তাঁর মনে হল ব্যাপারটা জানাজানি না হওয়াই ভালো। কেউ না জানলে পুরুতমশাইকে দিয়ে শোধন করিয়ে নিলেই হবে, তার আগে জ্যোতিকে এই বাড়ি থেকে বিদায় করতে হবে, তার সঙ্গে ভুটুকেও।
‘এই চিঠিটা কীসের? হাসিনা বানো কেন?’
‘এই নামেই হাসি বি এসসি পাশ করেছে, এই নামেই ও চাকরি পেয়েছে বিয়ের আগেই, এই নামেই ওর প্রভিডেন্ট ফান্ড হয়েছে। এই চিঠিটা প্রভিডেন্ট ফান্ড অফিসের।’
‘পদবিটা যদি বদলে নিত অফিসে ঢোকার সময় তা হলে ঠিকানায় লেখা এই নামটা আমি জানতেই পারতুম না।’ বিজলির কণ্ঠে আপশোস। ‘তাহলে আমাকে এই নরকযন্ত্রণার মধ্যে পড়ে দগ্ধাতে হত না। এখন আমাকে দেখে সবাই আঙুল দেখিয়ে হাসবে আর বলবে, ‘ওই যে ভটচায বাড়ির বিজলিবালা অন্য জাতের মেয়েকে দিয়ে পুজো করিয়ে ধম্মের বড়াই কর।’ আমি জানতুম না বললেও কেউ কি বিশ্বাস করবে?’
জ্যোতি মুখ নীচু করে শুনছিল ও ভাবছিল। এখন বলল, ‘এক্ষেত্রে আমার চলে যাওয়াই উচিত। আপনি দেখুন ঘটনাটা যেন জানাজানি না হয়, আপনি—আমি ছাড়া আর কেউ তো ব্যাপারটা জানে না। কালই আমি স্কুলে খোঁজ নেব ওখানে কোনো পরিবারে পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকা যায় কিনা। মনে হয় পেয়ে যাব। ভুটুরও একটা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। যত দিন না সেটা হচ্ছে তত দিন পর্যন্ত ওকে আপনি যদি রাখেন তা হলে আমি খুব কৃতজ্ঞ থাকব।’
‘তুমি তো ‘জানাজানি না হয় যেন’ বলে চলে যাবে কিন্তু যে আঁচড় আমার বুকে পড়ল তার ঘা তো আর শুকোবে না।’ বিজলি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার এত দিনের ঠাকুর তাকে কত যত্নে আগলে রেখেছি, আমার এত দিনের পুজো এত দিনের ভক্তি সব সব তোমরা মিথ্যে করে দিলে নস্যাৎ করে দিলে।’ বিজলি ফুঁপিয়ে উঠলেন।
জ্যোতি ম্লান চোখে তাকাল। ‘আমাকে ক্ষমা করবেন।’
নিঃশব্দে জ্যোতি সরে গেল বিজলির সামনে থেকে। দু—চোখের কোণে জমা জল মুছে তিনি খাটে পড়ে থাকা ভাল্লুকটা মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলতে গিয়ে থমকে আস্ত নামিয়ে রাখলেন, মনে মনে বললেন, ‘ওর আর দোষ কী।’
সাত
যেন জানাজানি না হয়, জ্যোতির এই কথাটা বিজলির মাথার মধ্যে গেঁথে গেল। তিনি তাঁর সব রকমের ভাবনার সঙ্গী, যার সঙ্গে মতামত বিনিময় করেন অহরহ, সেই পদ্মের কাছেও ব্যাপারটা গোপন রাখলেন। তিনি বেশ ভালো মতোই জানেন ওর পেটে কথা থাকে না। কখন যে কোন বাড়ির কাজের মেয়েকে গল্প করতে করতে বেফাঁস বলে ফেলবে তা সে নিজেও জানে না।
জ্যোতি কয়েক দিন আগে এসে জানায়, সে হাবড়াতেই থাকার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। স্কুলের কাছে তার এক প্রাইভেট ছাত্রের বাড়িতে আলাদা ঘরে থাকা ও খাওয়া বাবদ দু—হাজার টাকা দেবে, ছাত্রটিকে পড়াবার জন্য সে টাকা নেবে না। সে আরও জানাল, এই বাড়ির ঘর আপাতত ছাড়বে না, মাসে মাসে যেমন ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে তেমনই দিয়ে যাবে। ভুটুকে বিজলি আপাতত রাখতে রাজি হয়েছেন, সেজন্য জ্যোতি প্রভূত কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলে, ‘মাসিমা বিয়ে করতে বলবেন না, হাসিকে সারা জীবনে ভুলতে পারব না, ভোলা উচিত নয়, সম্ভবও নয়। ওর স্মৃতি মুছে দেবার মতো যোগ্যতা এই পৃথিবীতে কোনো মেয়ের আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। আপনিও বোধহয় কখনো হাসিকে ভুলতে পারবেন না।’
নীচের ঘর সারা দিনই প্রায় তালা দেওয়া থাকে, চাবি থাকে পদ্মর কাছে। কল্পনাকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর এক বাড়িতে তাকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছে পদ্ম। প্রতিদিন নীচের ঘর সে পরিষ্কার করে মাঝে মাঝে দুপুরে ভুটুকে নিয়ে শোয়। রাতে তারা শোয় বিজলির ঘরে মেঝেয়। একদিন বিজলিই বললেন, ‘আমার খাটটা তো অনেক বড়ো, ওকে আমার পাশে শুইয়ে দে।’
‘না মাসিমা বড্ড নড়াচনা করে, পড়েটড়ে যাবে। থাক না নীচে।’
বিজলি বুঝলেন পেত্নির লম্বা হাতের ভয়ে সে একা শুতে চায় না। তা ছাড়া স্নেহ—মমতা দেবার ও আদর করার জন্য ওর বাৎসল্যের খিদেটা দেখেছেন ক্রমশ বাড়ছে। সন্তান নেই, হবার কোনো সম্ভাবনাও নেই এই স্বামী পরিত্যক্তার। একটা শিশুকে অবলম্বন করে মা হবার সাধটা যদি মেটাতে চায় তো মেটাক না। বিজলি তাই ভুটুকে পালন করার দায়িত্ব পদ্মর হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন। জ্যোতি রবিবার এসেছিল, বলেছে, তার ইচ্ছা নয় মুদির বাড়িতে রেখে ছেলেকে মানুষ করার। ‘শিক্ষিত কালচার্ড নিঃসন্তান এমন পরিবার নিশ্চয়ই আছে, শুধু খুঁজে বার করে নিতে হবে।’
বিজলি বলেছিলেন, ‘রক্তের সম্পর্ক থাকলে তবেই ও ঠিক ঠিক যত্ন পাবে। তোমার কি হাসির আত্মীয়দের মধ্যে খোঁজ নাও, কেউ যদি ওকে রাখে।’
জ্যোতি মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘কেউ ওকে রাখবে না।’
বিজলির মনে হয়েছিল রাখবে কি রাখবে না সেটা যাচাই না করেই জ্যোতি বলে দিল কত সহজে! যদি হাসির বাপের বাড়ির ঠিকানাটা তিনি পেতেন তা হলে নিজে গিয়ে ওর বাপ—মাকে ধরে পড়তেন মরা মেয়ের ছেলেটাকে আশ্রয় দিতে। বলতেন, হলই বা হিন্দু বাপ, ওর মা তো আপনার মেয়ে, মুসলমান রক্ত তো ওর শরীরে আছে। ওকে আপনাদের ধর্মের বিধানমতো মুসলমান করে নিন, তা হলে ও একটা নিজের পরিবার পাবে, যত্ন পাবে শাসন পাবে, তা না পেলে ছেলেমেয়েরা মানুষ হয় না। কেন আপনাদের নাতিকে একটা হিন্দু বিধবার হাতে ছেড়ে দেবেন?
দুপুরে খাটে শুয়ে বিজলি রেডিয়ো চালিয়ে সেতার শুনছিলেন। রাগ—রাগিণীর কিছুই বোঝেন না, তবে বাজনাটার আওয়াজ তাঁর ভালো লাগে, একধরনের আমেজ তৈরি করে দেয়। সেতার শুনতে শুনতে তিনি দেখতে পেলেন বারান্দায় ভুটু দু—হাতে হুলো বেড়ালটাকে চটকাচ্ছে, হুলোটা চিত হয়ে শরীরটা ওলটাচ্ছে পালটাচ্ছে আর থাবা দিয়ে ভুটুকে মারছে। দু—জনে খেলছে। বিজলি শুনেছেন বেড়াল থেকেই ডিপথেরিয়া হয়। মারাত্মক রোগ, তাতে মারাও যায়।
