পশ্চিমের বাড়ির জন্য বিকেল থেকে বিজলির ঘরে আলো কম হয়ে যায়। বারান্দা থেকে তিনি ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। আবার শুনতে পেলেন আর্তনাদটা ‘হাসি, হাসিরে।’ লোকটিকে অমন কঠোরভাবে বলা ঠিক হয়নি। মুখ দিয়ে তখন অনেক কথা রাগের মাথায় বেরিয়েছে। সেগুলো তো আগে থাকতে তৈরি করে রাখা ছিল না। মানুষ কাকে বলে—সেটা তো তখনই মনের মধ্যে কীভাবে যেন এসে গেল। ভালোবাসলে ধর্ম থাকে না, এই বোধটা যে তাঁর মধ্যে ছিল, এটাই তিনি জানতেন না। জ্যোতির কাছ থেকে হাসির উপর অত্যাচার আর তা সহ্য করে যাওয়ার কথা শোনার পর তাঁর মনে হয়েছিল হাসি নিছকই মুসলমান মেয়ে নয়, হিন্দুর বউও নয়, ও একটা মানুষ।
বিজলির মনে হল, পুজোআচ্চচা তো মানুষ হয়ে ওঠার জন্যই করা। পুজো না করেও তো হাসি আর জ্যোতি যথেষ্ট মানুষ হতে পেরেছে। মৃত্যুর পরোয়ানা পাবার পরও মেয়েটা পাঁচালি পড়ে গেল। কী বুকের পাটা!
বিজলি মুখ ফিরিয়ে, মলিন আলোয় শ্রীধরের সিংহাসন, নারায়ণ শিলা, গাছকৌটো, গায়ত্রীদেবী, লক্ষ্মীর ছবি, জগন্নাথদেব, গণেশমূর্তির উপর দিয়ে চোখ বোলালেন। স্পষ্টভাবে কিছুই দেখতে পেলেন না, সবই কেমন আবছা, ধ্বক করে উঠল বুকের মধ্যে। প্রদীপের আলোয় কাঁপা একটা শ্যামলা মুখ পাঁচালি পড়ছে—উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠল তাঁর চোখে। চোখ বন্ধ করে তিনি মাথাটা ঝাঁকিয়ে দৃশ্যটা বন্ধ করে দিলেন। ও মুসলমানের মেয়ে।
বকবক করতে করতে পদ্ম উঠছে সিঁড়ি দিয়ে। বিজলি তৈরি হলেন ওকে বকুনি দেওয়ার জন্য।
‘দ্যাখো তো কী কাণ্ড, পার্কে নিয়ে গেছিলুম। একটা মেয়ে আলুকাবলি খাচ্ছিল, আদিখ্যেতা করে এতোটা ভুটুর মুখের সামনে ধরল আর ছেলে অমনি গপ করে মুখে ঢুকিয়ে নিল। তারপরই ঝাল লেগে চিল চিৎকার। শেষে আইসক্রিম কিনে মুখে দিতে ঠান্ডা হল।’
বিজলি শান্ত গলায় বললেন, ‘পদ্ম এরকম ঝামেলা অনেক হবে। আমাদের দু—জনের পক্ষে সব সামলানো সম্ভব হবে না। ঘরে পুরুষমানুষ নেই, কখন কী বিপদ—আপদ ঘটিয়ে ফেলে তার ঠিক নেই। ওকে বরং ওর বাবার দেশের বাড়িতে ঠাকুরদা ঠাকুমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়াই ভালো।’
শুনেই মুখভার হয়ে গেল পদ্মর। বলল, ‘কী আর এমন ঝামেলা করে ভুটু, ও আমি সামলে নোব।’
‘নারে সেরকম সামলাবার কথা হচ্ছে না।’ বিজলি আরও শান্ত স্বরে বললেন, ‘বড়সড় নানারকম বিপদ হতে পারে। ওর মা—র মতো যদি কিছু হয়, আমরা তো দু—জন মুখ্যু মেয়েমানুষ, তখন কী করব? তা ছাড়া পরের ছেলে এটা মনে রাখিস। চল ওকে নিয়ে জ্যোতিদের বাড়িতে গিয়ে রেখে আসি।’
‘তুমি বাড়ি চেনো?’
‘জ্যোতি তো বলল গ্রামের নাম মল্লিকপুর। বর্ধমান থেকে কাটোয়া যাবার রাস্তায় পড়বে। তোর মেসোমশায়ের সঙ্গে মোটরে একবার গেছিলুম কাটোয়া, ওনার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে। বর্ধমান থেকে বাস যায়। বাসে উঠে কনডাকটরকে বললে মল্লিকপুরে ঠিক নামিয়ে দেবে। তারপর জ্যোতির জ্যাঠার নাম করব। কেউ—না—কেউ ঠিক বাড়ি দেখিয়ে দেবে। অত ঘাবড়াছিস কেন, বেরিয়ে তো পড়ি। বর্ধমান আর কতটুকু পথ—রোজ কত লোক কলকাতায় এসে চাকরি করে বর্ধমান ফিরে যায়। যদি খুঁজে না পাই তা হলে ফিরে আসব।’
‘তার থেকে বরং দাদাকে জিজ্ঞেস করে সব জেনে নিয়ে যাওয়াই ভালো, রোববার তো আসবে।’
‘জ্যোতি আমাদের যেতে বলবে না। বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক নেই ওর। তাতে আমাদের কী। ছেলেকে কোথাও রাখার ব্যবস্থা যদি না করে তা হলে সেটা আমাদেরই করতে হবে।’
দু—দিন পর ওরা সকাল ন—টা নাগাদ বেরিয়ে পড়ল হাওড়া স্টেশনের উদ্দেশে। পদ্মর কোলে ভুটু, বিজলির কাঁধে একটা কাপড়ের ঝোলা। তাতে ভুটুর জন্য দুধ বিস্কুট কমলালেবু সোয়েটার প্যান্ট। বাসে ওরা স্টেশনে পৌঁছে একজনকে জিজ্ঞাসা করে টিকিটঘরে পৌঁছোল। অন্তত কুড়িজনের লাইন জানলার সামনে। বিজলি লাইনে দাঁড়ালেন। মিনিট দশেকের মধ্যেই টিকিট পেয়ে আবার একজনকে জিজ্ঞাসা করতেই লোকটি দু—নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘বর্ধমান লোকাল, এখুনি ছাড়বে দৌড়ে যান।’
তারা দু—জনে আধা দৌড়—আধা—হাঁটা অবস্থায় গার্ডের কামরা পার হয়েই প্রথম যে দরজাটি পেল তাতে উঠে পড়ল। বসার জন্য জায়গা নেই, ভিড় আছে কিন্তু কষ্টকর নয়। পদ্ম হাঁ করে শ্বাস নিতে নিতে বলল, ‘মাসিমা হার্ট ফেল হয়ে যাবে আমার।’
‘ফেল হয় হোক ট্রেনটা তো ধরা গেল।’ বিজলির কথা শেষ হওয়া মাত্র ট্রেন ছেড়ে দিল। ‘দেখলি তো, না দৌড়োলে পরের ট্রেনের জন্য এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হত। এক কাজ কর, দেখছিস বসার সিটগুলোর মাঝখানে লোক দাঁড়িয়ে। তুই ভুটুকে নিয়ে ঢুকে যা, সিট খালি হলেই বসে পড়বি।’
পদ্ম তাই করল। সিটে বসা একটি অল্পবয়সি বউ ভুটুর দিকে দু—হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমার কাছে দিন।’ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পদ্ম। কিছুক্ষণ পর সে বউটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘কত দূর যাবেন?’
‘শ্যাওড়াফুলি।’
নামটা পদ্মর শোনা কিন্তু কতদূরে জায়গাটা, কতক্ষণ যেতে লাগবে জানে না। আধঘণ্টা পরে পাশে বসা পুরুষটি উঠে দাঁড়াতেই বউটি বলল, ‘এবার নামব আপনি বসুন।’
ভুটুকে কোলে বসিয়ে পদ্ম তাকাল বিজলির দিকে। বিজলি তাকে হাত নেড়ে বসে থাকতে বললেন। ঘণ্টাখানেক পর বিজলিও বসার জায়গা পেয়ে গেলেন। বর্ধমান স্টেশনে নেমে কাটোয়ার বাসের জন্য আবার একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন বিজলি।
