বিকেলেই পদ্ম শোভাবাজারে গিয়ে রাম সীতা ও লক্ষ্মণের রঙিন একটা কাচে বাঁধানো এক ফুট লম্বা ছবি কিনে আনল।
‘তুই আবার রামভক্ত কবে থেকে হলি রে পদ্ম?’ বিজলি মুচকি হেসে বললেন।
হাসিটা দেখে পদ্ম চটে গেল। শুকনো স্বরে বলল, ‘তুমি এতগুলো দেবদেবীর ভক্ত হতে পারো আর আমি রামের ভক্ত হলেই দোষ! সবারই নিজের নিজের ভক্তি করার দেবতা আছে।’
‘তা তো আছে কিন্তু রাম লক্ষ্মণকে রাখবি কোথায়? আমার ওখানে তো জায়গা নেই।’
‘মাথার কাছে রাখব।’
‘সে তো রাতে আর দিনেরবেলায়?’
‘খাটের নীচে।’
বিজলি ধমকে উঠলেন, ‘খবরদার, দেবতাদের মাথার উপরে শুয়ে আমি পাপ কুড়োতে পারব না, তুই অন্য জায়গা দ্যাখ। খাটের নীচে রাখলে তো ভুটুর হাতে পড়বে তখন তো তিনটুকরো হয়ে যাবে তোর দেবতা।’
বিব্রত মুখে পদ্ম ঘরের এধার—ওধার তাকিয়ে বলল, ‘ওই সেলাইকলটার ওপর দিনের বেলায় রাখব,’ ঘরের কোণে তপতীর জন্য কিনে রাখা সেলাইকলটা সে দেখাল।
আলো নিভিয়ে রাতে ভুটুকে নিয়ে শুয়ে পদ্ম ছবিটা তার বালিশের নীচে রাখল। বিজলি শুনতে পেলেন পদ্ম বিড়বিড় করছে। একটু পরে পদ্ম উঠে তার পায়ের দিকের জানলাটা বন্ধ করল।
‘কী রে জানলা বন্ধ করলি যে?’
ভারী গলায় পদ্ম বলল, ‘মেঘ করেছে বৃষ্টির ছাট এসে সব ভিজিয়ে দেবে।’
পাঁচ দিন পর যখন ফিরে এল হাসি, তখন বিজলি আবার লোটাস নার্সিং হোমে গেছেন পায়ের যন্ত্রণা অব্যাহত থাকায় এক্সরে করাতে। পাড়ার ক্লাবের সেই ছেলেরাই তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে গেল এবং ফিরিয়ে দিয়ে গেল, সঙ্গে ছিল পদ্ম এবং অলকা। তার পায়ের অবস্থার কথা শুনে অলকাই লোটাসে গিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে নিয়ে যায়। লোটাস থেকে ফিরেই তিনি শুনলেন হাসি ফিরে এসেছে এবং ভালো আছে। তিনি নিজেই পদ্মকে বললেন, ‘ভুটু রাতে মায়ের কাছে থাকবে, এটা বলে আয় ওদের। অনেকদিন ছেলে ছাড়া হয়ে আছে এবার ছেলেকে কাছে নিক। আর বলিস সঙ্গে করে এক বিছানায় যেন না শোয়, বুকে অতবড়ো অপারেশন হয়েছে, ভুটু যা হাত—পা ছোড়ে লেগেটেগে যেতে পারে।’
রাতে অন্ধকার ঘরে মেঝেয় শোয়া পদ্ম একসময় বলল, ‘মাসিমা কীরকম খালি খালি লাগছে, তোমার?’
‘আমারও।’
একমাস পর হাসি অফিসে গেল। এক্সরে দেখার পর ডাক্তারের নির্দেশ ‘একমাস একদম নড়াচড়া নয়। অমন করে খাট থেকে নেমে বারান্দায় না গেলে জোড়াটা ঠিকমতো লেগে যেত। খুব বেশি ক্ষতি হয়নি, একটু বেঁকে থাকবে। বলেন তো আর একবার অপারেশন করে ঠিক করে দিতে পারি।’
বিজলি আঁতকে উঠে বলেছিলেন, ‘রক্ষে করো। অজ্ঞান হতে পারব না।’
বিজলি এরপর থেকে কঠিনভাবে ডাক্তারের নির্দেশ পালন করে যাচ্ছেন। ভুটুকে আর খাটে তোলেন না। পদ্ম বা কল্পনার কাছ থেকে হাসির এবং পাড়ার খবর নেন। অলকা প্রায়ই আসে। জ্যোতি ঘরভাড়া দিতে এলে তিনি জানিয়ে দেন, ‘আমার এখন টাকার জন্য ব্যস্ততা নেই। তোমাদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে, আরও হবে। ও টাকা তুমি রেখে দাও পরে সুবিধেমতো ভাড়া দিয়ো।’
হাসি মাসখানেক অফিস করার পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবার সে ডাক্তার দেখায়, এক্সরে করে। চার দিন পর বিজলি শুনলেন, ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে ফুসফুসে, গলায়। প্রথম বার অপারেশন করাতে বা ডাক্তার দেখাতে গড়িমসি করায় ক্যানসার বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে যায়। যদি কোনো ক্যানসার বিশেষজ্ঞ দিয়ে প্রথমেই দেখাত তা হলে এখনকার এই অবস্থা হত না। বিজলি বললেন, ‘কপাল! যার যা কপালে লেখা আছে, কে তা খণ্ডাতে পারে।’
রাত্রে ভুটুকে দোতলায় দিতে এসেছিল জ্যোতি। বিজলি তাকে চেপে ধরলেন, ‘সত্যি করে বলো তো হাসির অবস্থাটা কেমন, সেরে উঠবে কিনা?’
ইতস্তত করে জ্যোতি বলে, ‘ডাক্তার তো বললেন ছড়িয়ে গেছে। ছড়ানোটা বন্ধ করতে রেডিয়ো থেরাপি করাতে বললেন। আমার এক ছাত্রের দাদা এন আর এসে হাউসস্টাফ। তাকে বলেছি ওখানে রে দেবার ব্যবস্থা করে দিতে। পরশু থেকে শুরু হবে, দশ বার নেবে।’
‘তা হলেই হাসি ভালো হয়ে যাবে?’
‘না।’ দ্রুত উত্তর দিল জ্যোতি। বিজলির মনে হল উত্তরটা তৈরি হয়েই ছিল। শুধু অপেক্ষা করছিল মুখ থেকে বার করে দেবার সময়ের জন্য।
‘হাসি জানে?’
‘এখন বোধহয় জেনে গেছে। মাসিমা ভুটু রইল।’
জ্যোতি চলে যাবার পর বিজলি চিত হয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। রাতে ঘুম এল না।
হাসি রেডিয়ো থেরাপি করাতে যায় ট্যাক্সিতে, দুপুরে সঙ্গে যায় কল্পনা। বাড়িতে পদ্ম আগলে রাখে ভুটুকে। জ্যোতি যথারীতি সকালেই স্কুল বেরিয়ে যায়। দশটা রে নেবার পর ডাক্তার শেষ চেষ্টা হিসাবে কেমোথেরাপি করতে বলে। বিজলি বিছানায় বসে উদবিগ্ন হয়ে পদ্মকে বলেন, ‘হ্যাঁরে কেমোথেরাপিটা কী জিনিস? একবার জ্যোতিকে জিজ্ঞাসা করে আয় না। রেডিয়ো থেরাপির মতো কি?’
পদ্ম রাতে জ্যোতির কাছ থেকে শুনে এসে বলে, ‘এটা অন্য ভাবে করে। হাতে ছুঁচ ফুটিয়ে উঁচু থেকে নল দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে শরীরে ওষুধ ঢোকায়। চার—পাঁচ ঘণ্টা কি তার বেশি সময় লাগে। দশ দিন অন্তর নিতে হবে হাসিদিকে।’
‘তখন কি খুব কষ্ট হয়?’
‘তা তো জিজ্ঞেস করিনি! দাঁড়াও জিজ্ঞেস করে আসি।’
‘থাক আর জিজ্ঞেস করতে হবে না। বার বার অসুখের কথা তুললে ওর খারাপ লাগবে।’ কেমো নেবার এক মাসের মধ্যে হাসির মাথার চুল ঝরে পড়ল। তিন বার কেমো নেবার পর ডাক্তার জ্যোতিকে বলেছেন, আর খরচ করার দরকার নেই। ওনার যা খেতে ইচ্ছে হয় খেতে দিন।
