ধড়মড়িয়ে তিনি খাট থেকে নেমে বারান্দার দিকে ‘হেই ভাগ ভাগ’ বলতে বলতে এগোলেন। তাঁকে দেখেই হুলো পালাল। বিজলি ভুটুকে নিয়ে কলঘরে গিয়ে দুটো হাত সাবান দিয়ে ধুইয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন পদ্মর জন্য। উড়ে পাড়া বস্তিতে কার গায়ে হলুদ, রান্নাবান্না শেষ করেই পদ্ম সেখানে গেছে। ভুটুকে বিছানায় চেপে ধরে চাপড়াতে লাগলেন ঘুম পাড়াবার জন্য, তখন সেলাই মেশিনের উপর থাকা কথামৃতর উপর তাঁর চোখ পড়ল। বইটা কবে যেন নীচের ঘর থেকে এনেছিলেন আজও খুলে দেখা হয়নি। পদ্ম বলেছিল ‘ধম্মের বই পড়ে মেয়েরাই’, তাই ওর ধারণায় কথামৃত হাসিই পড়ার জন্য এনেছে বা কিনেছে।
ভুটু ঘুমিয়ে পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই। কথামৃত হাতে নিয়ে বিজলি পাতা উলটে যেতে লাগলেন। তখন একটা সাদা কাগজ বই থেকে পড়ে গেল। সেটা তুলে তিনি এপিঠ—ওপিঠ দেখলেন। দোকানের সাদা বিল, তাতে লেখা কয়েক লাইনের চিঠি। হাতের লেখা বাংলায়, পরিচ্ছন্ন স্পষ্ট। চিঠির নীচে লেখা ‘আব্বা’। শব্দটা দেখেই তিনি সচকিত হয়ে উঠলেন। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে পড়ে ফেললেন। হাসিকে লেখা তার বাবার চিঠি। পড়ে বুঝলেন হাসি মাকে চিঠি দিয়ে তার ছেলে হওয়ার খবর দেয়। সেই চিঠির জবাব দিচ্ছে তার বাবা।
‘হাসি, তোর সাহস দেখে তাজ্জব হয়েছি। আম্মিকে তুই যে লুকিয়ে চিঠি লিখিস তা আমি জানতুম না। আমাদের গ্রামে সবাই জানে তুই মরে গেছিস। তুই মরেই থাক। তোর মরার খবর দিয়ে চিঠি পেলে আমি খুশি হব। যে—মেয়ে পরিবারের মুখ পুড়িয়ে হিন্দুর ছেলে পেটে ধরে তার হাতের লেখার উপর চোখ রাখলে খোদাতালা আমায় অন্ধ করে দেবেন। আর কখনো চিঠি লিখবি না। ইতি আব্বা।’
খুব দ্রুত লেখা শিক্ষিত হাতের এই চিঠি পড়ে বিজলির মাথার মধ্যে ধিকিধিকি জ্বলতে শুরু করল ক্রোধ। ‘হিন্দুর ছেলে পেটে ধরে কথাগুলো এমন ঘৃণার সঙ্গে লেখা যে তাঁর কাছে অসহ্য মনে হচ্ছে। জ্যোতির মতো ছেলেকে জামাই পেয়ে লোকটার বর্তে যাওয়ার কথা। জাত ধর্মটাই বড়ো হল, ছেলে কেমন সেটা বিবেচনা করবে না? বাপ হয়ে কী করে লিখতে পারল ‘তোর মরার খবর দিয়ে চিঠি পেলে খুশি হব’! মেয়ের ইচ্ছে অনিচ্ছেটা দেখবে না?
চিঠিটা পুরোনো, হয়তো জানে না মেয়ে সত্যি সত্যিই মারা গেছে। লোকটাকে জানানো দরকার, আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে, আপনাকে আর অন্ধ হতে হবে না। চিঠির মাথায় মোটা অক্ষরে ইংরেজিতে ছাপা ‘আলম ফার্নিচারস’ শব্দ দুটির শেষেরটি বিজলি পড়তে পারলেন না, তার নীচে ‘হায়ার অ্যান্ড পারচেজ’ বানান করে পড়লেন অবশ্য অর্থটা বোধগম্য হল না। অলকাকে দিয়ে মানেটা জেনে নিতে পারেন বটে কিন্তু তা হলে তো চিঠিটা ওর হাতে দিতে হয়! হাতে পেয়ে অলকা চিঠিতে চোখ বুলোবেই আর হাসির পরিচয় জানতে কিছুই বাকি থাকবে না।
দরকার নেই অলকার। ছাপা ঠিকানা রয়েছে বিলে এবং ফোন নম্বরও। রাস্তার নামটা বড়ো বড়ো। পড়ে উঠতে পারলেন না। বিজলির মনে হল ফোনে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন হাসির বাবার হদিশ করা যায় কিনা। কিন্তু ফোন করবেন কোথা থেকে! পাড়ার কোনো বাড়ি থেকে করা যাবে না। টেলিফোনের কাছে কেউ—ন—কেউ দাঁড়িয়ে থাকবেই কথা শোনার জন্য।
এবার তাঁর মনে পড়ল বড়ো রাস্তার দোকানগুলোতে টেলিফোন আছে। দেখেছেন পয়সা দিয়ে বাইরের লোককে ফোন করতে। তিনি ঠিক করলেন দোকান থেকেই ফোন করবেন, তবে কাছেপিঠের কোনো দোকান থেকে নয়।
ভুটু ঘুমোচ্ছে, পদ্ম এখনও ফেরেনি। সে না ফিরলে ভুটুকে একা রেখে কী করে বেরোবেন! পরের বাড়ির গায়েহলুদ, তোর সেখানে থাকার কী দরকার? বিজলি বিরক্ত হতে হতে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। মাথার মধ্যে পিঁপড়ের মতো নড়ে বেড়াচ্ছে চিঠির অক্ষরগুলো। এক্ষুনি লোকটার খোঁজ নিতে হবে, দু—কথা শুনিয়ে দিতে হবে। বারান্দা থেকে ঘরে এসে চিঠিটা পড়লেন। পাট পাট ভাঁজ করলেন বিলটা, এমনভাবে চিঠির অংশটা যাতে পড়া না যায়, শুধু দোকানের নাম ঠিকানা ফোন নম্বরটা দেখা যাচ্ছে। সেটা ভাঁজ করে তাঁর টাকার ব্যাগে রাখলেন। এবার ভুটুকে নাড়া দিয়ে জাগিয়ে তুললেন। গাঢ় ঘুম হঠাৎ ভাঙায় ভুটু অবাক চোখে প্রথমে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট উলটে ফুঁপিয়ে উঠল।
ভুটুকে কোলে তুলে বিজলি একতলায় নেমে এসে রাস্তায় বেরোলেন। সদর দরজায় তালা দিয়ে গেলেন পাশের বাড়িতে অলকার কাছে।
‘ভুটুকে একটু রাখো তো, খুব দরকারে আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে ননদের বাড়ি, খবর দিয়ে গেল এখন—তখন অবস্থা, দু—বছর ধরে আলসারে ভুগছে।’
অলকা বলল, ‘পদ্ম বাড়িতে নেই?’
‘সে থাকলে তো ঝক্কি চুকেই যেত। চার ঘণ্টা আগে বেরিয়েছে উড়ে পাড়ায় কার গায়েহলুদ দিতে, এখনও ফেরার নাম নেই। সদরের চাবি আমার কাছেই রইল, পদ্ম এলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে।’
অলকার জিম্মায় ভুটুকে রেখে বিজলি ধীরে ধীরে হেঁটে বড়ো রাস্তায় এলেন। কয়েক মাস পর এতটা পথ হাঁটলেন। পায়ে খচখচ লাগছে, ব্যথা শুরু হয়েছে। তাঁর মনে হল আরো কিছু কিছুদিন পর রাস্তায় বেরোলে ভালো করতেন। ডাইনে—বাঁয়ে তাকিয়ে বাঁ দিকে এগোলেন। ফুটপাথে একটা রেলিং—ঘেরা শান বাঁধানো চাতাল, তার মাঝে সিঁদুর মাখা বাসি মালা দেওয়া পাথর। বিজলি দু—হাত মাথায় কপালে ঠেকিয়ে এগিয়ে চললেন, শিবরাত্রিতে মাইক লাগিয়ে ধুমধাম হয় এখানে। পর পর দোকান। তীক্ষ্ন চোখে টেলিফোন খুঁজতে লাগলেন। সামনের কাউন্টারের উপরই থাকে অথবা পিছনে মালিকের টেবিলে। এক ছিট—কাপড়ের দোকানে দেখতে পেলেন টেলিফোন। কিন্তু চার—পাঁচ জন খদ্দের রয়েছে। তারপরে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির দোকানে ফোন নেই তারপরে রঙের দোকানে, আছে।
