দরজার বাইরে জুতো খুলতে খুলতে সীতেশ হালকা চালে বললেন। বিজলি বালিশে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে দু—হাতে চোখের সামনে গরদের থানটা তুলে ধরে খুঁজছিলেন কোথায় কোথায় ছিঁড়েছে কোথায় পিঁজে গেছে। ‘বুড়ি’ শুনেই ঝুপ করে হাত নামিয়ে বাচ্চচা মেয়ের মতো ‘দাদা’ বলে চিৎকার করে উঠলেন।
সীতেশের কাঁধে একটা ঝোলা। সেটা নামিয়ে হাঁক দিলেন, ‘পদ্ম কোথায় গেলি রে। কী ভিড় রে বাবা ট্রেনে, তার আগে ট্রেকারে তো লোকের কোলে বসে ইস্টিশনে এলুম।’ বলেই তিনি মুখ তুলে পাখার দিকে তাকালেন। ‘একটু জোর করে দে তো, যা ভ্যাপসা গরম। ক—দিন ধরে আমাদের ওদিকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, তোদের এখানে কেমন?’
বিজলি বিহ্বল চোখে দাদার দিকে তাকিয়ে, পদ্ম রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে প্রণাম করে বলল, ‘মামাবাবু কতদিন পর, ভাত চড়াই?’
‘দাঁড়া দাঁড়া এটা ধর।’ সীতেশ তার কাঁধের ঝোলাটা তুলে দিলেন পদ্মর হাতে। পদ্ম ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বার করল গাওয়া ঘিয়ের শিশি, একটা বড়ো পেঁপে, দুটো নারকেল, একটা বড়ো ওলের আধখানা আর মিষ্টির বাক্স।
‘পদ্ম পেঁপেটা দু—দিন রেখে খাবি, এখনও পাকেনি। ঝুলিতে রয়ে গেছে কাঁচালঙ্কা। বুঝলি বুড়ি তুই যেমন ঝাল ভালোবাসিস ঠিক তেমনি কষকষে ঝাল! ওলভাতে ঘি আর কাঁচালঙ্কা মেখে খেয়ে দেখিস। মা মেখে গোল্লা করে তোর মুখে দিত আর ভয়ে ভয়ে বলতিস কুটকুট করবে না তো, মনে আছে তোর?’
‘খুব মনে আছে। আর তুমি অমনি মুখ বাড়িয়ে দিয়ে বলতে, বুড়ি খাসনি ভীষণ কুটকুটে, মা আমাকে দাও। মা তোমাকে ধমকে বলত এখনও তোর পাতে মাখা রয়েছে আগে শেষ কর, এটা বুড়ি খাবে।’
ঝকঝক করছে বিজলির চোখ, দাদাকে পেয়ে প্রায় ষাট বছর আগে পিছিয়ে গেছেন। সীতেশ বললেন, ‘আধখানা ওল আমি আর তোর বউদি খেয়েছি, বাকিটা তোর জন্য আনলুম। পদ্ম ভাত চড়াই বলে দাঁড়িয়ে রইলি কেন! আমি খেয়েই কিন্তু বেরোব, অনেক কাজ আছে। বুড়ি তোকে দেখে মনে হচ্ছে পা ভেঙে ভালোই হয়েছে, বিশ্রাম পেয়েছিস। হাড় সেট হতে ক—দিন লাগবে বলেছে ডাক্তার?’
‘দু—মাস পর ভালো করে হাঁটতে পারব। তুমি চান করবে তো? পদ্ম আমার একটা কাপড় আলমারি থেকে বার করে দে।’
সীতেশ স্নান করতে যাওয়ার পর বিজলি পদ্মকে বললেন, ‘শুধু ডাল ভাজা আর ঝিঙে কুমড়ো মামাবাবুকে খাওয়াবি? চট করে শীতলার থেকে দই আর রসগোল্লা নিয়ে আয়। দাদা দই খুব ভালোবাসে।’ বালিশের তলা থেকে বিজলি টাকা বার করে দিলেন।
সীতেশ ঘরের মেঝেয় বসে ভাত খেলেন। খেতে খেতে বিজলির ভাইপো ভাইঝিদের খবর জানার কৌতূহল মিটিয়ে রান্নার গ্যাস নেওয়ার কথাও জানিয়ে দিলেন।
‘দু—মাইল দূরের থেকে সাইকেল রিকশায় সিলিন্ডার আনা এক ঝামেলা, তা হলেও কয়লার হাত থেকে তো বেঁচেছি। তোর বউদি তো এবেলার রান্না ওবেলা খায় না, নইলে ফ্রিজটাও নিয়ে ফেলতুম। ঘণ্টুর তো দুটো ফ্রিজ বর্ধমানের বাড়িতে, একটা পাঠিয়ে দেবে বলেছিল। তোর তো ফ্রিজ নেই, বলব ঘণ্টুকে?’
‘থাক দাদা, টিভি ফ্রিজ টেলিফোন ছাড়াই বড়ো হয়েছি, ওসব ছাড়াই বাকি জীবনটা কেটে যাবে। যন্তরপাতি ঢোকানো মানেই ঝঞ্ঝাট ঢোকানো, দেখি তো সব এবাড়ি ওবাড়িতে। আজ এই ওটা খারাপ হচ্ছে কাল সেটা খারাপ হচ্ছে ডাক মিস্তিরিকে খবর দে অফিসে। তা ছাড়া অমনি অমনি তো আর টিভি টেলিফোন চলে না, টাকা দিতে হয় মাসে মাসে। আমার অত টাকা কোথায়? এই বেশ সুখে আছি সেধে ভূতের কিল খেতে যাব?’
‘তা বটে। আমাদের ওখানে দিনে ছ—ঘণ্টা কারেন্ট থাকে না। কখন যাবে কখন আসবে কেউ জানে না। সবথেকে অসুবিধে হয় ছেলেমেয়েদের, সেই হ্যারিকেনের আলোতেই লেখাপড়া করতে হচ্ছে যেমন আমরা করেছিলুম।’
‘দাদা জামরুল গাছটার জায়গায় তো পেয়ারা গাছ লাগিয়েছ, হয়েছে পেয়ারা?’
‘হবে না কেন! এখনও পাকেনি, তুই ডাঁশা খেতে পারবি কি পারবি না ভেবে আর আনুলম না।’
‘পারবি কি পারবি না মানে?’ বিজলির ভঙ্গিতে ও স্বরে ঝগড়া ঘনিয়ে উঠল। ‘এই দ্যাখো আমার দাঁত। এখনও আখ দাঁত দিয়ে ছাড়িয়ে চিবিয়ে খাই।’ বিজলি ঠোঁট টেনে ফাঁক করে দাঁত দেখালেন।
সীতেশ বোনের মুখের দিকে না তাকিয়ে বললেন, ‘ডান দিকে ওপরের পাটির কষের দাঁতটা তো এখনও গজাল না, আখ চিবোস কী করে?’ দইমাখা হাত চাটতে চাটতে সীতেশ আড়চোখে তাকিয়ে বললেন।
বারো বছর বয়সে বিজলির দাঁতটা ভেঙে ছিল জামরুল গাছ থেকে তাড়াহুড়ো করে নামার সময় পড়ে গিয়ে, সীতেশ দোতলার ছাদে দাঁড়িয়ে গাছ থেকে বোনের জামরুল পাড়া দেখছিলেন। তখনই মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি ভর করে। চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, ‘বুড়ি হাবিদা আসছে রে, নেমে পড় নেমে পড়।’
হালদারবাড়ির বাগানে এই জামরুল গাছটির মালিক গ্রামেরই ছেলে হাবিবুল্লা চৌধুরী। তার মালিকানা পাওয়ার ব্যাপারটাও একটা গল্প। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের ছেলে হবিবুল্লা, ম্যাট্রিক পরীক্ষায় জেলার মধ্যে প্রথম এবং সারা বাংলায় সপ্তম হয়। ভেনিয়াপুর গ্রামের মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে দলে দলে মণিরুল চৌধুরির টিনের চালের বাড়িতে যায়। কারোর হাতে নতুন পাজামা কারোর হাতে কাতলা মাছ, কেউ দিল এক হাঁড়ি রাজভোগ কেউ দিল টর্চ, পাউডারের কৌটো। রাজু ঘোষাল পইতেটা হাবিবুল্লার মাথায় ছুঁইয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের মুখোজ্জ্বল করেছ বাবা, দীর্ঘজীবী হও, আরও বড়ো হও।’ হাবিবুল্লা রাজু ঘোষালকে প্রণাম করে স্মিত মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
