হাসি মাথা হেলাল, মুখে স্পষ্ট স্বস্তি।
‘নার্সিংহোমটা কোথায়, আমাদের লোটাস?’
‘বউবাজারে রোজমেরি নার্সিংহোম। জ্যোতির এক ছাত্রের বাবার। উনি চারটে ইনস্টলমেন্টে টাকা নেবেন তবে ডাক্তারদের ফি একসঙ্গে একেবারে দিতে হবে।’
‘ডাক্তাররা কত নেবে?’
‘সেটা আমি ঠিক জানি না মাসিমা।’
‘তোমার এখন কোনো কষ্ট হচ্ছে?’
‘না।’
‘তোমরা ওল খাও?’
হাসি অবাক হয়ে বলল, ‘খাই। হঠাৎ ওল খাই কিনা জিজ্ঞাসা করছেন?’
‘আমার দাদা দিয়ে গেছেন। রাতে তোমরা তো ভাত খাও, পদ্ম ডালনা করে দিয়ে আসবে। ওল খেলে রক্ত পরিষ্কার হয়। আপিস থেকে ছুটি নিয়েছ কত দিনের?’
‘একমাসের।’
‘এরপর আপিস যাতায়াত করবে খুব সাবধানে, যা ভিড় হয়, লেগেটেগে যেন না যায়।’
‘মাসিমা আপনার একটা নতুন পাঁচালির বই জ্যোতিকে আনতে বলেছি।’
‘বই দিয়ে আর কী হবে। বেস্পতিবারের পাট এখন তো বন্ধ। তুমি ফিরে এসো, তত দিনে মনে হয় পা ফেলতে পারব। ঠাকুরদের ফুল মালা চন্দন দেওয়া, শোয়ানো, নারায়ণকে স্নান করানো কিছুই হচ্ছে না। জ্যোতিকে বোলো আমাকে যেন রোজ তোমার খবরটা দেয়। পোড়া পায়ের এই অবস্থা না হলে আমি নিজে গিয়ে খোঁজখবর নিতুম। জ্যোতি ছুটি নিয়েছে?’
‘কালকের দিনটা নিয়েছে। অন্যদিনগুলোয় স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চলে আসবে। এর আগেও দু—দিন তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে বেরিয়ে আমাকে দেখিয়ে এনেছে ওখানে। স্ক্যান করাতে বায়পসি করাতেও নিয়ে গেছিল। ওকে হেডমাস্টার বলেছিলেন ছুটি নিন, ও নেয়নি। অপারেশন কালকেই যে হবে এমন কোনো কথা নেই পরশুও হতে পারে। যদি পরশু হয় তা হলে পরশুও স্কুলে যাবে না।’
‘ভালোয় ভালোয় ফিরে এসো ভগবানের কাছে এই প্রার্থনাই করি।’
পরদিন সকাল আটটা নাগাদ স্বামীর সঙ্গে হাসি ট্যাক্সিতে উঠল। ভুটুকে কোলে নিয়ে কল্পনা দাঁড়াল সদর দরজায়। ভুটু ঝুঁকে পড়ে দু—হাত বাড়িয়ে দিল গাড়িতে বসা মায়ের দিকে। কল্পনা তাকে আঁকড়ে ধরে সামলাতে লাগল। শুরু হল ভুটুর কান্না। হাসি গাড়ি থেকে নেমে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে দু—গালে চুমু দিয়ে কল্পনার হাতে ফিরিয়ে দিল। দ্রুত গাড়িতে উঠে দরজা বন্ধ করেই সামনে তাকিয়ে বলল ‘চলো।’
বিজলি পরের দিন সন্ধ্যায় খবর পেলেন হাসি ভালো আছে। ডান স্তনটা কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে। জ্ঞান ফিরেছে কথা বলেছে। প্রথম দিন ভুটু দিনের বেলায় একতলায় কল্পনার কাছে ছিল। সন্ধ্যায় তাকে বিজলির খাটের উপর পদ্ম তুলে দেয়। কাপড়ের একহাত লম্বা একটা পাণ্ডা ভালুক, হাওয়া ভরা প্লাস্টিকের ডলফিন, প্যাঁচ দেওয়া লাঠির মতো বেলুন, দুটো প্লাস্টিকের চাকাভাঙা মোটরগাড়ি, এইসব সামগ্রী নিয়ে বিজলির সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলার পর ভুটু উৎসাহ হারিয়ে খাট থেকে নামার জন্য বায়না জোড়ে। পদ্ম এলাচদানা দিয়ে শান্ত করে। এলাচদানা ফুরিয়ে গেলে আবার কান্না শুরু হয়।
‘সন্ধের সময় বাচ্চচাদের মাকে মনে পড়ে।’ বিজলি বললেন পদ্মকে, ‘হাসি আপিস থেকে ফিরে ওকে নিয়েই তো থাকত। পদ্ম ওকে এবার একটু রাস্তায় ঘুরিয়ে আন, গাড়িঘোড়া লোকজন দেখে ভুলে থাকবে।’
পদ্ম ভুটুকে নিয়ে জয় দত্ত স্ট্রিট থেকে বড়ো রাস্তার মোড় পর্যন্ত যায়। ভুটু যানবাহন আলো শব্দ মানুষজন মুগ্ধ কৌতূহলে দ্যাখে। দেখতে দেখতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পদ্মর কাঁধে মাথা রেখে ঝিমিয়ে পড়ে। পদ্ম ফিরে আসে ঘুমন্ত ভুটু আর একটা পকেট ট্রানজিস্টর হাতে নিয়ে।
‘কোথায় পেলি এটা?’ বিজলি অবাক।
ভুটুকে খাটে শুইয়ে দিয়ে পদ্ম বলল ‘নীচের দাদা দিল, এটা হাসিদির। বলল মাসিমাকে দাও উনি শুনবেন। আমি বললুম আপনি শুনবেন না? তাইতে বলল আমার শোনার জন্য একটা আছে। এই বলে একটা ক্যাসেট টেপ রেকর্ডারে ঢুকিয়ে চাবি টিপল আর অমনি গান বাজতে লাগল।’
রেডিয়োটা হাতে নিয়ে বিজলি বললেন, ‘হাসি গান শুনতে ভালোবাসে। মাঝে মাঝে অনেক রাত্তিরে নীচের থেকে গান ভেসে আসত।’ একটা কথিকা হচ্ছে, তিনি ডায়ালের কাঁটা ঘোরাতেই গান বেজে উঠল। লোকসংগীত পুরুষের গলায়, তিনি শুনতে লাগলেন।
‘মাসিমা মেঝের কোন দিকটায় ভুটুকে শোয়াব? এই দিকে তোমার খাটের পাশে বিছানা পাতি? তুমি তো আর নামছ না।’
অনেক বছর পর বিজলি মন দিয়ে গান শুনছেন। শুনতে ভালো লাগছে। পদ্মর কথায় আলগাভাবে বললেন ‘যা ভালো বুঝিস কর। ঘুম থেকে তুলে ওকে দুধটা খাইয়ে দে। কলঘরে গিয়ে মুতিয়ে আনবি।’
ছোট্ট তোষকের উপর রাবার ক্লথ ও কাঁথা পেতে মাথার বালিশটা রাখতেই বিজলি হাঁ হাঁ করে উঠলেন, ‘পদ্ম করলি কী? উত্তর দিকে মাথার বালিশ? তোকে সেদিনই বললুম না গণেশের মাথাটা কেন হাতির হল? বালিশ এদিকে রাখ।’
অপ্রতিভ পদ্ম তাড়াতাড়ি বালিশটা বিছানার অন্য দিকে রেখে বলল, ‘ও দিকটা যে উত্তর জানতুম না, ভাগ্যিস বললে। ভুটুর মাথাটা কাপড় দিয়ে ঢেকে দোব মাসিমা?’
‘তুই ভেবেছিস তা হলে শনির দৃষ্টি আটকানো যাবে? মুখ্যু কোথাকার, ঠাকুর দেবতার দৃষ্টি কাপড় দিয়ে আড়াল করা যায় না। পুণ্যি অর্জন করলেই দেবতার শুভ দৃষ্টি পাওয়া যায়।’
পরের দিন দুপুরে এক কাণ্ড ঘটল। ঘরের দরজা খুলে কল্পনা দুপুরে ঘুমোচ্ছিল পাশে ভুটুকে শুইয়ে। একসময় ঘুম ভেঙে ভুটু উঠে বসে খাটের তলায় ঝুড়িতে জমিয়ে রাখা পুরোনো কাপড়গুলো টেনে বার করে সময় কাটাচ্ছিল। সেই সময় হুলো বেড়ালটা ঘরে ঢুকে একটা বাচ্চচা ছেলেকে দেখেই অত্যাচারিত হওয়ার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে শুরু করে। ভুটু হামা দিয়ে হুলোর পিছু নেয়। ভুটু দোতলার শেষ ধাপে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং টলমল করতে করতে পিছন দিকে উলটে যায়।
