শেষের কথাটা বিজলির কানে আসতেই পদ্মকে তিনি বললেন, ‘জেনে আয় তো হাসির কাছে থেকে কী খেতে ভালোবাসে তবে নিরিমিষ্যি কিন্তু।’
‘ওম্মা চিবিয়ে খাবে কী, গলা দিয়ে কিছু কি নামে? নালিটালি সব তো ক্যানসারে খেয়ে ফেলেছে। এখন তো শুধু জলের মতো জিনিস চামচে করে খায়!’
বিজলি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এতবড়ো একটা ব্যাপার কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর ঘরের নীচে ঘটে গেল আর তিনি রয়েছেন অন্ধকারে। গুম হয়ে বসে তিনি নিজের ভাগ্যকে দুষলেন। কেন যে মরতে রথ টানতে গেলুম, কেন যে ওই রোগাপটকা রিকশাওয়ালাটার রিকশায় উঠলুম, কেন যে রাস্তা খুঁড়ে সারায় না। ভাবতে ভাবতে তাঁর মাথা গরম হয়ে উঠল। হাসির গলা দিয়ে কিছু নামে না তার মানে ও মরছে। বাচ্চচাটা এবার কী করবে, কোথায় কার কাছে থাকবে? ভেবে কূলকিনারা পেলেন না।
থালায় ভাত, চচ্চচড়ি, করলাভাতে, বাটিতে ডাল নিয়ে পদ্ম টুলটা টেনে এনে খাটের ধার ঘেঁষে রাখল। থালাটা তার উপর রেখে বলল ‘জানো মাসিমা বাজারে আজ ফুলকপি দেখলুম, অসময়ের কপি, ভাবলুম কিনে ফেলি তুমি তো ফুলকপি ভালোবাস। এইটুকু একটা বলল কিনা কুড়ি টাকা। কী দাম—’
তার কথা শেষ হবার আগেই ঝনঝন শব্দে কাঁসার থালা মেঝেয় ছিটকে পড়ে ছড়িয়ে গেল ভাত, ছিটকে পড়ল ডাল। বিজলি তারপর টুলটাও উলটে ফেলে দিলেন।
‘মেয়েটা খেতে পারছে না কষ্ট পাচ্ছে, আর আর আমি চিবিয়ে চিবিয়ে কপি গিলব? দূর কর সব আমার সামনে থেকে।’
বিজলির মুখের ভাব দেখে ফ্যাকাশে হয়ে গেল পদ্ম। ছিটকে যাওয়া ভাতের কয়েকটা ঠাকুরের সিংহসন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সিংহাসন ছোঁয়া তার বারণ, তা মনে না রেখে রাধাকৃষ্ণর পায়ের উপর থেকে পদ্ম কুড়িয়ে নিল ভাতগুলো। ঝাঁটা এনে জড়ো করল মেঝেয় ছড়ানো ভাত, ন্যাতা দিয়ে মুছল মেঝে, একটি কথাও এতক্ষণ সে বলেনি।
‘তুই খেয়ে নে।’ বিজলি গম্ভীর গলায় হুকুম করলেন। কোনো কথা না বলে পদ্ম ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মাথার নীচে দু—হাতের তালু রেখে শুয়ে রইলেন বিজলি। পদ্ম ঘরে ঢুকল বিকেলে।
‘ভাত খেয়েছিস?’
পদ্ম চুপ।
‘কীরে জবাব নেই কেন?’
‘না।’ বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ছয়
ভুটুকে বুকের কাছে আঁকড়ে বিজলি বিছানায় শুয়েই শুনলেন হরিবোল ধ্বনি। বিজলির টাকায় পাড়ার ছেলেরা খাট আনে ফুল আনে। পদ্ম চন্দন বেটে হাসির কপালে লবঙ্গ দিয়ে ছাপ দেয়। চওড়া করে সিঁথিতে সিঁদুর দেয়। বেনারসি নেই, রেশমের শাড়ি পরিয়ে দু—পায়ে আলতা দেয়। ফুল দিয়ে ঢেকে দেয় কেশবিহীন মাথাটা। কে একজন একটা গীতা হাসির বুকের উপর রেখে দিল।
জয় দত্ত স্ট্রিটের দু—ধারের বাড়ির দরজায় মানুষ, বারান্দা জানলা ছাদেও মানুষ। এত অল্পবয়সি এয়োতি স্মরণকালের মধ্যে এ পাড়ায় মারা যায়নি। অল্পবয়সি বউয়েরা হাসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম জানিয়ে কামনা করল তার মতো সিঁথির সিঁদুর বজায় রেখে যেন চিতায় উঠতে পারে।
ছটফট করছে ভুটু। তাকে দু—হাতে আঁকড়ে রয়েছেন বিজলি। অবশেষে বিজলির বাহু বন্ধন থেকে মুক্তি না পেয়ে সে কান্না জুড়ে দিল। পদ্ম, কল্পনা, সবাই নীচে। অসহায়ভাবে তিনি শিশুর কান্না শুনে যেতে লাগলেন। এই বাড়িতে চিৎকার করে কাঁদছে শুধু একজনই আর একজনেরই চোখ দিয়ে নীরবে দরদর করে জল নামছে। অলকা দরজায় এসে দাঁড়াল। বিজলি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘চলে গেছে?’
‘হ্যাঁ। ওকে আমার কাছে দিন।’ অলকা তুলে নিল ভুটুকে। ‘এর কী হবে এখন?’
‘শ্রীধরই জানেন, তিনিই দেখবেন।’
‘জ্যোতিবাবুর মা—বাবা আছেন তো?’
‘জানি না, ওদের সম্পর্কে কিছুই জানি না, জিজ্ঞেস করতে হবে।’
‘সেখানে ওকে পাঠিয়ে দিলেই তো হয়।’
‘তা তো হয়, জ্যোতিকে বলব। দুটো দিন থাক শোকটা কমুক তখন বলব।’
‘হাসির বাপের বাড়ির কেউ এসেছিল কি?’
‘জানি না। আমি তো ওপরে এই অবস্থায়। কে এল না এল জানার তো উপায় নেই আমার।’ ক্লান্ত স্বরে টেনে টেনে কথা বলে যাচ্ছেন বিজলি। ‘পদ্মকে দেখলে?’
‘পদ্ম তো এদের সঙ্গে শ্মশানে গেল।’
‘ও আবার গেল কেন, বাড়িতে এখন কত কাজ। শ্মশান থেকে ফিরলে ওদের জন্য নিমপাতা, মটরডাল, লোহা, ঘুঁটের আগুন সদর দরজায় রাখতে হবে, এসব তো হিন্দুদের সংস্কার, মানা উচিত। শ্মশানযাত্রীদের অন্তত দুটো মিষ্টি খাওয়াতে হবে, তুমি বউমা এগুলো একটু দ্যাখো।’ বিজলি বিব্রত স্বরে বললেন।
‘ঘুঁটে এখন কোথায় পাব, দেখি আমাদের কাজের মেয়েটাকে বলে।’ অলকা ভুটুকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
রাত দশটা নাগাদ পদ্ম ফিরল শ্মশান থেকে। তার একটু পরেই ঘুমন্ত ভুটুকে নিয়ে এসে অলকা বলল, ‘জেঠিমা ভুটু যদি রাত্রে আমার কাছে থাকে তা হলে আমার কোনো অসু!বেধ হবে না।’
‘তা জানি, তবে পদ্মর সঙ্গেই এর ভাব বেশি। রাতে পদ্মর সঙ্গেই শোয়। ও বরং এখানেই থাকুক।’
অলকার কাজের মেয়েটিকে দিয়ে বিজলি একশো টাকার রসগোল্লা আনিয়ে ছিলেন। পদ্ম সেগুলো বিলি করে উপরে এল, একটা কোরা কাপড়ের সরু ফালিতে বাঁধা চাবি হাতে নিয়ে।
‘এটা কী হবে?’ বিজলি বিস্মিত।
‘ভুটু গলায় পরবে। বাপ—মা মরলে ছেলেরা পরে।’ পদ্মর স্বরে বিশ্বাস ও ভক্তি।
‘রাখ ওসব।’ বিজলি ধমক দিলেন, ‘ওইটুকু ছেলের গলায় ওসব পরাতে হবে না।’
‘মাসিমা এটাই তো নিয়ম। বাবা মারা যেতে দেখেছি দাদারা সবাই পরেছিল।’
