‘বায়োপসি, আরও তিন দিন পরে রিপোর্ট পাওয়া যাবে।’
বিজলি লক্ষ করলেন জ্যোতির মুখে কোনো উদবেগ নেই। ভাবখানা যেন ক্যানসার কালান্তক রোগই নয়, সর্দিকাশির মতো একটা ব্যাপার। বিরক্ত হয়ে বিজলি বললেন, ‘রোগটকে তোমরা দু—জনেই গুরুত্ব দিচ্ছ না, এটা কেমন কথা?’
‘দিচ্ছি না কে বলল মাসিমা। ডাক্তার যখনই বলল তার সন্দেহ হচ্ছে হাসির বুকের লাম্পটা ক্যানসারাস, এক্স—রে করুন, সেই রাতে আমরা ঘুমোইনি। দু—জনে দু—জনের দিকে তাকিয়ে জেগেছি, কথা বলে গেছি ভুটুকে মাঝে রেখে। সেই রাতেই আমরা তৈরি হয়ে যাই, যা হবেই যাকে আটকানো যাবে না তা একদিন হবেই। তত দিন জীবনটাকে বিস্বাদ বিশ্রী করে রাখার কোনো মানে হয় না। মাসিমা মরার আগেই হাসি মরতে চায় না।’
জ্যোতি বিজ্ঞানের শিক্ষক, ক্লাসে ছাত্রদের পড়া বোঝাবার জন্য ব্যাখ্যা করে, স্পষ্ট উচ্চচারণ অনর্গল বলে যায়। বিজলি স্তম্ভিত হয়ে শুনে যাচ্ছিলেন। কত সহজে এই অল্পবয়সি দম্পতি মৃত্যুকে গ্রহণ করছে। এই পৃথিবী, এই সংসার, আদরের ছেলেকে ফেলে চলে যেতে হাসির কষ্ট হবেই তবু সে তাঁর অনুরোধ লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ে গেল। একটুও টের পেতে দিল না কালব্যাধি তার শরীরে বাসা বেঁধেছে! কত বড়ো মন, কী সাহস মেয়েটার! বিজলির চোখের সামনে থেকে থিয়েটারের যবনিকা যেন ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। মঞ্চে কুশীলবরা—জ্যোতি, হাসি, রাধু, তপতী, পলাশ, অলকা, পদ্ম, পাড়ার ছেলেরা। সবাই ভালো সবাই ভালো।
বিজলি চোখ বন্ধ করলেন। মনে মনে বললেন, ‘শ্রীধর এরা নিজের—নিজের মতো করে বেঁচে থাকুক, তুমি ওদের দেখো।’
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলতে দেখলেন জ্যোতি চলে গেছে। সিঁড়িতে পটপট হাওয়াই চটির শব্দ, তপতী এল।
চটি খুলে ঘরে ঢুকে তপতী বোকার মতো হেসে বলল, ‘দিদিমা আমি এসেছি।’
‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি। বলেছিলুম সঙ্গে করে লোক আনতে, এনেছিস?’
‘হ্যাঁ, তিন জনকে পেলুম।’
বিজলি বালিশের তলা থেকে টাকা বার করলেন। ‘গুনতে পারবি তো, যোগ করা শিখেছিস?’ নোটগুলো হাতে দেবার সময় বললেন, ‘গুনে দ্যাখ।’
‘আমি এইট ক্লাস পর্যন্ত পড়েছি দিদিমা।’
‘পড়েছিস তো, শিখেছিস কিছু?’
তপতী গোনার সঙ্গে সঙ্গে বিড়বিড় করে যোগ করছিল। ‘দু—হাজার দিদিমা, আমি যাই ওরা নীচে দাঁড়িয়ে আছে।’
তপতী চলে যাচ্ছে। বিজলি একটা পঞ্চাশ টাকার নোট হাতে নিয়ে ডাকলেন, ‘ওরে অঙ্কের পণ্ডিত এটা নিয়ে যা। তোকে পঞ্চাশ টাকা কম দিয়েছি। আনন্দে নাচতে নাচতে তো টাকা গুনে বললি দু—হাজার। কেলাস এইট পর্যন্ত পড়েছি।’ ভেংচে উঠলেন বিজলি। ‘এই বিদ্যে নিয়ে রোজগার? আমার টাকাটাই দেখছি জলে গেল।’ তারপর দাবড়ানি, ‘ভাগ আমার সামনে থেকে।’
আবার বোকার মতো হেসে তপতী চলে গেল। এক ঘণ্টা পর পদ্ম এসে জানাল, ‘রাধু মামিমাকে লোটাসে নিয়ে গেছে। নাথু ফিরে বলল বোধহয় বাঁচবে না। আর কী বলল জানো? বলল, বিষ খায়নি ঘুমের বড়ি খেয়েছে। বড়ি পেল কী করে বলো তো?’ পদ্ম অবাক চোখে প্রশ্ন করল।
‘কী করে পেল তা আমি জানব কী করে? তুই এক কাজ কর অলকাদের বল ভেনিয়াপুরে দাদাকে ফোন করে জানিয়ে দিতে, আমি পা ভেঙে শয্যাশায়ী। ওইটুকু বললেই হবে। ফোন নম্বরটা লিখে দিচ্ছি নিয়ে যা।’
সন্ধ্যাবেলাতেই বিজলি জেনে গেলেন রাধাকিঙ্করীকে রাত্রে খাটে শোয়াবার জন্য হুইলচেয়ারে বসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল অন্নপূর্ণা। রাধু তখন জল খেতে চায়। হুইলচেয়ার থামিয়ে অন্নপূর্ণা জল আনতে ঘরের বাইরে যায়। চেয়ারটা ছিল টেবল ঘেঁষে, টেবলে ছিল ওষুধ রাখার প্লাস্টিকের বাক্সটা। রাধু তখন হাত বাড়িয়ে বাক্স থেকে তুলে নেয় আধ—ভরতি ঘুমের বড়ির ছোট্ট সরু শিশিটা। বড়িগুলো বাঁ হাতে ঢেলে মুঠোবন্ধ করে রাখে। ডান হাতে গেলাস ধরে জল খায়। মুখের মধ্যে জল ধরে রেখে গেলাস ফিরিয়ে দেয়, অন্নপূর্ণা গেলাসটা টেবলে রাখতে যেই মুখটা ঘুরিয়েছে তখুনি রাধু মুঠো—ভরতি বড়ি মুখে পুরে জল সমেত গিলে ফেলে। অন্নপূর্ণার সন্দেহ হয়, কী যেন একটা মুখে পুরল রাধুবউদি। ‘কী মুখে দিলে, দেখি দেখি হাঁ করো।’ সে বলেছিল। রাধাকিঙ্করী মুখ খোলেনি।
বাঁচেনি রাধাকিঙ্করী। এটা পরিকল্পিতভাবে খুন না আত্মহত্যা তার তদন্তে পুলিশ আসে। বাড়ির লোকেদের জেরা করে থানার তরুণ এক অফিসার। তারপর রাধাকিঙ্করীর সঙ্গে যাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল তাদের খোঁজ করে অফিসারটি। পাড়ার লোকেরা তাকে জানায় বিজলির নাম। বিজলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে অফিসার দোতলায় আসে। হাতে ফাইল, সাদা ইউনিফর্ম, মাথায় কালো ক্যাপ, কাঁধে রঙিন ফিতে, অফিসারটি ঘরে জুতো সমেত ঢুকতে যাচ্ছিল। পদ্ম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘ঘরে ঠাকুর আছে, জুতো খুলে ঢুকুন। মাসিমা কাউকে জুতো পরে ঘরে ঢুকতে দেন না।’
পারিবারিক, সামাজিক আচার আচরণ পালনের নিয়ম মান্য করার রীতিটা এই অল্পবয়সি অফিসার এখনও ভুলে যায়নি। অপ্রতিভ হয়ে সে জুতো খুলে ঘরে ঢুকল, সন্তর্পণে তাকাল ঠাকুরের সিংহাসনের দিকে। বিজলি বললেন, ‘পদ্ম ওকে বসার টুলটা এনে দে।’ তরুণটি টুলে বসার পর বিজলি বললেন, ‘রাধুকে আমি তিরিশ বছর ধরে জানি। খুব সুখেরই সংসার ছিল ওর। স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যথেষ্ট মনের মিল ছিল, ভালোবাসাও ছিল। আপনি হয়তো পাড়ার লোকের কাছে শঙ্কর ঠাকুরপো সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছেন বা শুনবেন। সব মিছে কথা।’
