পরের দিন সে যায় হালদারি বাড়িতে। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট মহিমারঞ্জন স্নান করে তখন পুজোয় বসেছিলেন, হাবি এসে অপেক্ষা করছে জানতে পেরে পুজো ফেলে উঠে আসেন। সদর ঘরে দাঁড়িয়ে ছিল হাবিবুল্লা, তাঁকে প্রণাম করতেই মহিমারঞ্জন জড়িয়ে ধরেন।
‘ওগো কোথায় তুমি, নাড়ু নিয়ে এসো, পুজোর থালায় সন্দেশ রয়েছে শিগগিরি আনো। কতবড়ো মানুষ আমার বাড়িতে এসেছে, সারা হুগলি জেলায় প্রথম হওয়া কি চাট্টিখানি কথা! হাবি তো আমাদের গর্ব।’ বাবার চিৎকার শুনে হাফপ্যান্ট পরা সীতেশ ও ফ্রক পরা বিজলি ছুটে আসেন।
মহিমারঞ্জন আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘বাবা খালি হাতে তো আশীর্বাদ হয় না। তোকে তো এখন একটা কিছু দিতে হয়, কিন্তু কী দিই বল তো!’ তিনি চারপাশে তাকিয়ে দেবার জিনিস খুঁজলেন। দেবার মতো কিছুই হাতের কাছে নেই। জানলা দিয়ে চোখে পড়ল জামরুল গাছটা, তাতে ফলও ধরে রয়েছে।
‘হাবি ওই জামরুল গাছটা তোকে দিলুম। আজ থেকে ওটা তোর। ওতে যা ফলবে সব তোর।’
ঘরের সবাই হতভম্ব মহিমারঞ্জনের এই দান দেখে। বিব্রত হাবিবুল্লা বলল, ‘কাকা এই গাছ নিয়ে আমি কী করব। আমি থাকি গ্রামের শেষ প্রান্তে আর এই গাছ এখানে আপনার বাগানে, আমি তো গাছটা তুলে নিয়ে যেতে পারব না। এটা আপনারই থাক।’
‘ব্রাহ্মণের মুখ থেকে একবার যে—কথা বেরিয়েছে তা তো আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।’ মহিমারঞ্জন দৃঢ় ও গাঢ় স্বরে বলেছিলেন, ‘ও গাছ তোমার। ফিরিয়ে নিলে আমি ধর্মচ্যুত হব। তাই কি তুমি চাও?’
নির্বাক হবিবুল্লা মাথা নীচু করে মেনে নিয়েছিল এই দান। সীতেশ আর বিজলি মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিল। বিজলি পরে দাদাকে বলে, ‘বাবা যেন কী! দিয়ে দিল অমন জামরুল গাছটা?’
সীতেশ বলেছিলেন, ‘দিয়েছে তো কী হয়েছে? হাবিদা কি এতদূর আসবে জামরুল খেতে? ও গাছ আমাদেরই থাকবে।’
তাই—ই ছিল। মহিমারঞ্জনই বরং মরশুমে ফল ধরলে ধামায় করে জামরুল হাবির জন্য খেতে পাঠিয়ে দিয়েছেন, যত দিন সে ভারতে ছিল। হাবিবুল্লা শিবপুর এঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করে জলপানি পেয়ে মেটালার্জিতে গবেষণা করতে আমেরিকা চলে যায়। সেখানই বড়ো এক ইস্পাত প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে বিয়ে করে বসবাস শুরু করে, আর গ্রামে ফিরে আসেনি। তবে আমৃত্যু সে মাসে মাসে মাকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে গেছে।
জামরুল গাছটা হালদারদেরই অধীনে ছিল। শিবপুর থেকে ছুটিছাটায় হবিবুল্লা গ্রামে এলে গাছটা দেখতে আসত। সীতেশ বলেছিলেন বিজলিকে, ‘মনে রাখিস এটা পরের গাছ। পরের দ্রব্য না বলিয়া লইলে চুরি করা হয়। তুই তো হাবিদাকে বলে গাছে উঠে জামরুল পাড়িস না। এটা চুরিই, ধরা পড়লে হাবিদা তোকে পুলিশে দেবে। পুলিশ কোমরে দড়ি বেঁধে সারা গ্রামে ঘোরাবে।’
শুনে বিজলির বুক ঢিপঢিপ করলেও মুখে তেজ দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ঘোরাক কোমরে দড়ি বেঁধে। জামরুল আমি পাড়বই, হাবিদা জানতে পারলে তো!’
বিজলি যেদিন গাছ থেকে পড়ে দাঁত ভাঙেন তার আগের দিন হাবিবুল্লা বাড়ি এসেছে এটা তিনি জানতেন। ‘হাবিদা আসছে রে, নেমে পড়’, শোনামাত্র তিনি আঁকুপাকু করে নামতে গিয়ে জমিতে পড়ে যান। একটা ইটে ঠোক্কর লেগে দাঁতটা ভাঙে। এখনও বড়ো করে হাসলে বিজলির দাঁতের পাটিতে একটা খালি জায়গা দেখা যায়।
পঞ্চাশ বছরেরও বেশি হয়ে গেল দাঁতের এই শূন্যতার বয়স। মনে থাকে না, দাদা মনে পড়িয়ে দিল। জামরুল গাছটা বুড়ো হয়ে আর ফল দিতে পারত না, কেটে ফেলে সেখানে লাগানো হয়েছে পেয়ারা গাছ। গাছটার সঙ্গে জড়ানো আছে বাবার স্মৃতি ‘ব্রাহ্মণের মুখ থেকে একবার যে—কথা বেরিয়েছে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না, নিলে ধর্মচ্যুত হব।’ হাবিদার কথা : ‘কাকা এই গাছ নিয়ে আমি কী করব এটা আপনারই থাক।’
কিন্তু রইল আর কোথায়? হাবিদা গ্রামে রইল না, গাছটাও কেটে ফেলা হল। আর আমি? বিজলি ভারী নিশ্বাস ফেললেন। ভিজে গামছায় হাত মুছছেন সীতেশ।
‘বুঝলি বুড়ি এবার যেদিন আসব আগে ফোন করে দোব। অলকাদের নম্বরটা তো আমার কাছে আছে। পদ্ম তা হলে অনেক রকম রান্না করে রাখার সময় পাবে। ওর হাতের রান্না বড়ো ভালো।’
আনন্দে পদ্ম বিগলিতপ্রায়। ‘আমি আর রান্নার কী জানতুম। সব তো মাসিমার কাছে শেখা। মামাবাবু আপনাদের যজ্ঞিডুমুর গাছ আছে শুনেছি। এবার যখন আসবেন নিয়ে আসবেন তো খানিকটা। মাসিমা বলেছে শিখিয়ে দেবে ডুমুরের ডালনা।’
‘বুড়ি তোর অর্ডার কী?’
‘কিছু না। বাপের বাড়ির থেকে যা আসবে তাই আমার কাছে সোনার তুল্য।’
ধুতির কষি আঁটতে আটতে সীতেশ বললেন, ‘তোর বউদিও বলে বাপের বাড়ির জিনিসের দাম হয় না, অমূল্য! গত বছর জামাইষষ্ঠীতে ছোটো শালা বাড়ির গাছের আম পাঠিয়েছিল, দবির খাস। আজকাল এই আম তো বাজারে মেলে না। তোর বউদি দিনে একটার বেশি দিত না পাছে ফুরিয়ে যায়। দশদিন ধরে দশটা খেয়েছি। ভালো কথা, মিষ্টির বাক্সটা খুলে দেখলি না, গুণোময়রার বোঁদে! মনে আছে, মা—র কাছে থেকে পয়সা নিয়ে কিনতে গেলে গুণো বলত, ‘এ পয়সা অচল, তামার পয়সা আনো।’ তখন ফুটো পয়সা গরমেন্ট চালু করেছিল। গুণো তো এখন হরে ভূত। ওর নাতি নাদু এখন দোকান চালাচ্ছে, অনেক রকম মিষ্টি বাড়িয়েছে, কাচের শো কেস করেছে, তবে বোঁদেটা ঠাকুরদার আমলের মতোই রেখেছে, খেয়ে দেখিস।’
