙ্গে দুটো কথা বলতে এসেছি।’
‘বিপ্রদাসের বাড়ি এখান থেকে একমাইল—তেঁতুলতলায়। রিকশা করে যান, রাস্তা খুব খারাপ, হাঁটতে পারবেন না।’
ভ্যান রিকশায় দুটি লোক উঠে পা ঝুলিয়ে বসে রয়েছে। পদ্ম উঠে রিকশার পাটাতনে ভুটুকে কোলে নিয়ে বসল। বিজলিবালা চাকার পাশে বসলেন পা ঝুলিয়ে, পদ্ম জিজ্ঞাসা করল, ‘মল্লিকপুর যেতে পড়বে কত?’
‘পাঁচটাকা করে।’
বিজলিবালার কানের কাছে মুখ এনে পদ্ম বলল, ‘কলকাতার থেকে সস্তা, তাই না মাসিমা।’
প্রৌঢ় ঠিকই বলেছিলেন। রাস্তা যে এত ভাঙা হতে পারে, এত গর্ত থাকতে পারে সে ধারণা ওদের ছিল না। পদ্ম একবার শুধু বলে, ‘মাসিমা বাড়ি ফিরে দু—দিন শুয়ে থাকব,গায়ের ব্যথা মারতে।’
একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে রিকশাওয়ালা বলল ‘এই বিপ্রদাস চক্রবর্তীর বাড়ি।’
বাড়িটা চৌকো গড়নের। উপরে নীচে সার দিয়ে সাত—আটটা জানালা। বাড়ির মাঝামাঝি সদর দরজা। ভুটু বাসে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিয়েছে, এখন সে চনমনে। ওকে হাঁটিয়ে নিয়ে বিজলি সদর দরজার দিকে এগোলেন। দোতলায় জানলা থেকে সরে গেল এক স্ত্রীলোকের মুখ।
সদর দরজা খোলা রয়েছে। ইতস্তত করে বিজলি ভিতরে ঢুকলেন। একটা উঠোন থেকে ঘিরে রক। দোতলায় বারান্দা। সেখানে দাঁড়িয়ে এক বছর পঞ্চাশ বয়সি মহিলা।
‘কাকে চাই।’ গলার স্বর ভারী ব্যক্তিত্বপূর্ণ।
‘আমরা কলকাতা থেকে আসছি। বিপ্রদাসবাবুর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।’ বিজলি যথাসম্ভব বিনীত স্বরে বললেন।
‘ওপরে আসুন, ডান দিকে সিঁড়ি। উনি অসুস্থ, ঘুমোচ্ছেন। কিছু বলার থাকলে আমায় বলতে পারেন।’
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় পদ্ম চাপা স্বরে বলল, ‘মাসিমা গলায় স্বর শুনলেন! সোজা লোক নয়।’
‘একদম কথা বলবি না।’
সিঁড়ি শেষ হয়েছে লম্বা দরদালানে। তার একদিকে পর পর ঘর। সারা বাড়িতে সাড় নেই। কোনো লোকজনও দেখলেন না। দালানটা চকচকে লাল সিমেন্টের। পুরোনো বাড়ি। মোটা দেওয়াল, খড়খড়ির জানলা। দালানের এক প্রান্তে ঝাঁঝরি বসানো নর্দমার ধারে প্লাস্টিকের বড়ো একটা জলের ড্রাম। তার ঢাকনার উপর একটা প্লাস্টিকের লাল হাতল ভাঙা মগ। হাত—পা ধোয়ার জল রাখা হয়। বিজলিবালার চোখ পড়ল জলচৌকিতে রাখা একটা তামার টাটে তার উপর রাখা কোষাকুষি আর পুজোর ঘণ্টা। বুঝলেন এ বাড়িতে দেবতার নিত্যপুজো হয়। মহিলা একটি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কৌতূহল ও বিস্ময় নিয়ে। পরনে সাদা শাড়ি নকশাদার সবুজ পাড়, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। গলায় সরু হার, হাতে দু—গাছা করে সোনার চুড়ি। মাথায় আধ ঘোমটা। গায়ের রং ফরসা। তিনি কিছু বলার আগেই বিজলি বললেন, ‘আমার নাম বিজলিবালা ভটচায। কলকাতায় আমার বাড়ি। জ্যোতির্ময় নামে এই বাড়ির কোনো ছেলে আছে?’
‘ছিল। বাড়ির সঙ্গে এখন তার সম্পর্ক নেই। হঠাৎ ওর খোঁজ নিতে এলেন কেন?’
‘বলছি। আপনি ওর কে হন?’
‘সৎমা।’
বিজলি হুঁশিয়ার হয়ে গেলেন। ভুটুকে বিস্কুট দিল পদ্ম, সে ফেলে দিল। থার্মোফ্লাসকে দুধ এনেছে, দু—চুমুক দিয়ে খেল না। মহিলা ভুটুকে দেখতে দেখতে বললেন, ‘আপনার নাতি?’
