নীচের থেকে ঘুরে এল পদ্ম। হাতে ভাঁজ—করা গরদের কাপড়টা। ‘হাসিদি বেরিয়েছে বুকের ছবিটা আনতে, ডাক্তারের কাছে হয়ে বাড়ি ফিরবে। কল্পনাকে বলে গেছিল কাপড়টা ফেরত দিয়ে আসতে। ভুটুকে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে ও নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি ডেকে তুললুম।’
‘হাসি কখন ফেরে একটু নজর রাখিস। ফিরলেই নীচে গিয়ে জেনে আসবি এক্সরে রিপোর্টে কী বলেছে। কেন জানি আমার ভালো লাগছে না। তুই বরং নীচে গিয়ে সদরে দাঁড়িয়ে থাক।’
কিছুক্ষণ পরেই হাঁফাতে হাঁফাতে এল তপতী।
‘দিদিমা আছে এখনও, বিক্রি হয়নি।’ উত্তেজনায় উদ্দীপনায় টসটস করছে তপতীর মুখ। ‘প্রথমে বলল তিন হাজার, এখন নতুনের দামই পাঁচ হাজার, আমি বললুম দিদিমাকে তো বলেছেন দু—হাজার পেলেই বেচে দেবেন। তাইতে বলল তখন বলেছিলুম তখনকার দাম, এখন বেড়ে গেছে। আমি তারপর বললুম মেশিন দিদিমা কিনবে। অমনি বলল ঠিক আছে দু—হাজারেই দোব তবে তিন দিনের মধ্যে পুরো দাম চুকিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’
‘আমার নাম করলি? বারণ করেছিলুম না?’ বিজলির গলায় ভর্ৎসনা।
অপ্রতিভ হয়ে কুঁকড়ে গেল তপতী। ‘কী করব। মেশিনটা দেখলুম চোখের সামনে ঢাকনা দেওয়া রয়েছে। মনের মধ্যে কীরকম যেন একটা করে উঠল, আমি বলে ফেললুম আপনার নাম।’ মুখ নামিয়ে সে ভাঙা গলায় বলল, ‘আমার দোষ হয়েছে, মাপ চাইছি।’ বিলির প্লাস্টারে হাত রাখল তপতী।
‘কাল এসে টাকাটা নিয়ে যাস। আর সেলাই মেশিনটা আমাকে দিয়ে যাবি। যত দিন না সেলাই শিখবি তত দিন ওটা আমার এই ঘরে থাকবে। আমি দেখব তুই আমার চোখের সামনে বসে ভুটুর জাঙিয়া, পদ্মর ছায়া আর আমার ব্লাউজ সেলাই করেছিস তবেই ওটা পাবি নইলে পাবি না। যা বলেছি এখুনি সেলাই ইস্কুলে ভরতি হয়ে যা। তোর কাজ দেখার পর দুর্গাচরণকে বলব।’
‘কাল কখন আসব দিদিমা?’ তপতী উৎকণ্ঠিত হয়ে জানতে চাইল।
‘দশটা এগারোটার সময় আসিস আর দুটো ছেলে জোগাড় করে আনবি—ওটা তো বয়ে আনতে হবে।’
তপতী চলে যাবার পর বিজলি টাকার পুঁটলিটা খুললেন। গুনে গুনে দু—হাজার টাকার একশো—পাঁচশোর নোট বার করে আলাদা রেখে বাকি টাকা গুনে পুঁটলিতে বেঁধে রাখলেন। বিড়বিড় করলেন, ‘আর খরচ করা নয়, এখনও দুটো মাস চালাতে হবে। দাদাকে খবর দিতে হবে পা ভেঙে বিছানায় পড়ে আছি।’
আবার একা। মনে পড়ল মুখ থেকে বেরিয়ে আসা পদ্মকে বলা কথাটা : ‘পঙ্গু হয়ে গেলে তার নরকের ভয় থাকে না।’ কথাটা কি মন থেকে বেরিয়ে এসেছিল? তাঁর কি নরকের ভয় নেই। বিজলি সাত পাঁচ ভেবে বললেন। দেখতে পেলেন বারান্দা দিয়ে গুটি গুটি ছাই রঙের হুলো বেড়ালটা আসছে। প্রায়ই আসে, রান্নাঘরে ঢোকে, এটাওটা শুঁকে বেরিয়ে যায়। নিরিমিষ হেঁসেল। ওঁর খাবার মতো কিছু থাকলে তো! বিজলি ‘হেই হেই’ বলে চিৎকার করলেন, ‘কিছু নেই যা ভাগ ভাগ।’ এধার ওধার তাকিয়ে তিনি খুঁজলেন লাঠির মতো কিছু পাওয়া যায় কিনা। না পেয়ে তালু দিয়ে বিছানায় চাপড় দিয়ে আবার চিৎকার করলেন। হুলো মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে আবার গদাইলশকরি চালে ফিরে গেল। বোঝা গেল, এই বাড়িতে কখনো প্রহার জোটেনি। তাই কাউকে তোয়াক্কা করে না।
বিজলির চিৎকার শুনে তাড়াতাড়ি সদর থেকে পদ্ম উঠে এসেছে।
‘সেই হুলোটা এসেছিল। বোধহয় আজ খাওয়াটাওয়া জোটেনি। চেঁচিয়ে তাড়ালুম। দুধ আছে তো তোলা, তাই থেকে খানিকটা ওকে দে। দ্যাখ ধারেকাছেই কোথাও আছে। মা ষষ্ঠীর বাহন উপোস দিয়ে থাকবে?’
নীচের থেকে কল্পনার গলার আওয়াজ আর ঝাঁটা মারার শব্দ ভেসে এল। বিজলি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ‘ওরে পদ্ম নীচে রয়েছে। এখুনি দুধটা দিয়ে আয়, মারতে বারণ কর।’
পদ্ম ছুটে বারান্দায় গিয়ে ঝুঁকে পড়ল। ‘কল্পনা ওকে মারিসনি। আমি ওর দুধ নিয়ে যাচ্ছি, খাওয়াব।’
পদ্ম প্লাস্টিকের বাটিতে দুধ নিয়ে নেমে গেল। মিনিট দশেক পর ফিরে এল, সঙ্গে হাসি। হাসির হাতে হলুদ রংয়ের একটা বড়ো খাম।
‘তোমার ব্যাপার কী বলো তো?’ বিজলি অনুরোগ অভিমান রাগ একসঙ্গে মিশিয়ে দিলেন তারস্বরে। ‘ডাক্তার দেখাচ্ছ এক্স—রে করছ অথচ আমায় কিছু বলছ না। অবিশ্যি আমি কে যে আমায় বলবে।’
‘ভালো কিছু খবর থাকলে নিশ্চয় বলব।’ স্বাভাবিক অনুত্তেজিত স্বর হাসির, ‘ডাক্তার সন্দেহ করছেন ক্যানসার, নিশ্চিত হবার জন্য বায়োপসি করাতে বললেন।’
বিজলি স্তম্ভিত চোখে হাসির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, মুখ দিয়ে কথা সরছে না।
‘এই হচ্ছে ব্যাপার। আমি যাই মাসিমা।’ হাসি কথাটা বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বিজলির বিমূঢ় ভাব তখনও কাটেনি। পদ্ম বলল, ‘হাসিদি কী অসুখ হয়েছে বলল?’
‘ক্যানসার, তুই বুঝবি না। একে বলে কর্কট রোগ। কর্কট মানে কাঁকড়া। এই রোগে কাঁকড়ার কামড়ের মতো অসহ্য যন্ত্রণা হয়, তাই এই নাম। এ রোগে বাঁচে খুব কম।’ বিজলি ক্ষীণ স্বরে বললেন, বুকের মধ্যেটা যা তাঁর খালি লাগছে। বিশ্বাস হচ্ছে না তাঁর থেকে এত অল্পবয়সির এমন একটা রোগ হতে পারে।
পদ্মর চোখ বিস্ফারিত হল বিজলির কথা শুনে। ‘বলে কী মাসিমা, হাসিদি বাঁচবে না? কাঁকড়ার কামড় খেতে খেতে মরে যাবে! এ কী রকমের অসুখ, আমি তো কাউকে এমনভাবে মরতে দেখিনি, শুনিনি।’
‘জীবনে তুই কতটুকু আর দেখেছিস শুনেছিস? আমার নন্দাই এই রোগে মারা গেছিল। বুকের কলজেদুটো খেয়ে ফেলেছিল, সারা শরীরে রোগ ছড়িয়ে গেছিল, গা ফেটে রক্ত বেরোত। খুব সিগারেট খেত দিনে তিরিশ—চল্লিশটা।’
