বিজলির ঘুম পাতলা। ‘ঢপ’ একটা শব্দ এবং ভুটুর চিৎকার ও কান্না শুনেই বিছানায় উঠে বসে তারস্বরে বলতে থাকেন, ‘কী হল, অ কল্পনা ভুটু বোধহয় পড়ে গেছে, দ্যাখ দ্যাখ ভুটু বোধহয় সিঁড়িতে পড়ে গেছে।’
ভুটু তখনও চিৎকার করে যাচ্ছে শুনে বিজলি বুঝে গেলেন কল্পনা নীচে নেই বা এখনও ঘুমোচ্ছে। পদ্মও বাড়িতে নেই, মাইনে বাবদ বিজলির দেওয়া মাসের বরাদ্দ তিনশো টাকাটা মাকে দিতে গেছে। বিজলি বিছানায় বসে আবার চিৎকার করলেন, ‘ওরে কল্পনা, ভুটু সিঁড়িতে পড়ে গেছে গিয়ে দ্যাখ।’
কান্নাটা এখন ফুঁপিয়ে হচ্ছে। বিজলি খাট থেকে দুটো পা ঝোলালেন। ধীরে ধীরে ভালো পা—টা মেঝেয় রেখে প্লাস্টার করা পা—টা এক বিঘৎ মেঝে থেকে তুলে রেখে খাটে দু—হাতের ভর রেখে লাফিয়ে লাফিয়ে খাটের শেষ প্রান্তপর্যন্ত গিয়ে বারান্দার দিকে মুখ করে চিৎকার করলেন, ‘ওরে হারামজাদি কল্পনা। মুখপুড়ি তুই কোথায়?’ কল্পনার সাড়াশব্দ না পেয়ে এবার তিনি ধীরে ধীরে একপায়ে ভর রেখে উবু হয়ে বসে দু—হাত মেঝেয় রাখলেন। তারপর হামা দিয়ে বারান্দায় এসে দুই রেলিঙের মাঝে মুখটা চেপে কর্কশ স্বরে চিৎকার করলেন। ‘ভুটু যে মরে গেল! হারামজাদির কালঘুম এখনও ভাঙল না? ওরে আবাগির বেটি উঠে দ্যাখ ছেলেটার কী হল, বাঁচল না মরল সেটা দ্যাখ।’
পাশের বাড়ির জানলা থেকে এক গৃহিণী বললেন, ‘কী হল দিদি অমন চ্যাঁচাচ্ছেন কেন?’
‘আর বোলো না। এই এক ঘুমকাতুরে মেয়ের হাতে বাচ্চচা রাখার দায়িত্ব দিয়ে গেছে বাবা, মা গেছে নার্সিংহোমে অপারেশন করাতে। টাকা নিয়ে কাজ করছিস, কাজটা অন্তত কর তা নয় পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে! ছেল এদিকে সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে চিক্কুর দিয়ে উঠেছে। মাথাটাথা ফেটেছে কিনা কে জানে। ওই শোনো ভুটু এখনও কাঁদছে।’
তাই শুনে পাশের বাড়ির গৃহিণী বিজলির সাহায্যে নেমে বাজখাঁই কণ্ঠে চেঁচালেন, ‘ওরে কল্পনা উঠে দ্যাখ কী কাণ্ড হয়েছে।’
ভুটুর কান্না বন্ধ। বিজলি বুঝে গেলেন কল্পনা ঘুম থেকে উঠেছে।
‘দিদি আপনার পা এখন কেমন? ওই পা নিয়ে আপনি বারান্দায় বেরিয়ে এসেছেন!’ পাশের বাড়ির গৃহিণী যুগপৎ তারিফ ও বিস্ময় তাঁর কণ্ঠে ধরে দিলেন।
‘কী করব ভাই ছেলেটাকে তো দেখতে হবে। একটা অসহায় বাচ্চচা, ভিখিরির ছেলে তো নয় ভদ্র বামুনের ঘরের ছেলে।’
‘শুনলাম ওর মায়ের ক্যানসার, সত্যি?’
‘হ্যাঁ সত্যি।’
‘ইসস কী যন্ত্রণা পাচ্ছে বলুন তো! এখন বাঁচলেই ভালো।’
ভুটুকে কোলে নিয়ে কল্পনা দোতলায় উঠে এল। বিজলি তখনও বারান্দায় হাঁটু গেড়ে। ভুটুর রক্তপাত হয়নি, রগের কাছটা ফুলে লাল হয়ে রয়েছে। বিজলিকে দেখে সে ফুঁপিয়ে উঠল। তিনি দু—হাত বাড়িয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলে। নানান সান্ত্বনা বাক্যে ভুটুকে তুষ্ট করতে করতে তিনি বুঝলেন এখন তিনি বিপন্ন। উঠে দাঁড়াতে হলে দু—পায়ের উপর চাপ দিয়ে দাঁড়াতে হবে।
‘ধর ওকে।’ ভুটুকে তুলে দিলেন কল্পনার হাতে। তারপর হামা দিয়ে ঘরে ফিরে এসে খাটের পায়া ধরে দাঁড়ালেন এক পা মেঝে থেকে তুলে।
‘মাসিমা তোমাকে ধরব?’ ভয়ে ভয়ে কল্পনা বলল।
‘ধরে ধরে নিয়ে চল।’ অসহায়ভাবে বললেন বিজলি। ভেবেছিলেন প্রচণ্ড বকুনি দেবেন, কিন্তু ওর সাহায্যটাও এখন দরকার। যা বলার পরে বলবেন।
‘কী করব আমার খালি ঘুম পায়। মা বলে এটা নাকি আমার ব্যামো।’ ভুটুকে খাটে বসিয়ে কল্পনা বিজলির একটা হাত গলায় জড়িয়ে তাঁকে খাটের ধারে নিয়ে যেতে যেতে বলল।
‘ঘরের দরজাটা বন্ধ করে যদি ঘুমোতিস ভুটু তা হলে বেরোতে পারত না।’ বিজলি শান্ত গলায় বললেন, কল্পনার অকপটতা তাঁকে স্পর্শ করেছে।
‘এবার থেকে তাই করব। নাও বোসো, আমি দুটো পা খাটে তুলে দিচ্ছি তুমি গড়িয়ে চিত হয়ে যাও।’
কল্পনার কথামতো বিজলি তাই করলেন। টের পেলেন পায়ের ভাঙা জায়গাটায় ছুঁচ ফোটার মতো একটা যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।
পরের দিন দুপুরে কথায় কথায় পদ্ম বলল, ‘রাধুমাসিমার শ্রাদ্ধ হবে না?’
‘কেন, তোর তাতে কী?’
‘আমার আবার কী হবে। মা—র কাছে শুনলুম আত্মঘাতী হলে নাকি ওরা ভূত হয়ে বেঁচে থাকে, ওদের মুক্তি হয় না, সত্যি?’
বিজলি মুশকিলে পড়লেন, আত্মঘাতী হলে শ্রাদ্ধ করা যায় কি না সেটা ঠিক জানেন না। তাঁর জীবনে আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতদের মধ্যে কেউ আত্মহত্যা করেনি, তবে অপঘাতে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তাদের শ্রাদ্ধও হয়েছে। যতদূর শুনেছেন আত্মহত্যা করলে শ্রাদ্ধ নয় প্রায়শ্চিত্ত করাতে হয়। অবশ্য তাতে আত্মার মুক্তি ঘটে কিনা সে সম্পর্কে তাঁর সন্দেহ আছে।
‘রাধুমাসি ভূত হবে বলছিস?’ বিজলি গম্ভীর স্বরে বললেন।
‘আমি নয় মা বলল।’
‘মেয়েমানুষ ভূত হয় না পেত্নি হয়, এটা তোর মা জানে না?’
‘ভূতেরা তো ঘাড় মটকায়।’
‘পেত্নিরাও মটকায়। বেঁচে থাকতে যারা শত্রুতা করেছে, কষ্ট দিয়েছে মারা গিয়ে তাদের ঘাড় মট করে ভেঙে দেয়। খুব সাবধান পদ্ম। তোর কাছে বিষ চেয়েছিল তুই দিসনি, মনে আছে?’
‘ওকে বাঁচাতেই চেয়েছি, এটা কি শত্রুতা?
বিজলির চোখ দিয়ে বিস্ময় ঠিকরে বেরোল। ‘তোর কাছে চাইল আর তুই দিলি না এটা কি রাধু ভুলে যাবে ভেবেছিস?’ পদ্মর মুখ কাঁদোকাঁদো হয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি আশ্বাস দিলেন, ‘ভয় পাচ্ছিস কেন? সেই মন্তরটা বলবি ‘ভূত আমার পুত পেত্নি আমার ঝি। রামলক্ষ্মণ বুকে আছে করবি আমার কী।’ ব্যস তিন বার বলবি রাত্তিরে ঘুমোবার আগে, তোর ধারেকাছে ভূত পেত্নি আসবে না। জানলা দিয়ে হাত বাড়াবে কিন্তু তোকে ছোঁয়ার সাহস হবে না।’
