‘ভাত খেয়েই ছুটছ, কী এমন কাজ তোমার? এতকাল পরে এলে দুটো কথা যে বলবে তাও তোমার সময় হয় না।’ বিজলি প্রায় ঠোঁট ফুলিয়ে আদুরে গলায় বললেন।
শার্টটা মাথায় গলিয়ে সীতেশ বললেন, ‘কাজ কি একটারে, হ্যারিসান রোডে গিয়ে অমিয় বিশ্বাসের জন্য হোমিয়োপ্যাথি ওষুধ কিনতে হবে, হাঁপানিতে খুব কষ্ট পাচ্ছে। বড়োবাজারে একটা মশারি কিনব আর ভালো হিং পাওয়া যায় কিনা দেখব। পাঁচটা বত্রিশের ট্রেনটা না ধরলে সন্ধে সন্ধে বাড়ি পৌঁছোতে পারব না। তুই হাঁটাচলা শুরু কর তখন এসে দুটো কেন দুশো কথা বলব। তুই বরং আয় না আমাদের ওখানে। তোর বউদি তো প্রায়ই বলে কত বছর ঠাকুরঝিকে দেখি না, আসবি।’
বিজলি হতাশ চোখে তাকালেন শ্রীধরের সিংহাসন আর দেবদেবীদের দিকে। ‘এদের ফেলে রেখে যাব কী করে দাদা। আমি যে নিজের হাত পা নিজেই বেঁধে ফেলেছি। কবে যে মুক্তি পাব!’
সীতেশের সঙ্গে পদ্মও একতলায় নেমে তাঁকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। ওপরে ওঠার সময় দেখল ভুটুকে কোলে নিয়ে কল্পনা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে।
‘কী কচ্ছিস?’
‘কী আবার করব, ছেলে আগলাচ্ছি। মা কখন ফিরবে কে জানে।’ বিরক্ত স্বরে বলল কল্পনা।
‘কোলে নিয়ে আছিস কেন, ছেড়ে দে হাঁটুক। চাদে নিয়ে যা।’
পদ্মকে দেখে ভুটু হেলে পড়ল দু—হাত বাড়িয়ে, পদ্ম তাকে তুলে নিল কল্পনার কোল থেকে।
‘আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি। হাসিদি এলে ওকে নিয়ে আসিস।’
‘হাসিদি তো কাল সকালে নার্সিংহোমে ভরতি হবে। বুকে কী হয়েছে অপারেশন করবে।’
‘কই আমাদের তো বলেনি!’ পদ্ম রীতিমতো অবাক।
‘ওরা অমনই, কাউকে কিছু বলে না, নিজেদের মধ্যে চাপা গলায় বলাবলি করে।’
‘হাসিদি নার্সিংহোমে গেলে ভুটু কার কছে থাকবে?’ পদ্ম আরও অবাক হয়ে বলল।
‘আমার কাছে। তা ছাড়া আর কার কাছে থাকবে?’
‘আর রাতে?’ পদ্মর বিস্ময়ের ঘোর এখনও চলছে।
‘বাবার কাছে থাকবে।’ কল্পনা বলল সহজ কথায়।
‘অ।’ ছোট্ট একটা শব্দে পদ্ম তার ক্ষোভ বিরগ আপত্তি প্রকাশ প্রকাশ করে ভুটুকে কোলে নিয়ে উপরে উঠে গেল।
বিজলির ঘরে ঢুকেই পদ্ম গজগজ করে উঠল। ‘আমাদের পর ভাবে নইলে একবার বলতে তো পারত, মাসিমা ভুটুকে আপনারা রাখুন যত দিন না নার্সিংহোম থেকে ফিরে আসছি। কল্পনা সারাদিন ওকে দেখবে ভেবেছো? কুঁড়ের বেহদ্দ, কুম্ভকন্যের মাসতুতো বোন, পড়ে পড়ে তো শুধু ঘুমোবে।’
‘হয়েছে কী? অত রাগ কেন?’
‘রাগব না? হাসিদি একবার বলল না অপারেশন করাতে যাবে আর কালকেই যাবে! আমরা জানলে কি ওকে যেতে দোব না? বুঝলে মাসিমা যতই তুমি ওদের আপন ভাবো, পাঁচালি পড়াও ওরা কিন্তু তোমাকে আপন ভাবে না, এই আমি বলে দিলুম।’
ভুটুকে সে বসিয়ে দিল বিজলির পাশে। সঙ্গে সঙ্গে ভুটু পা ছড়িয়ে বসা বিজলির দুই ঊরুর উপর উঠে দু—ধারে দুটো পা দিয়ে ঘোড়ায় চড়ার মতো বসে শরীর দোলাতে শুরু করল।
‘হয়েছে হয়েছে, বাবা আমার লাগছে, তুমি এখন আমার পাশে লক্ষ্মী ছেলের মতো বসো তো।’ বিজলি দু—হাত দিয়ে ধরে ভুটুকে বিছানার উপর রাখলেন। এবার উঠে দাঁড়িয়ে ভুটু দু—হাত দিয়ে বিজলির গলা জড়িয়ে ধরে নাকটা মুখের মধ্যে পুরে নিল।
‘পদ্ম পদ্ম ধর ধর। আমার নাক গেল।’ বিজলি আর্তনাদ করে উঠলেন। পদ্ম দ্রুত ভুটুকে ধরে মেঝেয় নামিয়ে দিল।
‘ব্যাটার চারটে দাঁত উঠেছে, দ্যাখ তো রক্তটক্ত বেরিয়েছে কিনা?’
‘না কিছু হয়নি।’ বিজলির আঁচল দিয়ে নাক থেকে লালা মুছে দিল পদ্ম।
‘হাসি কাল নার্সিংহোমে যাবে কে বলল তোকে, কল্পনা? বলবে নিশ্চয়। এক বাড়িতে থাকি যখন, এতবড়ো একটা ব্যাপার হতে যাচ্ছে, না বলে পারবে? তুই রাগারাগি করছিস কেন!’ বিজলি প্রত্যয় ভরে শান্ত স্বরে বললেন।
‘দ্যাখো বলে কিনা।’ পদ্ম ঠোঁট উলটিয়ে কথাটা বলেই লাফিয়ে গিয়ে ধরল ভুটুকে। ‘তোমার এই ঠাকুরদেবতার সব্বোনাশ কিন্তু এই ছেলের হাতেই হবে বলে রাখছি।’
বিজলি হাসতে শুরু করলেন। স্নেহ মমতায় তাঁর দু—চোখ ভরা। ‘সব্বোনাশ হলে তো ভালোই, মুক্তি পাব এঁদের হাত থেকে। বাক্সটা খুলে ওকে দুটো বোঁদে দে, মিষ্টি খেতে খুব ভালোবাসে।’
‘কল্পনা বলল রাতে ভুটুকে রাখবে ওর বাবা। এই বাচ্চচাকে রাখবে পুরুষমানুষ!’ পদ্মর ভ্রু কপালে উঠল।
বিজলি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা ওকে বাড়াবাড়ি। আমি নয় শয্যাশায়ী কিন্তু তুই তো আছিস। হাসি তো বলতে পারত ভুটুকে রাতে তোর কাছে রাখতে। রাতে কত রকমের কাজ থাকে বাচ্চচার, সেসব কি ব্যাটাছেলে করতে পারবে? হাসি এলে তুই গিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলবি, জানিয়ে দিবি মাসিমা খুব দুখ্যু পেয়েছে তোমাদের ব্যবহারে।’
পাঁচ
হাসি ঘরে পা দেওয়ামাত্র ঝাঁঝিয়ে উঠলেন বিজলি। ‘তোমাদের কত্তাগিন্নির ব্যাপার কী বলো তো? আমাদের কাছে ভুটুকে রেখে গেলে কি ও জলে পড়ে যাবে? জ্যোতি পারবে রাত্তিরে ওকে রাখতে?’
বিব্রত হয়ে হাসি বলল, ‘ভাঙা পা, আপনার তো অসুবিধে হবে। তাই—’
হাসির কথা শেষ হবার আগেই বিজলি প্রায় ধমকে উঠলেন। ‘তাই ভদ্রতা দেখিয়ে আমাকে আর বলোনি। ক—দিন থাকবে নার্সিংহোমে?’
‘ছ—সাত দিন।’
‘আমার পা ভাঙা কিন্তু পদ্মর তো পা ভাঙেনি! ভুটু ওর ন্যাওটা, পদ্মর কাছে ও সবথেকে ভালো থাকবে। ওর বিছানা, কাঁথা, দুধের বোতল, জামা সব কল্পনাকে দিয়ে কাল ওপরে পাঠিয়ে দেবে আর খেলনা যা আছে তাও যেন দিয়ে যায়।’
