‘করলে কী হয়?’
‘কিছুই হয় না, তবে লোকটার কথা মনে পড়ে যায়। তোমার মনে পড়ে না বাবাকে?’
‘কই না তো! বাবা আমাদের সঙ্গে খুব কমই কথা বলত, আমরাও কাছে ঘেঁষতুম না।’
‘এক—একজন লোক ওইরকম হয়, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশতে পারে না; আমার বাবাও ওইরকম।’
অনন্তের খাওয়া হয়ে গেছে। প্লেটে পড়ে আছে শুধু স্যালাড। খুঁটে খুঁটে সে বিট আর গাজরের কুচি মুখে দিতে লাগল পেঁয়াজ বাদ দিয়ে। গৌরী দু—আঙুল তুলে ছেলেটাকে বলল ‘চা।’
অন্য টেবলগুলো ভরে আছে। তাদের টেবলেও মুখোমুখি অফিসফেরত দু—জন দু—কাপ চা নিয়ে বসে। তারা বৃষ্টি, রাস্তায় জমা জল নিয়ে কথা বলছে আর মাঝে মাঝে নিরাসক্তচোখে, গৌরীর দিকে তাকাচ্ছে।
‘আমার ছাদটা ফাটা, শোবার ঘর বোধ হয় ভেসে গেছে।’
লোকটিকে উদবিগ্ন মনে হলেও ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে না বাড়ি যাবার জন্য। মনে হয় রোজই এই সময় এখানে এসে চা খায়।
অনন্ত গরম চায়ে চুমুক দিয়েই চমকে কাপ সরিয়ে নিল।
‘জিব পুড়ল তো?’
‘এত গরম বুঝতে পারিনি।’
সে প্লেটে চা ঢেলে ফুঁ আ দিয়ে জুড়িয়ে নিআয়ে খেল। গৌরী তাই দেখে শুধু হাসল।
দরজার কাছের টেবলে দোকানের মালিক বসে। গৌরী ফ্রকের গলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ব্রেসিয়ারের ভিতর থেকে ছোটো একটা চামড়ার ব্যাগ বার করল।
‘তিন টাকা চল্লিশ।’
অনন্ত কৌতূহল সামলাতে না পেরে আড়চোখে দেখল ব্যাগটার মধ্যে ভাঁজ করা কয়েকটা দু—টাকার নোট। পাঁচ টাকার নোটের রংও দেখতে পেল। দুটো দু—টাকার নোট গৌরী টেবলে রাখল। মৌরি রাখা প্লেটে মালিক একটা আধুলি আর দশ পয়সা রাখল। ছেলেটা পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। গৌরী আধুলিটার সঙ্গে খানিকটা মৌরিও তুলে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। ইতস্তত করে অনন্তও দু—আঙুলের চিমটেয় মৌরি তুলল।
‘দশ পয়সাটা নিলে না যে, বকশিশ?’
‘হ্যাঁ।’
‘সেলাম করল না তো!’
‘দশ পয়সায় আবার সেলাম দেবে কী!’
রাস্তায় জল, ফুটপাথেও পায়ের গোছ ডুবে যাচ্ছে। জলের মধ্যে পা টেনে টেনে সাবধানে গর্ত খুঁজে খুঁজে লোকেরা হাঁটছে। বৃষ্টি—ধোওয়া গাছের পাতাগুলো ছাড়া আর সব কিছুই ম্লান। ঘোষ কেবিনের নিওন আলোয় গৌরীর গায়ের চামড়া ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। ভিজে চুল মাথায় বসা। ফ্রকটা ন্যাতার মতো শরীরে ঝুলছে।
‘কোনদিকে যাবে, বাড়ি?’
‘হ্যাঁ। তুমিও?’
‘চলো তোমার সঙ্গে খানিকটা যাই।’
অনন্ত একবার ভাবল, চটি হাতে তুলে নেবে কি না। সাত মাস আগে চার টাকা দিয়ে ফুটপাথের দোকান থেকে কেনা। স্ট্র্যাপ ঢিলে হয়ে গেছে জল ঠেলে যেতে যেতে যদি খুলে যায়! গৌরীর পায়েও চটি কিন্তু হাতে তুলে নেয়নি। সে আর চটির কথা ভাবল না। ধুতিটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে গৌরীর পাশাপাশি হেঁটে চলল।
‘তোমার সঙ্গে বোধহয় কারোর ভাব নেই।’
অনন্ত বুঝতে পারল না গৌরী কী বলতে চায়। সে মাথা নেড়ে বলল, ‘না, আমি ছেলেদের সঙ্গে বড়ো একটা মিশি না।’
‘ছেলে নয় মেয়ে। কারোর সঙ্গে তোমার ভাব নেই?’
অপ্রতিভ হল অনন্ত। ভাব থাকাটা ভালো না মন্দ, উচিত কি অনুচিত, সে বুঝতে পারছে না।
‘নাহ, ওসব আমার নেই।’
‘কী নেই?’
গৌরী মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ওর চোখে হাসি। একটা বাচ্চচা ছেলে ছুটে আসছে জল ছিটিয়ে। তাদের সামনে যে—লোকটি যাচ্ছে সে ধমক দিয়ে উঠল। বোধহয় ছেলেটা শুনতে পেল না বা অগ্রাহ্য করল। গৌরী কাছে সরে এল। অনন্ত থমকে হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে ধরতে গিয়ে পারল না।
‘তুমি খুব ভালো ছেলে।’
‘কী করে বুঝলে!’
‘সে বুঝতে পারি। তুমি একদমই চ্যাংড়া নও!’
‘আমার ঘাড়ের উপর একটা সংসার। তাদের দেখতে হবে তো।’
ওরা কিছুক্ষণ কথা বলল না। যত এগোচ্ছে ফুটপাথের জল ক্রমশই কমে আসছে। ট্রাম বন্ধ। স্টপে এক—একটা বাস থামছে আর ঝাঁপিয়ে পড়ছে মানুষ। গাড়ি আর পথচলতি লোকে রাস্তাটা বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে। দু—ধারে জল জমে থাকায় রাস্তার মাঝখান দিয়ে রিকশা আর লোক চলছে। বাস, ট্যাক্সি বা বাড়ির মোটরের গতি মন্থর স্রোতের মতো মানুষ হেঁটে চলেছে শিয়ালদার দিকে।
দু—জনে ফুটপাথের কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রাস্তাটার জটপাকানো অবস্থা দেখছিল।
‘তোমাকে একটা কথা বলব, কাউকে এ—পর্যন্ত কিন্তু বলিনি।’
‘কী কথা?’
গৌরী কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে বলল, ‘রমেনদার সঙ্গে আমি চলে যাব।…দমদমায় ঘর দেখে এসেছে।’
‘সে কী!’
‘কেন, মেয়েরা কি ভালোবেসে ঘর ছাড়ে না?’
‘তোমার বয়স কত?’
‘বয়স দিয়ে কী এসে যায়?’
‘তোমার বাবা রেগে যাবে।’
‘যাবে তো যাবে, আমার তাতে বয়েই গেল।’
‘তোমার বিয়ে ঠিক করেছে।’
‘কে করতে বলেছে? হাওড়ায় কোন এক গ্রামের ছেলে চাষা না কুলি কে জানে… রমেনদাকে বাবা কেন যে দেখতে পারে না জানি না।’
‘যদি পুলিশে খবর দেয়?’
‘দিক না, খুঁজে পেলে তো! তুমি কিন্তু কাউকে বোলো না।’
‘না।’
অনন্ত নিজের সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল। গৌরী তাকে বিশ্বাস করেছে। নিশ্চয় কিছু একটা তার মধ্যে পেয়েছে বলেই। এইরকম আস্থা তার উপর এখন পর্যন্ত কেউ তো রাখেনি। কিন্তু রমেন লোকটাকে তার ভালো লাগেনি। গৌরীর উচিত হবে না ওর সঙ্গে চলে যাওয়া। তার মনে হল কথাটা বোধহয় এখন বলা ঠিক হবে না। সাহস করে ঘর ছাড়ছে, অমরও তাই করেছে।
মা কালকেও অমরের কথা বলেছে : ‘ছেলেটা কোথায় গেল একটু খোঁজ কর।’ সে বলেছিল, ‘কচি—খোকা নয়, ঠিকই আছে কোথাও, এখানের থেকে হয়তো ভালোই আছে।’
