কাউন্টারে ফোন, একটিও খদ্দের নেই শুধু এক তরুণ মাথা নীচু করে একটা ইংরেজি সিনেমা ম্যাগাজিন পড়ছে বা ছবি দেখছে।
‘হ্যাঁ বাবা ফোন করা যাবে এখান থেকে?’
তরুণটি মুখ তুলে এক বৃদ্ধাকে দেখে বলল, ‘যাবে।’
‘কত লাগবে?’
‘দু—টাকা।’
‘একটা কাজ করে দেবে বাবা, এটা একটু পড়ে দেবে।’ বিজলি ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা বিলটা বার করে তরুণটির হাতে দিল। বিলটিতে চোখ বুলিয়ে সে বলল, ‘পুরোনো ফার্নিচার কেনা—বেচা আর ভাড়া দেওয়ার দোকান। প্রোপাইটার অর্থাৎ মালিকের নাম মেহমুদ আলম, দোকানটা রফি আহমেদ কিদোয়াই স্ট্রিটে। আর রয়েছে ফোন নম্বর।’ বৃদ্ধাকে সাহায্য করতে পেরে তরুণটিকে উৎসাহী লাগছে। ‘আপনি কি এই নম্বরে ফোন করবেন?’
‘হ্যাঁ বাবা, তুমি নম্বর টিপে ফোন লাগিয়ে দেবে? আমার এসব ঠিক আসে না।’
তরুণ বোতাম টিপে টিপে অপেক্ষা করল। ওধার থেকে সাড়া পেতেই বলল, ‘এটা কি আলম ফার্নিচারস?… একটু ধরুন একজন আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।’
তরুণ রিসিভারটি এগিয়ে দিল বিজলির দিকে। বিজলির কানে লাগিয়ে ভূমিকা না করে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, ‘হাসি আপনার কেউ হয়?’
ওধারে কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর পালটা প্রশ্ন হল, ‘আপনি কে বলছেন?’
‘আগে আমার কথার উত্তর দিন তারপর আপনাকে বলব আমি কে।’
‘হাসি আমার মেয়ে।’ একটা অনিচ্ছুক উত্তর এল দোখনো টানে।
‘আমি বিজলিবালা ভটচায। হাসি আর তার স্বামী আমার ভাড়াটে। ওদের একটি চোদ্দো মাসের ছেলে আছে, ভুটু। হাসি একটা চিঠি দিয়ে বোধহয় ওর মাকে তার ছেলে হওয়ার খবর জানিয়েছিল। হয়তো সেই চিঠি আপনি দেখেছেন। তার একটা জবাব আপনি দিয়েছিলেন একটা বিলের ওপর লিখে। সেই চিঠিটা আজ আমার হাতে পড়তেই এই ফোন করছি।’ বিজলি দ্রুত বলে গেলেন। কণ্ঠ ঈষৎ উত্তেজিত। এবার স্বর তীব্র করে ধমকে উঠলেন, ‘হিন্দু ছেলে বিয়ে করেছে বলে আপনি ওকে মরতে বলেছেন, এ কীরকম বাবা আপনি, ছি ছি ছি। আপনি ছেলেটিকে জানেন? আর অন্য ধর্মের হলেই সে অচ্ছুৎ হয়ে যাবে?’ বিজলির হাতের রিসিভার থরথর করছে।
‘এ ভাবে আপনি কথা বলছন কেন? আমার মেয়েকে যাই লিখি না কেন আপনি তাই নিয়ে বলার কে?’ ও পক্ষেও স্বর চড়ে উঠছে। তরুণটি অবাক হয়ে বিজলির দিকে তাকিয়ে।
‘আমি কে সেটা তো গোড়াতেই বলেছি। আমি আপনার কাছে বিধর্মী, আপনি থাকুন আপনার ধর্ম নিয়ে, আমি তা নিয়ে মাথা ঘামাতে যাব না। কিন্তু একটা মেয়ে যখন একটা ছেলেকে ভালোবাসে তখন সেটা অন্য ব্যাপার হয়ে যায় আলমবাবু, ধর্মকে তখন পিছু হটতে হয়। ওদের পরিচয় তখন হয় শুধুই মানুষ। আর সেটা স্বীকার করাকে বলে মনুষ্যত্ব। আপনি মারধর করেও তো হাসিকে থামাতে পারেননি কারণ ও তখন মানুষ হয়ে গেছে।’
‘আপনি সত্যিই বাড়াবাড়ি করছেন। কোথায় থাকেন আপনি?’ ধমকের সুর ওপ্রান্ত থেকে শোনা গেল।
‘ঠিকানা নিয়ে কী কববেন, এসে মারবেন? লিখুন ঠিকানা সাতচল্লিশের বি বিজয় দত্ত স্ট্রিট, কলকাতা পাঁচ। নর্থ ক্যালকাটার একটা গলি।’
‘আপনাকে মারতে যাব এমন ছোটোলোক ভাবলেন আমায়!’ আহত স্বরে বলল মেহমুদ আলম।
‘মেয়ের চিঠি পড়লে অন্ধ হয়ে যাবে যে বাবা লেখে, তার মতো নিষ্ঠুর লোক সম্পর্কে আর কী ভাবব! তবে আপনি জেনে আশ্বস্ত হবেন আপনাকে আর অন্ধ হতে হবে না?’
‘তার মানে?’ আলমের সন্ধিগ্ধ স্বর।
‘মানে হাসি মারা গেছে, শুনে সুখী হলেন তো?’
‘কী বললেন, কী বললেন, কী বললেন? হাসির কী হয়েছে।’ আলমের গলায় আর্তনাদ, অবিশ্বাস, আতঙ্ক।
‘চার মাস হল ক্যানসারে মারা গেছে। তার ছেলেটি একা, দেখার কেউ নেই।’ কথাটা বলার পর বিজলির মনে হল ওপ্রান্তে ডুকরে ওঠার মতো শব্দে আলম, ‘হাসি হাসিরে’ বলে উঠল। বিজলি রিসিভার রেখে দিয়ে ব্যাগ থেকে টাকা বার করে দিলেন।
‘খুব আচ্ছাসে দিলেন তো লোকটাকে।’ তরুণটি তারিফ ভরা সুরে বলল, ‘ঠিক বলেছেন ভালোবাসলে ধর্মটর্ম হটে যায়।’
বিজলি শুনে শুকনো হাসলেন। তাঁর দেহের যাবতীয় আবেগ নিঃশেষিত হয়ে তাঁকে অবসন্ন করে দিয়েছে। ধীর মেদুর পায়ে তিনি বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে বার বার শুনে যেতে লাগলেন, ‘হাসি, হাসিরে।’ এইবার অনুশোচনার আগুনে পুড়বে লোকটা, নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে। বিজলি কষ্ট বোধ করলেন হাসির বাবার জন্য। নিশ্চয় বাড়ি গিয়ে খবরটা দেবে, হাসির মা কী করবে? আর ভাবতে চাইলেন না বিজলি।
সদর দরজায় তালা দেওয়াই রয়েছে। পদ্ম কি এখনও ফেরেনি? তিনি অলকার কাছে খোঁজ নিতে গেলেন।
অলকা বলল, ‘আপনি যাবার একটু পরেই পদ্ম এসে হাজির, দেখেই ভুটু বায়না জুড়ল। পদ্ম ওকে নিয়ে ঘুরে আসতে গেছে। কেমন দেখলেন ননদকে?’
‘ভালো নয়। ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছে।’ ক্লান্ত স্বর বিজলির। অবসাদে মুখ বসে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় পায়ের ব্যথাটা আবার অনুভব করলেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সামনের বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাধুর বারান্দা শূন্য। এই সময় অন্নপূর্ণা ওকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে বারান্দায় রেখে যেত। অন্নপূর্ণা কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। রাধুর মৃত্যু নিয়ে পুলিশ টানাহ্যাঁচড়া করেনি। পাড়ার দু—চার জন বলেছিল শঙ্কর চাটুজ্যে টাকা খাইয়ে পুলিশের মুখ বন্ধ করেছে।
বিকেলের এই সময়টায় সূর্যের দাপট যখন ক্ষমতা হারাতে শুরু করে, তখন জয় দত্ত স্ট্রিটের বাড়িগুলোর শরীরে জরা ফুটে ওঠে। বিজলি লক্ষ করেছেন, এই সময়ই পাড়াটা নিজের মনের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়, হইচই হট্টগোল ঝিমিয়ে পড়ে কিছুক্ষণের জন্য। তার পরই বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয় টিভি—র চিৎকার, শোনা যায় শাঁখের আওয়াজ। কয়েক বছর আগে শোনা যেত কিশোরী কণ্ঠে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান সাধা। এখন গান না জানলেও মেয়েদের বিয়েতে অসুবিধে হয় না।
