‘হাসিদি তো সিগারেট খায় না!’
‘না খেলেও নয় । কখন যে কার হবে কেউ বলতে পারে না। এই পাশের বাড়িতে অলকাদের আগ যারা ভাড়া থাকত তাদের গিন্নির হয়েছিল পেটে। অপারেশন করার পর ক—টা দিন ভালো ছিল, ওর কিন্তু যন্ত্রণা হত না। তারপর আবার রোগ ছড়িয়ে শ্বাসনালিটায় ধরে, শ্বাস নিতে পারত না, সাত দিন বেঁচেছিল।’ বিজলির এখন পর পর মনে পড়ছে ক্যানসারে মারা যাওয়ার ঘটনাগুলো, পদ্মর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি চুপ করে রইলেন।
‘মাসিমা কখন কার হবে কেউ জানবে না! বলছো কী তুমি, আমার হলে তা হলে আমিও জানব না?’ ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে পদ্মর কণ্ঠস্বর।
বিজলি কান দিলেন না পদ্মর কথায়। মনের মধ্যে হাসির মুখটা বড়ো হয়ে ফুটে উঠছে। শান্ত অচঞ্চল চোখদুটো। ভয় পাওয়ার ব্যাপারটা যেন আগেই চুকিয়ে ফেলেছে। মৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আর কোনো লাভ নেই, তিরিশ—চল্লিশ বছর পরে তো মরতুমই নয় তিরিশ—চল্লিশ বছর আগেই মরব এমন একটা ভাব যেন ওর বলার ভঙ্গিতে ছিল। কিন্তু হাসি তোয়াক্কা না করলেও তিনি তো করেন। তাঁর বুকের মধ্যেটা যে খালি লাগছে। বিশাল বিশাল গাছের একটা বন ছিল, গাছগুলো আচমকা প্রচণ্ড ঝড়ে মড়মড় করে ভেঙে পড়ে তৈরি করে দিল ফাঁকা জমি। এই ফাঁকা জমিতে চারদিক থেকে বাতাস ছুটে আসছে। ধুলো বালিতে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে চোখ।
বিজলি বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে বাহু চোখের উপর রেখে বললেন, ‘রাতে আর খাব নারে, তুই খেয়ে নে। আলোটা নিভিয়ে দে, চোখে লাগছে।’
চার
প্রতিদিন ভোরে যখন বিজলির ঘুম ভাঙে তখনও ঘরটা আবছা থাকে। জয় দত্ত স্ট্রিটের ঘরে ঘরে সূর্যের আলোর আভা উজ্জ্বল হয়ে উঠতে সাতটা বেজে যায়। মধ্যরাত পর্যন্ত তিনি ঘুমোতে পারছেন না দু—দিন ধরে। অজস্র রকমের ভয়ংকর চিন্তা তাঁকে গ্রাস করে থাকে। শেষ রাতে তাঁর মাথাটা ঝিমিয়ে আসে। চিন্তা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়, তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।
‘মাসিমা, ও মাসিমা কী কাণ্ড হয়ে গ্যাছে ওদিকে, ওঠো ওঠো।’
পদ্মর ঠেলা খেয়ে বিজলি চোখ খুলেই বললেন, ‘হাসির কী হল?’
‘হাসি নয় হাসি নয়, ও বাড়ির রাধু মাসিমা। ধরাধরি করে ওঁকে শঙ্করবাবু আর নাথু গাড়িতে তুলল, সঙ্গে অন্ন। হাসপাতালে নিয়ে গেল। বাড়ির সামনে লেকে জমে গেছে, বলাবলি করছে রাতে বিষ খেয়েছে নাকি! রাধু মাসিমা বিষ পেল কী করে?’
বিজলি যেসব চিন্তা রাতে করেছেন তাতে রাধুকে তিনি চিন্তার গণ্ডির মধ্যে আনেননি। কেন আনেননি ভেবে অবাক হলেন। রাধুই তো এতকাল ছিল তাঁর দুশ্চিন্তা!
‘ওদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নে। জবার মা তো ভোরে কাজ করতে আসে। নিশ্চয় কথাবার্তা যা হচ্ছিল শুনেছে? ওকে জিজ্ঞেস কর। আর নীচের দাদাকে দেখতে পেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বল। হাসিকে কী যেন একটা পরীক্ষা করতে বলেছিল ডাক্তার, তার কী হল সেটা জানতে হবে।’
এরপর শুরু হল বিজলির ছটফটানি। ইচ্ছে হচ্ছে ছুটে যেতে সামনের বাড়িতে। রাধুকে কোথায় নিয়ে গেল, কেমন রয়েছে, কী করে বিষ খেল, বাঁচবে না মরবে এমন অজস্র প্রশ্ন তাঁর মাথায় কেঁচোর মতো নড়েচড়ে উঠছে। উত্তরগুলো সংগ্রহ করে ফেলতে পারতেন যদি চলাফেরা করতে পারতেন। না পারার জন্য রেগে উঠলেন নিজের ভাঙা পায়ের উপর। ‘হতচ্ছাড়া পা, ভাঙার আর সময় পেলি না, পদ্মটাও তেমনি একটা রোগাপটকা বুড়ো রিকশাওয়ালাকে ধরে আনল, শক্ত জোয়ান হলে রিকশাটা ঠিক ধরে রাখত, উলটোত না।’
রাধাকিঙ্করীর জন্য বিজলির অস্থির বোধ করার যুক্তি আছে। তিরিশ বছর আগে রাধু যখন বিয়ের পর প্রথম শ্বশুরবাড়িতে আসে তখন তাকে বরণ করে যাঁরা তোলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন সামনের ভটচায বাড়ির বউ বিজলি। এক ঘড়া জল তিনি মোটরের দরজার সামনে রাস্তায় ঢালেন। গাড়ির দরজা খুলে নতুন বউ জল ধোওয়া রাস্তায় প্রথম পা ফেলেছিল। তারপর থেকে তিনি তিরিশ বছর রাধুর ‘দিদি’। ওদের ছাদটা বড়ো। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন বাঁশের লম্বা ঝুলঝাড়াটা নিয়ে রাধু ছোটাছুটি করে কাটাঘুড়ি ধরছিল। এ—বাড়ির ছাদ থেকে বিজলি হাততালি দিয়ে বলেছিল, ‘রাধু ওড়া তো দেখি।’ ঘুড়িটার সঙ্গে ছিল অনেকখানি সুতো। রাধু টুঙ্কি দিয়ে দিয়ে ঘুড়িটা আকাশে অনেকখানি তুলেছিল। সুতো শেষ প্রান্তে পৌঁছোতে হাত থেকে ছেড়ে দেয়। ‘এই যাহহ’ বলে সে হেসে উঠেছিল। বিজলি আপশোস করে বলেছিলেন, ‘ছেড়ে দিলি কেন বেশ তো উড়ছিল!’ রাধু বলেছিল, ‘ছাড়ব কেন, সুতো ফুরিয়ে গেছে, খেয়াল করিনি।’
ঘুড়িটা বাচ্চচার হাঁটার মতো টলতে টলতে আকাশে ভাসতে থাকে। বিজলি খাটে আধবসা হয়ে সেদিনের ঘুড়িটাকে দেখে যাচ্ছেন। মনে পড়ছে চেঁচিয়ে বলা রাধুর কথাগুলো। খেয়াল করিনি, এটা বাজে কথা। পরিষ্কার দেখেছি সুতোটা ইচ্ছে করে ছেড়ে দিল। এবারও ইচ্ছে করেই নিজের জীবনটা ছেড়ে দিল। ভালো করল না মন্দ করল কে বলবে?
‘মাসিমা আমাকে ডেকেছেন?’ দরজার কাছে জ্যোতি দাঁড়িয়ে।
‘এসো বাবা,’ জ্যোতিকে ধুতি পাঞ্জাবি পরা দেখে বললেন, ‘ইস্কুলে যাচ্ছ?’
‘হ্যাঁ।’ ঘরে ঢুকে জ্যোতি বিজলির পায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা সুরে বলল, ‘খুব অসুবিধে হচ্ছে তো? হাঁটাচলা একদম বন্ধ।’
‘আমি বিছানায় পড়ে আর কত কী ঘটে যাচ্ছে। সামনের বাড়িতে আমার ছোটো বোনের মতো রাধু সে একটা কী কিত্তি করে বসেছে। এদিকে হাসি সেও একটা খারাপ অসুখের কথা বলে দিব্যি হাসি হাসি মুখ করে সেই যে নীচে নেমে গেল এখনও পর্যন্ত একটু জানাল না, কী যেন পরীক্ষাটা?’
