পদ্ম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। চুপ করে জানলার দিকে তাকিয়ে রইল।
.
দু—মাস পর বিজলির পায়ের প্লাস্টার খোলা হল। পদ্ম নিয়মিত রোজ মালিশ করে দেয় পায়ে, তিনি লাঠিতে ভর দিয়ে বারান্দায় হাঁটেন, সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেন না এখনও। দেবতাদের নিত্য দিনের পরিচর্যা শুরু করেছেন। ভুটু এখন একতলা—দোতলা করে ইচ্ছেমতো। তিনতলার ছাদেও উঠে যায়। বিজলি যখন সকালে পুজোয় বসেন তখন ভুটুর উপদ্রবের ভয়েই ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেন। কল্পনা ঘরের এবং রান্নার কাজ করে, যথারীতি দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ে, সন্ধ্যায় বাড়ি চলে যায়। ভুটুকে দেখাশোনার দায়িত্ব পদ্ম নিজের হাতে তুলে নেওয়ায় কল্পনার এখন কাজ কমে গেছে। জ্যোতি এখন রাত করে ফিরছে, শিক্ষক রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়ে নেওয়ায়।
বিজলি মাঝে মাঝে দুপুরে বারান্দায় এসে টুলে বসেন। রাস্তা দিয়ে লোক চলাচল দেখেন, সামনের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। রাধাকিঙ্করীকে মনে পড়ে, অল্পবয়সি পুলিশ অফিসারকে বলা কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করেন। মাথা নীচু করে অফিসারটি তাঁর কথাগুলো লিখতে লিখতে ভ্রু তুলে তাকানো অবশেষে লেখা বন্ধ করে শুধু শুনে যাওয়া। সেদিন তিনি কী বলেছিলেন? রাধু ঠিক করেছে, এখনও কি তিনি তাই মনে করেন? মনে করেন কি রাধু নরকে যাবে। ভাবতে ভাবতে মাথা ভার হয়ে এলে ঘরে ফিরে শুয়ে পড়েন।
এক হাত দেওয়ালে অন্য হাতে পদ্মর কাঁধে রেখে সিঁড়ি দিয়ে একদিন নীচে নামলেন। শোয়ার ঘরের দরজা খোলা দেখে ঢুকলেন। হাসিরা ভাড়া নেবার পর এ ঘরে এক বার কি দু—বার ঢুকেছেন তারপর আজ। কল্পনা মেঝেয় ঘুমোচ্ছে। চারপাশ চোখ বোলালেন। দেওয়ালে ছবি বা ক্যালেন্ডার নেই। খাট, টেবল। তার উপর রুপোলি ফ্রেমে বাঁধানো হাসির মুখের ছবি, স্টিলের বইয়ের র্যাক। টেবিলের পাশে দুটো মোড়া, নীচু টুলের উপর স্তূপ হয়ে খবরের কাগজ। দরজা জানলায় গেরুয়া পরদা ধুলোয় মলিন। কাগজ ফেলার ঝুড়িতে জমে আছে পাঁউরুটি ও বিস্কুটের মোড়ক। আলনায় জ্যোতির ব্যবহৃত ময়লা ধুতি ও পাঞ্জাবি। স্টিলের আলমারির মাথায় দুটো সুটকেস।
একঝলক দেখে নিয়ে বিজলি বুঝলেন খাওয়া ও শোয়া ছাড়া জ্যোতির কাছে এই ঘরের আর কোনো প্রয়োজন নেই। টেবিলের কাগজপত্র উলটেপালটে দেখে বইয়ের র্যাকে চোখ দিলেন। সবই প্রায় ইংরিজি বই, দু—তিনটি বাংলা বই তাঁর চোখে পড়ল। বইগুলো আঙুল দিয়ে টেনে একে একে বার করে দেখলেন পাতা খুলে। তার মধ্যে থেকে একটা বই পদ্মর হাতে দিয়ে বললেন, ‘ধর এটা। পড়তে হবে।’
‘কী বই গো মাসিমা?’
‘রামকৃষ্ণদেবের নাম শুনেছিস তো, দক্ষিণেশ্বরে আমার সঙ্গে গেছিলিস মনে নেই? তিনি যেখানে যা বলেছেন তাঁর এক ভক্ত সব টুকে রেখেছেন, সেইসব কথা নিয়ে বই। এর নাম কথামৃত, তোকে পড়ে শোনাব। কিন্তু বইটা এখানে কে পড়ে, তোর কাকে মনে হয়?’
চোখ কুঁচকে দু—লহমা ভেবে নিয়ে পদ্ম বলল, ‘হাসিদি।’
‘কেন তোর হাসির কথাই মনে হল?’
‘দ্যাখো বাপু ধম্মোকম্মো মতি মেয়েদেরই হয়। দাদা কেমন যেন কাঠখোট্টা ধম্মো মানে না, শ্মশানেই তো দেখলাম। ছেরাদ্দটা তুমি না করালে তো হাসিদির মুক্তিই হত না। পাঁচালি পড়ে হাসিদি যেভাবে পেন্নাম করল দাদা কি সেভাবে পারবে? ওই দিয়েই তো বুঝলুম।’
‘এই ঘরের ছিরি দেখে এবার কী বুঝছিস।’
‘কল্পনাকে আমিই এখানে কাজে লাগিয়েছি আমিই ঝেঁটিয়ে বিদেয় করব। এত টাকা মাইনের এমন সুখের কাজ কোথাও পাবে নাকি? দ্যাখো মাসিমা কেমন ভোঁসভোঁস করে মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে, দুটো লোক যে ঘরে ঢুকেছে সেদিকে খেয়াল নেই, যদি আমরা চোর হতুম?’
ঘর থেকে বেরিয়ে বিজলি বললেন, ‘তোরও খেয়াল নেই, কী বললি। মড়া কখনো ভোঁসভোঁস করে ঘুমোয়? চোর আসবে সদর দরজা খোলা থাকলে। দেখে সে দরজা দিয়েছে কিনা।’
বিজলি সিঁড়ি দিয়ে ওঠা শুরু করলেন, সাত—আটটা ধাপ উঠেছেন পদ্মর উত্তেজিত স্বর শুনলেন, ‘মাসিমা চিঠির বাসকে একটা খাম। চাবিটা দাও।’
বিজলি অবাক হলেন। চিঠি কার! কে লিখল? দাদর চিঠি আসে বিজয়ার পর। তা ছাড়া চিঠি দেওয়র আর তো কেউ নেই। জ্যোতি বা হাসির কোনো চিঠিপত্র আজ পর্যন্ত আসেনি। এলে জানতে পারতেন, লেটার বক্সের তালার চাবি তাঁর কাছে। আঁচল থেকে চাবির তোড়াটা খুলে পদ্মর হাতে দিয়ে কৌতূহল ভরে দাঁড়িয়ে রইলেন।
একটা ধূসর রঙের ঘাম হাতে নিয়ে এসে পদ্ম বিজলির হাতে দিল। অভ্যাস না থাকলেও ইংরেজি পড়তে এবং কিছুটা বুঝতে পারেন বিজলি। খামের উপর প্রাপকের ইংরেজিতে টাইপ করা নামটা দেখেই তাঁর চোখ গাঢ় হয়ে উঠল। পদ্মকে বললেন, ‘পিয়োন ভুল করে দিয়ে গেছে রে। এ নামে এখানে কেউ থাকে না।’
‘কী নাম মাসিমা?’ স্বাভাবিক কৌতূহল পদ্মর গলায়।
‘হাসিনা বানো। তবে ঠিকানাটা এই বাড়িরই।’ বলেই তিনি তাকিয়ে থাকলেন পদ্মর চোখের দিকে।
‘ভুল নাম অথচ বাড়ির নম্বর ঠিক, মাসিমা খুলে দ্যাখো তো?’
বিজলি খামটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বাকি সিঁড়ি ভেঙে ঘরে এসে খাটে বসলেন। খামের একটা দিক ছিঁড়ে বার করলেন টাপে করা একটা ইংরেজি চিঠি। ইংরেজি পড়ার চেষ্টা করে তিনি কিছু বুঝতে পারলেন না। কিন্তু চিঠিটা এই বাড়ির ঠিকানায় কেন? হাসিনা বানোই বা কে? এ তো মুসলমানি নাম! তার মাথার মধ্যে নাগরদোলার মতো হাসিনা শব্দটা ওঠানামা করতে করতে হঠাৎই মনে হল হাসিনাটা হাসি নয়তো! নাগরদোলা থেকে গিয়ে তাঁর মাথা ঘুরতে লাগল। অসম্ভব, এ হতে পারে না। হাসি কিছুতেই মুসলমান নয়।
