‘ওসব নিয়মটিয়ম রাখ তো। ভুটুর গলায় চাবি ঝোলালে লোকে দেখে হাসবে। ও তো এক মিনিটেই গলা থেকে খুলে ফেলবে নয়তো মুখে পুরে দেবে। কাণ্ডজ্ঞান মেনে তো নিয়ম মানবি! তা ছাড়া ওর বাবা আছে তাকে জিজ্ঞাসা না করে এসব পরানো উচিত নয়, জ্যোতির তো আপত্তি থাকতে পারে। যদি বলে কোনো শাস্ত্রে লেখা আছে যে গলায় চাবি ঝোলাতে হবে? তুই দেখাতে পারবি?’
বিজলির কথার ঝাঁঝে পদ্ম মিইয়ে গেল। চাবিটা সে বালিশের তলায় রেখে দিয়ে বলল, ‘দাদা কাঠের চুল্লিতে পোড়ালো না, ইলেকট্রিকে দিল। একটা বামুন এল, হাতের সরায় শিশিতে ঘি ফুল আর কী কীসব ছিল, মুখে আগুন দেবার প্যাকাটিও এনেছিল। দাদা বামুনকে বলল, ওসব কিছু দরকার নেই। বামুন তো ঝগড়া শুরু করল, বলল এসব না করলে শ্মশানের অকল্যাণ হবে, অপদেবতা ভর করবে। আমাদের বাবলা তখন দাদাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে কী সব বলল তারপর তিরিশটা টাকা এনে বামুনকে দিয়ে ঝামেলা থামাল।’
বিজলি উদবিগ্ন স্বরে জানতে চাইলেন, ‘মুখে আগুনটা দিয়েছে?’
‘না দেয়নি। দাদা কী রকম যেন।’ পদ্মর স্বরে অনুযোগ : ‘বড্ড একগুঁয়ে। কত করে বললুম কিছুতেই রাজি হল না, ছেলেরা চারশো টাকা চাইল অমনি দিয়ে দিল, ওখানেই কোথায় গিয়ে তখুনি ওরা মদ গিলে এল।’
‘তুই নীচের ঘরে আমার এই পিলসুজ আর পিদিমটা নিয়ে গিয়ে জ্বালিয়ে রেখে আয়। জ্যোতি আপত্তি টাপত্তি করলে বলবি এটা মাসিমার বাড়ি, এ বাড়িতে মাসিমার নিয়ম মেনে চলতে হবে, বাড়ির একটা ধর্ম আছে, সেটা রক্ষা করতে হবে। নাস্তিকপনা যদি দেখাতে হয় সেটা বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখাও গে। পারবি বলতে?’
অনিশ্চিত স্বরে পদ্ম বলল, ‘হুঁ।’
প্রদীপে তেল ঢেলে তাতে সলতে দিয়ে পদ্ম পিলসুজটা হাতে নিয়ে নীচে নেমে গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ‘কিছু বলতে হয়নি। ঘর অন্ধকার করে শুয়ে রেকর্ডারে খুব আস্তে গান শুনছিল। আমি আলো জ্বাললুম, দেখি চোখ মুছল। বলল, জানলার ওই ধারটায় জ্বালিয়ে রাখো। তোমার হাসিদি ওইখানে মোড়া পেতে বসে গল্প করত, ওটা ওর খুব পছন্দের জায়গা ছিল। জানো মাসিমা আমার মনে হল বউকে খুব ভালোবাসত তবে বাইরে সেটা দেখাত না, খুব দুঃখু পেয়েছে।’
বিজলি চুপ করে রইলেন।
অলকার কথাটা বিজলির মাথায় ঘুরছিল, মা—বাবার কাছে ছেলেকে পাঠিয়ে দিতে পারে জ্যোতি! পদ্মকে দিয়ে চার দিন পর তিনি রাত্রে জ্যোতিকে ডাকিয়ে আনলেন।
‘ভুটু কি এইভাবে থাকবে? একটা কিছু তো ব্যবস্থা করতে হয়।’ পায়ের দিকে দাঁড়ানো জ্যোতিকে লক্ষ করে বললেন। ভুটু তখন খাটে বিজলির পাশে ঘুমোচ্ছে। পদ্ম তাঁর মাথার দিকে খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে।
অসহায় দেখাল জ্যোতিকে। ‘হ্যাঁ ব্যবস্থা কিছু তো করতে হবে। কিন্তু কী করব ভেবে উঠতে পারছি না। আমার এক কলিগ বললেন, অশোকনগরে তার চেনা এক নিঃসন্তান ফ্যামিলি আছে। তাদের কাছে যদি রাখতে রাজি হই তা হলে তিনি কথা বলতে পারেন। ফ্যামিলিটির মুদির দোকান আছে লেখাপড়া তেমন করেনি। মাসে মাসে কয়েকশো টাকা দিলেই হবে।’
‘ওইরকম ফ্যামিলিতে তোমার ছেলে মানুষ হবে ভেবেছ?’ বিজলির স্বরে বিরক্তি ও আপত্তি গোপন রইল না। জ্যোতিকে দেখে তাঁর মনে হল এটা যেন জ্যোতিরও মনের কথা।
‘আমি তো আর বিশেষ কোনো উপায় দেখতে পাচ্ছি না। ওকে তো আপনারাই যেমন রাখছেন তেমনি রাখতে পারেন।’
‘আমার বয়স হয়েছে আজ আছি কাল নেই। এখন কাজ চালাবার মতো নয় রাখছি। পরে কী হবে?’
এইসময় পদ্ম হঠাৎ বলে বসল, ‘দাদা তো আবার বিয়ে করতে পারেন।’
‘তুই থাম’ বিজলি দাবড়ানি দিলেন। ‘সব ব্যাপারে তোর নাক গলানো চাই। আর একটাও কথা বলবি না।’
পদ্মর কথায় হেসে ফেলেছে জ্যোতি। ‘মাসিমা ওকে বকবেন না। এরকম ক্ষেত্রে সবাই যা ভাবে সেটাই পদ্ম বলে ফেলেছে। আমি আর আমার বোন যখন স্কুলে পড়ি তখন আমার মা মারা যান জলে ডুবে। ছ—মাসের মধ্যে জ্যাঠামশাই কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী তার ভাই বিপ্রদাসের বিয়ে দেন তাঁর দূর সম্পর্কের শালির সঙ্গে। যুক্তিটা ছিল এই একই, ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা। তারপর আমার চার ভাইবোন হয় কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতাটা খুব ভালো হয়নি। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেই আমি বাড়ি ছাড়া হই, বোনের বিয়ে হয় জমিজমা আছে পাশের গ্রামের এক অশিক্ষিত পূজারি ব্রাহ্মণের সঙ্গে। এখন তার দুটি ছেলেমেয়ে।’
‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
‘বর্ধমান থেকে কাটোয়া যাবার রাস্তায় কৈচরের আগে মল্লিকপুর নামে একটা গ্রাম। আপনি কখনো কি ওদিকে গেছেন?’
‘না যাইনি। বিষয় সম্পত্তি আছে?’
‘আছে। ধানজমি, পুকুর, বর্ধমান শহরে একটা বাড়ি, চালের আড়ৎ আরও ছোটোখাটো কী সব ব্যবসা।’
‘অবস্থা তো বেশ ভালোই।’ মন্তব্যটি করে বিজলি বললেন, ‘সব মেয়েই যে ডাইনি হবে, সতীনের ছেলেকে আদর—যত্ন করবে না, তা তো নয়, লেখাপড়া জানা শিক্ষিত শহরের মেয়েরা অন্যরকম হয়, তুমি পদ্মর কথাটা ভেবে দেখতে পারো।’
জ্যোতি চলে যাবার পর পদ্ম বিজলির গলা নকল করে চেঁচিয়ে উঠল, ‘তুই থাম, আর একটা কথাও বলবি না। এখন সেই তো পদ্মর কথাটাই মুখ দিয়ে বেরোল। মুখ্যু হতে পারি কিন্তু যা বলি কড়ায়—গণ্ডায় ঠিক বলি।’
বিজলি আড় চোখে পদ্মর মুখটা দেখে নিয়ে বললেন, ‘বিছানা কর। ভুটুকে শুইয়ে দে আর জানলাটা কাল ভালো করে বন্ধ করিসনি কেন? মড়মড় মড়মড় করে রাতে শব্দ হচ্ছিল।’
