বিজলি বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে হাসির চলনবলন হাবভাব কথার উচ্চচারণ পরতে পরতে বিছিয়ে গেলেন মাথার মধ্যে। কোথাও এমন কিছু দেখতে পেলেন না যা দিয়ে তাকে অলকা বা রাধুর থেকে আলাদা করা যায়। তিনি ভাবতে চেষ্টা করলেন পিয়োন ভুল করেছে। হাসিনা বানো যে হাসিই হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু মাঝে ৪৭বি জয় দত্ত স্ট্রিট দেখেই তো পিয়োন লেটার বক্সে ফেলে গেছে, ভুল তো করেনি! বাড়ির নম্বর আর রাস্তার নামটা এমনই যে অন্যমনস্ক হয়ে বা ভুল করে টাইপ করে ফেলেছে বলা যাবে না।
মুখ ঘুরিয়ে বিজলি শ্রীধরের সিংহাসন, তার দু—পাশের দেবদেবীর ছবি ও মূর্তির দিকে তাকালেন। দেখতে পেলেন প্রদীপ জ্বলছে, গরদের থান—পরা হাসি পাঁচালি পড়ছে, প্রদীপের আলো হাসির শ্যামবর্ণ মুখের উপর কাঁপছে, হাসির স্পষ্ট উচ্চচারণ তিনি শুনতে পেলেন, ‘গুরুবারে সন্ধ্যাকালে মিলি নারীগণে। করিবে লক্ষ্মীর ব্রত হরষিত মনে।’ হিন্দুর মেয়ে ছাড়া পাঁচালির সুর অন্য ধর্মের মেয়ে এভাবে গলা থেকে বার করে আনতে পারবে না। বিজলি নিজেকে আশ্বস্ত করতে স্থির সিদ্ধান্তে এলেন হাসিনা বানো আর হাসি চক্রবর্তী কিছুতেই একই লোক নয়। তবু জ্যোতিকে একবার জিজ্ঞাসা করা দরকার।
‘পদ্ম, জ্যোতি এলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবি আর তখন তুই ভুটুকে নিয়ে নীচে থাকবি।’
রাত প্রায় দশটা, তখন জ্যোতি ফিরল। পদ্ম সদর দরজা খুলেই বলল, ‘মাসিমা আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।’
জ্যোতি নিজের ঘরে না গিয়ে সোজা দোতলায় উঠে এল। তাকে দেখেই বিজলি চিঠি ভরা খামটি বাড়িয়ে ধরলেন। বিস্মিত জ্যোতি খামটার উপরের লেখা ঠিকানাটা পড়ে কয়েক লাইনের চিঠিটা এক ঝলকে দেখে নিয়ে বিজলির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলুন?’
‘এই হাসিনা বানো কে?’
‘আমার বউ।’
‘হাসি?’
‘হ্যাঁ।’
গম্ভীর হয়ে চুপ করে রইলেন বিজলি। একটা যন্ত্রণা তাঁর চোয়ালের পেশি মুচড়ে চলেছে। জ্যোতি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে। প্রায় এক মিনিট ধরে দু—জনের মধ্যে নীরবতা দেওয়া—নেওয়া চলার পর বিজলি বললেন, ‘আমাকে ঠকালে কেন?’
‘নিরুপায় হয়ে। মাসিমা, ঘর ভাড়া নিতে গেছি, বউ মুসলমানের মেয়ে শুনে ভাড়া দেয়নি। ভাড়া নিয়ে একমাস থেকেছি, বাড়িওয়ালা পাড়ার লোক দিয়ে তুলে দিয়েছে। শেষে হাসিনাকে হাসি করে ঘর পাই। কিন্তু সেই গড়িয়া থেকে কাজের জায়গায় যেতে আমাদের দু—জনেরই খুব অসুবিধে হচ্ছিল। ভুটু তখন সবে জন্মেছে। আমরা এদিকেই ঘর খুঁজছিলুম, আপনার এখানে পেয়ে চলে এলুম। আমি কিন্তু আপনাকে ঠকাইনি। আপনি আমার বা হাসির ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি। আমরাও সেধে তা বলার দরকার মনে করিনি, এতে ঠকানো হল কোথায়?’
বিজলি চুপ করে রইলেন। জ্যোতি বলে চলল, ‘কোনো হিন্দু মেয়ের সঙ্গে কি হাসির তফাত করতে পারবেন শুধু তার নামটা ছাড়া? এই খামের উপরের লেখাটা পড়ার আগে পর্যন্তও আপনি ওকে হিন্দু বলে বিশ্বাস করে এসেছেন। তাকে দিয়ে পাঁচালিও পড়িয়েছেন, সে আপনার ঠাকুর দেবতাও ছুঁয়েছে। চক্রবর্তীর বউ বলেই ওকে দিয়ে এসব করিয়েছেন, ধরেই নিয়েছিলেন হাসি ব্রাহ্মণ। এখন সেই ধারণাটাই ধরে থাকুন না যে হাসি মুসলমান নয় সে হিন্দু চক্রবর্তী।’
‘জানার পর তা সম্ভব নয়। তোমরা অদ্ভুত লোক তো।’
বিজলির স্বর তীব্র ও কর্কশ হয়ে উঠল, জ্যোতির কথাগুলো তাঁর এত বছরের লালিত ধর্মবোধকে কোণঠাসা করে দিচ্ছে এটা তিনি সহ্য করতে পারছেন না। নিজেকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য মরিয়া হলেন। ‘কী চমৎকার ভাবে তোমরা নিজেদের লুকিয়ে রেখেছিলে। আমি তো জীবনেও জানতে পারতুম না হাসি মুসলমান, জানলে কি ওকে ঠাকুর ছুঁতে দিতুম? আর হাসিই বা কোন আক্কেলে পাঁচালি পড়ল? ওর ধম্মেও তো এসব করা বারণ। এটা পাপ। তুমিও ধম্মো মানোনা, মানলে মুসলমান মেয়ে বিয়ে করতে না।’
বিজলির গলা থেকে ঝরে পড়ছে তিক্ততা। তিনি আবার শুরু করলন, ‘এবার হয়তো কোনদিন শুনব তুমি তোলাবাজদের পাণ্ডা কি নোট জাল করো সেটা জানতে পারব বাড়িতে পুলিশ এলে। একটা কথা বলো, তুমি হাসিকে ফুসলিয়ে বার করে আনোনি তো? ঠিকমতো বিয়েটা করেছ তো?’
‘করেছি। স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে হয়েছে। আর ফুসলিয়ে আনার প্রশ্নই ওঠে না, ও সাবালিকা।’
‘হাসির এতবড়ো অসুখ হল ওর বাপের বাড়ির কাউকে তো আসতে দেখলুম না। এমনকী মারা যাবার পরও কেউ এল না, কী ব্যাপার?’
‘হাসির বাপের বাড়ি আপনার থেকেও বেশি গোঁড়া। সেই বাড়ির মেয়ে হিন্দুকে বিয়ে করলে কী ঘটতে পারে অনুমান করুন। হাত—পা বেঁধে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল সাতদিন, জলটুকুও খেতে দেয়নি।’
বিজলির মনে পড়ল তাঁদের গ্রামের দত্তবাড়ির মেয়ে কলকাতার পি জি হাসপাতালে নার্সের চাকরি করত। বিয়ে করেছিল খ্রিস্টান হয়ে এক খ্রিস্টান ডাক্তারকে। মেয়েটি আর গ্রামে ফিরতে পারেনি, দত্তদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল। বাহান্ন বছর আগের ঘটনা। তাঁকেও তো প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। পাড়ার লোকেরা যখন শুনবে হাসি মুসলমানের মেয়ে ঠাকুরের সিংহাসনে শুধু হাতই দেয়নি বিজলির অনুরোধে লক্ষ্মীর পাঁচালিও পড়েছে তখন কোথায় মুখ লুকোবেন! ঠাকুরদেবতা ফেলে দেবেন? ভুটু নারায়ণ শিলা মুখে পুরেছিল সেটাও কি গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন? শিলাটা শাশুড়ির কাছ থেকে পাওয়া। তিনি পেয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ির কাছ থেকে। বংশের অতীতের সঙ্গে যোগসূত্র বলতে এখন ওই শিলাটি। একশো বছরের পুরোনো নারায়ণ শিলার গল্প তিনি পাড়ার বহু বউ—ঝিয়ের কাছে করেছেন।
