‘কীসের ভিত্তিতে আপনি বলছেন মিছে কথা?’ অফিসার জানতে চাইল।
‘আট বছর আগে রাধুর যখন দুর্ঘটনা ঘটল, এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে ফিসফাস হল, বউকে সিঁড়ি দিয়ে ইচ্ছে করে ঠেলে দিয়েছে শঙ্কর চাটুজ্যে। রাধু নিজে আমাকে পরে বলেছে একদম বাজে কথা, হ্যাঁ, রাধু নিজে আমাকে বলেছে সে অন্ধকারে সিঁড়ির ধাপ ফসকে গড়িয়ে পড়েছিল। আর এই যে মারা গেল, যেজন্য আপনি খোঁজ নিতে এসেছেন, নিশ্চয় আপনাকে কেউ—না—কেউ বলেছে, চুপি চুপি বলেছে, ওকে ঘুমের বড়ি ইচ্ছে করে খাইয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। ঠিক কিনা?’ উত্তরের জন্য বিজলি স্থির দৃষ্টিতে তরুণটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ‘অতগুলো বড়ি কি ইচ্ছেমতো গিলিয়ে দেওয়া যায়।’
ইতস্তত করে অফিসারটি বলল, ‘একজন অভিযোগ করেছে ফোনে।’
‘নাম বলেছে?’
‘নাম ঠিকানা তো বলতেই হবে। নয়তো অভিযোগ আমরা অ্যাকসেপ্ট করব কেন। উড়ো ফোন তো অনেক আসে। কত লোকের কত রকম উদ্দেশ্য থাকে।’
‘রাধুদের পেছনের বাড়ি বিনোদ ঘোষের। ছাদে বেআইনি বাথরুম তুলেছিল। শঙ্কর ঠাকুরপো কর্পোরেশনে খবর দিয়ে বাথরুমটা ভেঙে দেয়। সেই থেকে বিনোদ ঘোষ ছুতোনাতায় ওদের পেছনে লেগে আসছে। শঙ্কর ঠাকুরপো আর অন্নপূর্ণাকে জড়িয়ে নোংরা কথাবার্তা ওই লোকটাই চাউর করেছে পাড়ায়। রসালো কেচ্ছা, সবাই গপগপিয়ে গিলেছে। আর এবার তো আরও ভয়ংকর খুনের গপ্প রটানোর সুযোগ পেয়ে গেছে। তবে আপনাকে আমি পষ্ট করে বলছি এটা মেরে ফেলা নয়, আত্মহত্যাই। রাধু অনেক বার আমাকে বলেছে, ‘দিদি এভাবে আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।’ বলত আর দু—চোখ দিয়ে দরদরিয়ে জল নামত। খুব ছলবলে ছিল, দিনের মধ্যে কতবার যে ছুটে ছুটে একতলা দোতলা করত তার ইয়ত্তা নেই।’
বিজলির চোখের কোলে জল টলটল করছে, গলা ধরে এসেছে। তরুণ অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বলল, ‘রাধাকিঙ্করী চ্যাটার্জি মনে হচ্ছে খুব প্রাণবন্ত ছিলেন, এমন মানুষ তো আরও বেশি করে বাঁচতে চাইবেন, তাই না?’
‘এর উলটোটাও তো হতে পারে। রাধুকে দেখেছি ঘুড়ি ওড়াতে, বৃষ্টি হলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছাঁট মুখে লাগাতে, মশলাধোসাওলাকে ডেকে কিনতে। একদিন রাতে কোকিলের ডাক শুনে ও আমাকে বলেছিল রাতে ঘুমোতে পারেনি। এমন মেয়ে যদি অথর্ব পঙ্গু হয়ে যায় তা হলে কি তার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে? তার কষ্ট তো হাজারগুণ বেড়ে যাবে। দগ্ধে দগ্ধে মরার থেকে একেবারে মরা খারাপ কী! এই আমি পা ভেঙে বিছানায় পড়ে আছি, আমার অবশ্য মরে যেতে ইচ্ছে করছে না কিন্তু যদি জানি চিরকাল এভাবেই থাকতে হবে তা হলে অন্যরকম তো ভাবতেই পারি, রাধুও অন্যরকম ভেবেছিল। এই তো দু—দিন আগে ও পদ্মকে বলল বিষ এনে দিতে।’
তরুণ অফিসার তাকাল পদ্মর দিকে। ‘ইনি কে?’
‘আমার দিনরাতের সঙ্গী। ধৃতরাষ্ট্রের যেমন ছিল সঞ্জয় আমার তেমনি পদ্ম। বাইরের সব খবর আমি পাই ওর কাছ থেকে।’
‘আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে এই মৃত্যুতে আপনি দুঃখ পাননি, এতে যেন আপনার সায় আছে।’ তরুণটি তার তদন্তের বিষয়ের বাইরে গিয়ে কৌতূহল দেখাল।
‘রাধু মনের কষ্ট, শরীরের যন্ত্রণা নিয়ে তিলতিল করে মরণের দিকে এগোচ্ছে সেটা দেখতে কি খুব ভালো লাগে? বাঁচব কি মরব সেটা তো নিজের বিষয়, রাধুকেই তা ঠিক করতে দেওয়া উচিত, নয় কি?’ বিজলি উত্তরের আশায় তাকিয়ে রইলেন।
প্রশ্নটায় তরুণ অফিসার বিব্রত হয়ে পড়ল। গলাখাঁকারি দিয়ে এধার—ওধার তাকাল। এই বৃদ্ধার কাছে এমন একটা বেমক্কা অবস্থায় পড়তে হবে জানলে সে কথাবার্তা অনেক আগেই চুকিয়ে দিয়ে চলে যেতে পারত। দেশের আইন বলছে আত্মহত্যার চেষ্টা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, পুলিশ আইনের রক্ষক। পুলিশের উর্দি পরে সে কী করে আত্মহত্যাকে সমর্থন করবে? আবার এই বৃদ্ধার যুক্তিটাও সে ফেলে দিতে পারছে না। এখনও ভোঁতা হয়ে যায়নি তার অনুভূতি।
অফিসারের দোনামনা ভাব দেখে বিজলি বললেন, ‘আপনি যদি ব্যাপারটা এইভাবে দেখেন তা হলে বোধহয় আমার পক্ষে বোঝাতে সুবিধা হয়। প্রত্যেক ট্রেনেরই একটা নির্দিষ্ট সময় আছে স্টেশন থেকে ছাড়ার। যদি কেউ ট্রেনে উঠে কোথাও যেতে চায় তা হলে সেই লোকটিই ঠিক করবে কবে, ক—টার ট্রেন সে ধরবে। রাধু নির্দিষ্ট সময়ে তার ট্রেনে উঠেছে নিজের ইচ্ছায়, আপনি আমি বাধা দেবার কে?’
অফিসার হাতের ঘড়ি দেখে ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। ‘আমাকে আর এক জায়গায় যেতে হবে।’
.
তিন দিন পর বেলা এগারোটায় হাজির হলেন সীতেশরঞ্জন। সাদা ফুলশার্ট, ধুতি ও পাম্পশ্যু পরা, ছিপছিপে দীর্ঘদেহী সত্তর বছর বয়সি লোকটি ব্যস্ত থাকেন সবসময় হাঁটাহাঁটি করেন প্রচুর। চাষবাস তদারক করেন নিজে। দুই ছেলে দুই মেয়ে। ডাক্তার ছেলে থাকে বর্ধমানে, কাঠের ব্যবসায়ী ছেলে থাকে শিলিগুড়িতে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে দুর্গাপুরে ও চন্দননগরে। তারা সচ্ছল ও সুখী। সীতেশরঞ্জনের ঝাড়া হাত—পা। স্বামী—স্ত্রী, গোরু বাছুর, ফলমূলের গাছ, ধানের গোলা, পুকুরের মাছ ইত্যাদি নিয়ে এখন তাঁর সংসার। দেড়শো বছর আগের গ্রামবাংলার মানুষ ও মানসিকতা নিয়ে যদি কেউ গবেষণা করতে চান তা হলে হুগলি জেলার এই মানুষটিকে অনুধাবন করেই প্রার্থিত যশোলাভ করতে পারবেন।
‘কীরে বুড়ি, পা ভাঙলি কী করে?’
