‘আহ।’
অনন্তের মনে হল গৌরীর মুখ থেকে শব্দটা স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে এসেছে।
‘চলো এবার হাঁটি, তুমি তো এখন সোজা শ্রদ্ধানন্দ পার্কের দিকে যাবে, আমি যাব একেবারে উলটোদিকে, বিবেকানন্দ রোড হয়ে, হেদোর পাশ দিয়ে।’
‘আগে একটু গরম চা খেয়ে নিলে বেশ হত, খাবে?’
‘আমি দিনে দু—কাপের বেশি খাই না।’
‘আমার জন্য নয় আজ এক কাপ বেশিই খাবে। চলো, একটু এগোলেই ঘোষ কেবিন।’
‘তুমি দেখছি এখানকার সব চেনো, আস বুঝি?’
গৌরী হাসল। ওরা ফুটপাথ দিয়ে জল ভেঙে চলতে শুরু করল। দু—জনেই হাতে চটি তুলে নিয়েছে। বৃষ্টি এখন গুঁড়ি গুঁড়ি। ফুটপাথ কোথায় শেষ হয়ে রাস্তা শুরু হয়েছে সেটা জলে ডুবে থাকায় বোঝা যাচ্ছে না।
‘দাঁড়াও আমি আগে রাস্তায় নামি।’
অনন্ত পা টিপে টিপে ফুটপাথের কিনারে এসে সন্তর্পণে রাস্তায় নেমে হাত বাড়িয়ে দিল : ‘হাতটা ধরে নামো।’
গৌরী তার হাত ধরে নামার সময় গর্তে পা দিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। সে দু—হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়েই হাত সরিয়ে নিতে গেল। গৌরী আঁকড়ে ধরে রেখেছে তার হাত।
‘ধরে থাকো, আবার কোন গত্তে যে পড়ব কে জানে।’
অনন্তের মনে হচ্ছে হাতটা তার দেহের অংশ নয়। বুকের মধ্যে ধকধকানিটা এবার কানে তালা লাগিয়ে দেবে। লোমকূপগুলো এক—একটা আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠেছে। এই প্রথম নারীদেহের কোমলতা সে অনুভব করল। নিজের অজান্তে সে গৌরীর কবজি অস্বাভাবিক জোরে চেপে ধরতেই মুখ তুলে গৌরী তাকাল, চোখে বিস্ময়। অনন্তের চোখ জ্বালা করছে, সে পরিচ্ছন্নভাবে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না।
‘হাতটা ছাড়ো।’
সে দ্রুত হাতটা টেনে নিয়ে নিজের দেহের সঙ্গে চেপে ধরল।
‘আমি চা খাব না, আমার কাছে একটা পয়সাও নেই।’
‘আমার কাছে আছে।’
ঘোষ কেবিনে পাশাপাশি ওরা বসল। দু—জনেই ভিজে সপসপে। গৌরী ইশারায় দোকানের ছেলেটাকে ডাকল।
‘দুটো ডবল হাপ।’
‘আর কিছু দোব, ওমলেট, মটন চপ, মটন কাটলেট, মটন দোপেঁয়াজি, ফিশ ফ্রাই?’
গৌরী তাকাল অনন্তের দিকে। সে মাথা নাড়ল।
‘দুটো ফিশ ফ্রাই।’
ছেলেটি সরে যেতেই ফিসফিস করে অনন্ত বলল, ‘আমার কাছে সত্যিই পয়সা নেই।’
‘বললুম তো আমার কাছে আছে।’
‘তুমি পেলে কোথায়?’
‘যেখান থেকেই পাই না।’
‘কেউ দিয়েছে তোমায়?’
গৌরী চুপ করে রইল।
‘তোমার রমেনদা?’
এক চিলতে হাসি ওর মুখে ফুটে উঠল। সাদা পাথরের টেবলে আঙুলের টোকা দিতে দিতে মুখটা ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল।
‘মালাটাও ওর দেওয়া।’
‘দেখতে ভালো নয়?’
‘বাবা তো বিয়ে ঠিক করেছে, তা হলে কী করবে?’
‘করুক না ঠিক, আমি আমার ব্যবস্থা করব।’
‘কী ব্যবস্থা?’
‘সে এখন বলব না।’
‘তোমার রমেন এখানেই কোথায় যেন থাকে।’
‘হ্যাঁ আর একটু এগিয়ে বাঁ দিকের গলিটায়। ওদের বাসাতেই এসেছিলুম, বেরিয়ে গেছে কোথায়।’
‘তুমি প্রায়ই আস?’
‘হ্যাঁ।’
‘লোক কেমন, কী করে?’
‘ফরেন মাল খিদিরপুর থেকে এনে বিক্রি করে, আমাকে একটা আমেরিকান জর্জেট দিয়েছে, দারুণ শাড়িটা।’
‘তুমি আমার কাছে একটা আলুর দমের দাম নাওনি, মনে আছে? আবার আজকেও খাওয়াচ্ছ। তোমার কাছে আমার দেনা রয়ে গেল।’
‘শোধ দেবে বুঝি!’
‘হ্যাঁ, তবে এখন নয়। আগে হাতে টাকা আসুক।’
‘এরা কত দেয়?’
‘চল্লিশ টাকা।’
‘য়্যা, মোটে চল্লিশ।’
গৌরীর মুখে অবিশ্বাসের ছাপ দেখে অনন্ত লজ্জা পেল। মুখ নীচু করে আঙুল দিয়ে টেবলে আঁকিবুকি কাটতে লাগল। ছেলেটা টেবলে প্লেট নামিয়ে রাখতেই সে মুখ তুলল। আড়ষ্ট হাতে ছুরি দিয়ে ফ্রাইটা খণ্ড করতে করতে বলল, ‘যা জুটে গেল তাই করছি, চাকরির যা বাজার। শুধু শুধু বসে থাকার চাইতে তবু তো…তবে চেষ্টা করে দেখছি।’
ফ্রাইয়ের একটা খণ্ড মুখে দিয়ে আরামে সে চিবোতে লাগল। স্বাদটা বড়ো ভালো, খিদেও পেয়েছে খুব। গৌরীর ছুরি—কাঁটা ধরা দেখে সে বুঝতে পারছে তার মতো আনাড়ি নয়। হঠাৎ তার মনে পড়ল অনু—অলুকে। সে আজ বাজার থেকে যা এনেছে তাই রান্না হয়েছে। সকাল থেকে ভাত আর আলু—ঝিঙে—পোস্ত ছাড়া এখনও পর্যন্ত কিছু ওদের পেটে পড়েনি। মা পেট ভরে কখনোই খেতে পায় না। ছেলেমেয়েদের খাইয়ে কিছুই তো প্রায় থাকে না।
ফ্রাইটা আর তত স্বাদু মনে হচ্ছে না। পর পর মুখগুলো ভেসে উঠছে। ওরা যখন জানবে রেস্টুরেন্টে খেয়ে এসেছে তখন মনে মনে কিছু একটা নিশ্চয় ভাববে। যদি ভাবে সংসারের টাকা থেকে সরিয়ে সে খেয়েছে! গৌরী নামে একটা মেয়ে যে তাকে খাইয়েছে, এ—কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে?
তার বুকের মধ্যে একটা মোচড় দিয়ে উঠল। একটু আগেও তার মনে হচ্ছিল আজকের দিনটা জীবনে মনে রাখার মতো একটা দিন। যতদিন বাঁচবে সে গৌরীর প্রত্যেকটি কথা, দেহের যাবতীয় নড়াচড়া, ওর চুলের গন্ধ, ওর চাহনি, হাসি, বিস্ময় সব স্মৃতিতে বাঁচিয়ে রেখে দেবে। তাই সে উদগ্রভাবে প্রতিটি মুহূর্তকে শুষে নিয়ে জমা করে রাখছিল তার চেতনার প্রতিটি কোষে। কিন্তু হঠাৎ কোষগুলোকে ফাটিয়ে দিল কতকগুলো শুকনো অবসন্ন মুখ।
‘আচ্ছা, এই যে খাচ্ছি। মুখে গন্ধ হবে?’
‘হবেই তো। পেঁয়াজ, রাই সর্ষে…গন্ধ হবে না?’
অনন্ত দমে গেল। সে ঠিক করল মশলা দেওয়া পান খাওয়াবার জন্য গৌরীকে বলবে।
‘তুমি ধুতি পরো কেন? এখনকার ছেলেরা তো প্যান্টই পরে।’
‘এটা বাবার ধুতি।’
‘মরা মানুষের জিনিস ব্যবহার করতে নেই।’
