‘চিনি। কালো রোগা লম্বা চশমা পরা বউ তো? ওদের টেলিফোন ইলেকট্রিক বিল তো আমিই দিই, মাসে মাসে পোস্টাপিস থেকে তো সাড়ে তিনশো টাকা আমি তুলে আনি।’
‘দৌড়ে যা এক্ষুনি।’
আক্ষরিক অর্থেই তপতী পায়ে হাওয়াই চটি গলিয়ে বারান্দা দিয়ে ছুটে গেল। সিঁড়িতে ওর চটির দ্রুত ফটফট শব্দ থেকে বিজলি বুঝলেন, মেয়েটার দাঁড়ানোর আগ্রহ কতটা। খড়কুটো যা পাবে এখন আঁকড়ে ধরবে। এবং এটাও বুঝলেন নরম মনের শান্ত স্বভাবের একরত্তি তপতী লড়বে, দাঁড়াবে।
সারা দিনে এই সময়টাই বিপন্নবোধ করেন বিজলি। সব বাড়িই এখন সংসারের কাজে ব্যস্ত, যাওয়া যায় না। ঘরে কতক্ষণ আর পদ্মর সঙ্গে কথা বলা যায়। ওই টিভি বা টেলিফোন থাকলে সময় কাটানো যায় কিন্তু এর কোনোটাই তাঁর নেই বা রাখতে চাননি। কথা বলার মতো কেউ এলে তিনি খুশি হন। সমবয়সি বুড়িদের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর একদমই ভালো লাগে না। ওরা এত নীরস নিষ্প্রাণ, যে দুটো কথা বলার পরই তিনি ক্লান্ত বোধ করেন।
তপতী চলে যাবার পর একা ঘরে তাঁর মনে হল টিভি থাকলে তবু সময় কাটানো যায়। টেলিফোন থাকলে কারোর সঙ্গে কথা বলা যায়। কিন্তু কার সঙ্গে কথা বলবেন? কথা বলার মতো লোকজন তো সব পাড়াতেই রয়েছে তাদের সঙ্গে কি ফোনে কথা বলতে হবে! ভেনিয়াপুরে দাদার বাড়িতে অবশ্য টেলিফোন আছে। কিন্তু শুধু একজনের সঙ্গে কথা বলার জন্য টাকা খরচ করে ওটা রাখার মানে হয় না। বিজলি বাংলা খবরের কাগজ রাখতেন। বছর চারেক আগে হাসপাতালে কুকুরে আধখাওয়া এক শিশুর ছবি কাগজে দেখার পর তিনি কাগজ নেওয়া বন্ধ করে দেন। গ্রামোফোন ছিল। তাঁর বিয়ের আগে শ্বশুর কিনেছিলেন। এখন সেটা কাঠের সিন্দুকটার মধ্যে ভাঙা স্প্রিং নিয়ে পড়ে আছে। প্রায় সত্তরটা রেকর্ড বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। নেবার লোক পাননি। টেপরেকর্ডার আর ক্যাসেটের যুগ এখন। একই গান কতবার আর শোনা যায়? সাত—আটবার শোনার পর একঘেঁয়ে লাগতে শুরু করে। রেকর্ডগুলো কিলো দরে বিক্রি করে দিয়েছেন।
বিজলির এখন মনে হল তাঁর একটা ছেলে থাকলে বউমা নাতি নাতনিতে সংসার ভরে থাকত। তিনিও এমন একা নিঃসঙ্গ হয়ে থাকতেন না। শ্রীধরের কাছে নিত্য প্রার্থনা করেছেন সন্তানের জন্য, কত নামকরা দেবদেবীর স্থানে মানত করে হত্যে দিয়েছেন, গাছে ঢিল বেঁধেছেন, এঁদো পুকুরে স্নান করে পুজো দিয়েছেন, বুক চিরে রক্ত বার করেছেন কিন্তু কিছুতেই গর্ভে সন্তান আসেনি। একসময় দত্তক নেবার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু কৃষ্ণকিশোর রাজি হননি। তাঁর বংশধারায় অন্য ধারার রক্ত নিয়ে আসায় প্রবল আপত্তি ছিল। বিজলি ডাক্তারের কাছে তাঁকে নিয়ে যাবার কথা বলেছিলেন, স্বামী রাজি হননি। কেন রাজি হননি সেটা এখনও তাঁর কাছে হেঁয়ালি হয়ে রয়েছে।
বারান্দায় পায়ের শব্দে চোখ খুলে বিজলি তাকালেন। পদ্ম চটি খুলে ঘরে ঢুকল।
‘বলেছিস রাধাকে?’
‘বলেছি।’
‘শুনে কী বলল?’
বিজলির পাশে এসে কানের কাছে মুখ রেখে পদ্ম ফিসফিসিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ বলল, আমাকে বিষ এনে দিবি?’
অবাক চোখে বিজলি তাকিয়ে বললেন, ‘কেন?’
‘কেন, তা বলার মতো ক্ষমতা থাকলে তো বলবে, তুমি আন্দাজ করে নাও, একটা মানুষ বিষ খেয়ে মরতে চায় কেন!’ পদ্ম জিজ্ঞাসু চোখে বিজলির বিমূঢ় দৃষ্টির মোকাবিলা করে নিজেই উত্তরটা দিল, ‘আট বছর ধরে চাকা লাগানো চেয়ারে বসা আর খাটে শোয়া; দাঁড়ানো নয় চলা নয়, পরিষ্কার করে কথাও বলতে পারে না; এমনভাবে জীবন কাটাতে কার ভালো লাগে বলো?’
বিজলি চট করে উত্তর দিতে পারলেন না। নিজেকে নিয়ে একটু ভাবলেন। একটা পা ভেঙে দুটো দিন মাত্র বিছানায় শুয়ে আছেন, বাইরের লোক আসছে, কথা দিব্যি বলছেন, এবং এটাও জানেন পা আবার ভালো হয়ে যাবে। আগের মতো হাঁটাচলা করবেন, এবাড়ি ওবাড়ি যাবেন। জীবন যেমন ভাবে চলে এসেছে সেই ভাবেই চলবে। এটা জানা সত্ত্বেও তো দুটো দিন কি একঘেয়ে বিরক্তকর লাগেনি? চলাফেরা কিংবা গতি না থাকলে জীবন যেন অর্থহীন হয়ে যায়—বিজলির এটাই মনে হচ্ছে এখন।
রাধা তো আট আটটা বছর বেঁচে মরা হয়ে রয়েছে। ওষুধ খেয়ে সেবাযত্ন পেয়ে হয়তো আরও দশ—পনেরো বছর বেঁচে থাকবে। কিন্তু সে বাঁচা তো মরার বাড়া। চতুর্দিকে লোক হাঁটছে ছুটছে ইচ্ছেমতো কাজকম্মো করছে, নানান ব্যাপার দেখছে তাইতে হেসে উঠছে, দুঃখ পাচ্ছে, ছুটে বারান্দায় এসে ঝুঁকে রাস্তা এধার—ওধার দেখছে, ফেরিওয়ালাকে ডাকছে, এসবের তো কিছুই রাধা পাচ্ছে না! ওর মনে ওঠানামাও তো মরেই গেছে!
‘রাধার কথা শুনে তুই কী বললি পদ্ম?’
‘বললুম এমন কথা মুখে এনো না। জানো না আত্মহত্যা মহা পাপ, নরকে গমন? তাই শুনে মাথাটা শুধু কাত করল। মনে হল জানে আত্মহত্যা করলে নরকে যেতে হবে!’ পদ্মকে অবাক দেখাল।
‘তবু বিষ খেতে চায়! পাঁচালির কথাগুলো এখন মনে হচ্ছে কেমন জানি অচল হয়ে যাচ্ছে রে পদ্ম, কেউ আর তেমন গ্রাহ্যি করে না। করবেই বা কেন, শরীর পঙ্গু হয়ে গেলে তার আর নরকের ভয় থাকে না। রাধুর চলে যাওয়াই ভালো।’ মন্থর ভগ্ন স্বরে বিষণ্ণ গলায় বিজলি বললেন। তারপরই মনে পড়ল হাসি তো গরদের থানটা ফেরত দিয়ে যায়নি এখনও।
‘ওরে পদ্ম নীচে গিয়ে দেখ তো হাসি কাপড়টার কী করল। অনেকদিনের পুরোনো, ছিঁড়েটিড়ে না ফেলে।’
